ব্রাজিলের বলসোনারোর অতি ডানপন্থী সমর্থকদের মিছিল-সমাবেশ।
ব্রাজিলের বলসোনারোর অতি ডানপন্থী সমর্থকদের মিছিল-সমাবেশ।

মতামত

ব্রাজিলের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে হস্তক্ষেপ করছে

ব্রাজিলের দুটি বৃহত্তম অপরাধী চক্র পিসিসি ও সিভিকে ‘সন্ত্রাসী’ গোষ্ঠী হিসেবে ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ পদক্ষেপের মাধ্যমে ওয়াশিংটন ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর নিজস্ব সংজ্ঞা চাপিয়ে দিয়েছে, যার প্রভাব কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের সুদূর-ডানপন্থীরা সিদ্ধান্তকে ‘আন্তদেশীয় সংগঠিত অপরাধের ক্রমবর্ধমান বিস্তারের’ বিরুদ্ধে এক ‘জরুরি পদক্ষেপ’ হিসেবে তুলে ধরছে। তবে বাস্তবতা হলো, এটি নিরাপত্তার চেয়ে রাজনীতির সঙ্গে অনেক বেশি সম্পর্কিত।

এ ঘোষণার পেছনে লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সাম্রাজ্যবাদী ও হস্তক্ষেপকারী মানসিকতার প্রতিফলন ঘটেছে। এটি ১৯৬৪ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত মার্কিন–সমর্থিত সামরিক স্বৈরাচারের ভয়াবহ স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। একই সঙ্গে এটি ব্রাজিলের অতি ডানপন্থীদের স্বার্থের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়।

পিসিসি ও সিভি নিঃসন্দেহে ভয়াবহ সহিংসতার জন্য দায়ী। লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী অপরাধী নেটওয়ার্কগুলোর মধ্যে তারা অন্যতম এবং ব্রাজিল ও তার আশপাশের অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।

কিন্তু কোনো গোষ্ঠীর সহিংসতা কতটা চরম, কেবল তা দিয়ে তাকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। সন্ত্রাসবাদের ধারণাটি নিয়ে নানা মত থাকলেও, রাজনৈতিক বা আদর্শগত লক্ষ্য হাসিলের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডকেই মূলত সন্ত্রাসবাদ বলা হয়।

পিসিসি ও সিভি হয়তো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে, রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের প্রভাবিত করে, নির্দিষ্ট এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেয় কিংবা নিজেদের স্বার্থে রাষ্ট্রের মুখোমুখি দাঁড়ায়। তবে তাদের মূল লক্ষ্য অপরাধভিত্তিক ক্ষমতা অর্জন ও অর্থ উপার্জন; কোনো রাজনৈতিক বা আদর্শিক রূপান্তর ঘটানো নয়। রাজনীতি তাদের জন্য অপরাধের সাম্রাজ্য রক্ষা ও বিস্তৃত করার মাধ্যমমাত্র, এটি তাদের অস্তিত্বের মূল উদ্দেশ্য নয়।

সরকারগুলো যত ঢালাওভাবে ‘সন্ত্রাসবাদ’ শব্দটির ব্যবহার বাড়াবে, আসল নিরাপত্তা হুমকির ধরন তত বেশি আড়াল হবে। একই সঙ্গে এটি রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধিতে এই তকমা ব্যবহারের সুযোগ করে দেয়। ফলে ওয়াশিংটন ঠিক কোন উদ্দেশ্যে এই সময়ে এসে এই পদক্ষেপ নিল, সে প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (বাঁয়ে) ও ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইস ইনাসিও লুলা দা সিলভা। মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে আসিয়ানের ৪৭তম শীর্ষ সম্মেলনের এক ফাঁকে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে, ২৬ অক্টোবর ২০২৫

পিসিসি বা সিভি—কোনোটিই নতুন উদ্ভাবিত কোনো হুমকি নয়। পিসিসি নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই সক্রিয় আর সিভি তার চেয়ে বেশি পুরোনো। এদের সংঘটিত অপরাধ ও অপকর্ম সম্পর্কে ব্রাজিল ও ওয়াশিংটন উভয়ই বহু দশক ধরে অবগত।

তাহলে ২০২৬ সালে এসে হঠাৎ যুক্তরাষ্ট্র কেন সিদ্ধান্ত নিল যে বহু পুরোনো এসব অপরাধী নেটওয়ার্ককে এখন ‘সন্ত্রাসী’ ঘোষণা করতে হবে?

