২৮ অক্টোবর বিএনপির মহাসমাবেশ ও আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশ সামনে রেখে আমরা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হারুন-অর-রশিদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। হারুন-অর-রশিদ বলেছিলেন গণ-অভ্যুত্থান ও সংঘাত কোনোটিরই সম্ভাবনা নেই। শেষ পর্যন্ত সেদিনের কর্মসূচি সংঘাতে গড়ালো এবং বিএনপির মহাসমাবেশও পণ্ড হলো। এই প্রেক্ষাপটে প্রথম আলো আবারও কথা বলেছে হারুন-অর-রশিদের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শেখ সাবিহা আলম
প্রথম আলো: আপনি বলেছিলেন গণ-অভ্যুত্থান, সংঘাত বা সহিংসতা কোনোটারই আশঙ্কা নেই। কিন্তু শেষ রক্ষা তো হলো না। সেই সংঘাতের দিকেই গেল রাজনীতি।
হারুন-অর-রশিদ: আমি এখনো বলছি, গণ-অভ্যুত্থান হয়নি, হবেও না। তবে যে সংঘাত-সহিংসতা হলো তা অনাকাঙ্ক্ষিত, অবাঞ্ছিত, কাম্য ছিল না। দেশের মানুষ শান্তি চায়। তারা সহিংসতা চায় না। লক্ষ করলে দেখা যাবে সংঘাতে যুক্ত ছিল রাজনৈতিক দলের কর্মীরা। সেখানে জনগণের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। তাদের নিষ্ঠুর হামলায় পুলিশ বাহিনীর একজন সদস্য নিহত হয়েছেন। ডেমরায় দেখলাম বাসের ভেতর ঘুমন্ত একজন যাত্রীকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। এই সহিংসতার দায় বিএনপিকে নিতে হবে। এর জন্য হয় বিএনপি নেতাদের অদূরদর্শিতা দায়ী, না হলে বলব তাদের উদ্দেশ্যই ছিল সহিংসতায় জড়ানো।
প্রথম আলো: একটু ব্যাখ্যা করবেন?
হারুন-অর-রশিদ: প্রথমত, তাদের আন্দোলনটাই উত্তেজনা উদ্দীপক। কারণ, তারা সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনের ডাক দিয়েছে। ফলে তাদের আগেই বোঝা উচিত ছিল যে এ অবস্থায় সারা দেশ থেকে আসা এত বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মীকে নয়াপল্টনের মতো উন্মুক্ত জায়গায় নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। পুলিশ তাদের বলেছিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করতে। কিন্তু তারা রাজি হলো না। ফলে শেষ পর্যন্ত যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। দ্বিতীয়ত, সংঘাত-সহিংসতা করার নির্দেশও দল থেকে আসার আশঙ্কা আছে। যেহেতু তারা সংলাপ চায় না, তাদের পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপ বলতে হাতে ছিল হরতাল-অবরোধ। হরতাল-অবরোধ ডাকার একটা প্রেক্ষাপট প্রয়োজন ছিল। তারা সেটাই করেছে। তবে আমি আগেও বলেছি, এখনো বলছি; সহিংসতা, সংঘাতে জনসাধারণের সায় নেই। এই পথে এগোলে বিএনপি সমূহ ক্ষতির মধ্যে পড়বে।
প্রথম আলো: পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ডাকাটা সহিংসতায় ইন্ধন দেয় না? ধরুন, এটা তো পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করার মতো...
হারুন-অর-রশিদ: এখন আমাদের রাজনীতিই হলো মাঠ দখলের রাজনীতি। বিএনপি ধরেন বড় একটা সমাবেশ করল, আর আওয়ামী লীগ মাঠে নেই। তাহলে তাদের কর্মীরা কী মনে করবে? ভাববে আওয়ামী লীগ বাড়িতে উঠে গেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ আর বিএনপির জনসভার মধ্যে তো দূরত্ব ছিল। তারপরও বিএনপি সামলাতে পারল না। তারা কাউকেই মানবে না। প্রধান বিচারপতির বাসভবনে আক্রমণ করল। এমন ঘটনা আগে ঘটেছে? তারা নির্বাচন কমিশন মানে না, সরকার মানে না। আর টানা এতগুলো বছর ক্ষমতার বাইরে থাকায় তাদের মধ্যে প্রতিহিংসার মনোভাবও এখন তুঙ্গে। ফলে সামান্য ঘটনা থেকে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। ১৯৪৬ সালের কথা ধরুন। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস ডাকলেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তখন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী। তিনি পলো গ্রাউন্ডে সমাবেশ ডাকলেন। হিন্দু ও মুসলিমের মধ্যে প্রচণ্ড উত্তেজনা। ব্রিটিশরা তাতে ঘি ঢালল। সামান্য ঘটনা থেকে দাঙ্গা হয়ে কত মানুষ খুন হলেন।
প্রথম আলো: কাকরাইলের যেখান থেকে বিরোধের সূত্রপাত, পুলিশ তো চাইলে ওখানেই শেষ করতে পারত। অনেকেই বলছেন, পুলিশ এই সংঘাত বাড়তে দিয়েছে?
হারুন-অর-রশিদ: পুলিশ বাড়াবাড়ি কোথায় করল? বিচারপতির বাসভবনে হামলা হলে পুলিশ তো দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। তারা তো ওতেই থামেনি, গাড়ি পুড়িয়েছে। এক পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। আমি তো বরং মনে করি পুলিশ অনেক সংযত আচরণ করেছে। এরপরও যদি বিএনপি সহিংসতার পথে হাঁটে, তাহলে তারা আর আন্দোলনে ফিরতে পারবে না।
প্রথম আলো: বিএনপির কৌশল কী হবে মনে হয়?
হারুন-অর-রশিদ: বিএনপি যদি সংঘাতমূলক রাজনীতি করে, তাহলে তাদের বহুসংখ্যক নেতাকে কারাবন্দী হতে হবে। ওতে কোনো ফল হবে না। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগেও তারা সংঘাত-সহিংসতায় জড়িয়েছে। কোনো লাভ হয়নি। আওয়ামী লীগ নির্বাচন করে পাঁচ বছর সরকারে থেকে গেছে। এখন আবার দেখছি জামায়াত বিএনপির সঙ্গে একই দিনে হরতাল ডাকল। বলা হয় জনগণ ক্ষমতার উৎস। বিএনপি সেদিকে যাচ্ছে না এখনো। তারা শক্তি দেখাতে চায়। জামায়াত তো পুরোপুরিই শক্তি দেখানোর রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। জামায়াতের সঙ্গে আন্দোলনে জড়ানো মানেই সহিংসতা বাড়া। সেদিকে যাওয়া একেবারেই উচিত হবে না বিএনপির। বিএনপিকে এখন শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে ফিরতে হবে। সেই সঙ্গে সংলাপের পথ খোলা রাখতে হবে, যেন নির্বাচনে তারা অংশ নিতে পারে। আমি তো মনে করি, নির্বাচনে অংশ নেওয়া ছাড়া বিএনপির হাতে অন্য কোনো বিকল্প নেই।
প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।
হারুন-অর-রশিদ: আপনাকেও।