এর উত্তর মার্কিন নিরাপত্তা মূল্যায়নে নয়, বরং ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নিহিত রয়েছে।

প্রেসিডেন্ট লুই ইনাসিও লুলা দা সিলভার সরকারের বিরুদ্ধে বলসোনারো পরিবারের রাজনৈতিক লড়াইয়ে ওয়াশিংটনকে টানার চেষ্টার সঙ্গেই এ ঘোষণার টাইমিং বা সময় জড়িয়ে রয়েছে। ২০২২ সালের নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর অভ্যুত্থানের চেষ্টার দায়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারো ২৭ বছর ৩ মাসের কারাদণ্ড ভোগ করছেন, আর তাঁর ছেলেরা এখন এ রাজনৈতিক যুদ্ধকে যুক্তরাষ্ট্রের দরবারে নিয়ে গেছেন।

অতি ডানপন্থীদের মিছিল-সমাবেশে বলসোনারোর সমর্থকদের মার্কিন পতাকা হাতে দেখা যায়। সেখানে বামপন্থীদের হাত থেকে ব্রাজিলকে ‘বাঁচাতে’ তাঁরা প্রকাশ্যেই সামরিক ও কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের দাবি জানায়।

সাবেক প্রেসিডেন্টের অন্যতম ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারো কয়েক মাস ধরে লুলাকে সংগঠিত অপরাধের প্রতি ‘নরম’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। পিসিসি ও সিভিকে ‘সন্ত্রাসী’ ঘোষণা করতে ট্রাম্প প্রশাসনকে সরাসরি চাপ দেওয়াসহ লুলার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে তিনি মার্কিন কর্মকর্তাদের পেছনে লেগে ছিলেন। তাঁর ভাই এদুয়ার্দো বলসোনারো, যিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বাস করছেন, বাবার বিচারপ্রক্রিয়া চলাকালে আরও এক ধাপ এগিয়ে ব্রাজিলীয় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া এবং ব্রাজিলের পণ্যে শুল্ক আরোপের জন্য তদবির চালিয়েছিলেন।

ফ্লাভিওর এ লবিংয়ের সরাসরি একটি নির্বাচনী গুরুত্বও আছে। আগামী অক্টোবরের নির্বাচনে তিনি লুলার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছেন। ১১ আগস্টের একটি সিএনটি/এমডিএ জনমত জরিপে দেখা গেছে, প্রথম রাউন্ডে লুলার সমর্থন ৪২ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ফ্লাভিওর পক্ষে রয়েছে ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট।

এ নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এ ‘সন্ত্রাসী’ তকমা অতি ডানপন্থীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে কাজ করছে। এটি ব্রাজিলের সুদূর-ডানপন্থীদের তৈরি করা সেই পুরোনো বয়ানকেই জোরদার করে, যেখানে লুলাকে অপরাধী চক্রের সহযোগী বা তাদের দমনে অনিচ্ছুক হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। এর উদ্দেশ্য লুলার অপরাধ প্রমাণ করা নয়; বরং এমন একটি সন্দেহের পরিবেশ তৈরি করা যাকে দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায় এবং ব্রাজিলে মার্কিন হস্তক্ষেপকে বৈধতা দিতে সাহায্য করে।

জইর বলসোনারো

অতি ডানপন্থীদের মিছিল-সমাবেশে বলসোনারোর সমর্থকদের মার্কিন পতাকা হাতে দেখা যায়। সেখানে বামপন্থীদের হাত থেকে ব্রাজিলকে ‘বাঁচাতে’ তাঁরা প্রকাশ্যেই সামরিক ও কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের দাবি জানায়।

কৌশলটি অত্যন্ত পরিচিত। বিশ্বজুড়ে ডানপন্থী আন্দোলনগুলো প্রায়ই অপরাধ, অভিবাসন, রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষ ও সন্ত্রাসবাদের মধ্যকার পার্থক্যকে আবছা করে ফেলে। নিরাপত্তাসংক্রান্ত কঠোর ভাষাকে প্রতিপক্ষকে অবৈধ ঘোষণা করা এবং চরম পদক্ষেপের পক্ষে সাফাই গাওয়ার অস্ত্র বানানো হয়েছে।

মেক্সিকো এর একটি বড় উদাহরণ। মেক্সিকান ড্রাগ কার্টেলগুলোকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার মার্কিন রাজনীতিকদের দাবির সঙ্গে প্রায়ই মেক্সিকোর ভেতরে একতরফা সামরিক অভিযানের প্রস্তাব যুক্ত থাকত। আর কারাকাসের নিরাপদ বাসভবন থেকে নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন বাহিনীর ধরে নিয়ে যাওয়ার পর, লাতিন আমেরিকার যেকোনো নেতার জন্যই ট্রাম্পের একতরফা সামরিক পদক্ষেপের হুমকি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

মূল বিষয় কেবল ওয়াশিংটন কীভাবে হুমকির সংজ্ঞা দেয় তা নয়, বরং সেই সংজ্ঞাকে কাজে লাগিয়ে কোন ধরনের ক্ষমতা বা হস্তক্ষেপকে জায়েজ করার চেষ্টা করা হচ্ছে, তা দেখা। এ প্রশ্ন এখন সরাসরি ব্রাজিলের ওপর এসে পড়েছে।

এটি ব্রাজিলে ব্যবসা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নতুন ধরনের বাধ্যবাধকতা তৈরি করে এবং আর্থিক লেনদেন সংস্থাগুলোকে কঠোর নজরদারির মুখে ফেলে। ব্যাংকগুলোর হয়তো পিসিসি বা সিভির সঙ্গে কোনো প্রত্যক্ষ যোগসূত্র নেই, তবু তাদের প্রমাণ করতে হবে যে তাদের সিস্টেম প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অপরাধীদের ফান্ড ট্রান্সফারে ব্যবহৃত হয়নি।

আর্থিক ক্ষেত্রের এ জটিলতা আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্রাজিলের ‘পিক্স’ নামক সেন্ট্রাল ব্যাংকের ইনস্ট্যান্ট পেমেন্ট সিস্টেম নিয়ে চলমান বিরোধকেও উসকে দেয়। ভিসা বা মাস্টারকার্ডের একটি বড় বিকল্প হয়ে ওঠায় ওয়াশিংটন শুরু থেকেই পিক্সকে বাণিজ্য বিরোধের নজরে দেখে আসছে। অন্যদিকে ফ্লাভিও বলসোনারো প্রস্তাব করেছেন যে অ-পশ্চিমা পেমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে পিক্স-এর ভবিষ্যৎ যোগসূত্র সীমিত করা দরকার।

যদি পিসিসি বা সিভির কোনো ফান্ড পিক্স-এর মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয়, তবে সন্ত্রাসী ঘোষণার অজুহাতে এই ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত মার্কিন নজরদারি চেপে বসবে।

ব্রাজিলের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন যে এ ঘোষণার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রচলিত পুলিশি সহযোগিতা জটিল হয়ে পড়তে পারে। পিসিসি ও সিভি–সংক্রান্ত যৌথ তদন্ত মূলত দুই দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে নিয়মিত গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের ওপর নির্ভর করে।

কিন্তু এদের ‘সন্ত্রাসী’ ঘোষণা করায় এসব তদন্ত এখন গোপনীয় জাতীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা চ্যানেলে স্থানান্তরিত হতে পারে, যা পারস্পরিক নিরাপত্তামূলক সংহতি ও অবাধ সহযোগিতাকে শক্তিশালী করার বদলে আরও কঠিন করে তুলবে।

এর তাৎক্ষণিক ফলাফলের বাইরেও, এ সিদ্ধান্ত ব্রাজিলের নিরাপত্তানীতিতে মার্কিন হস্তক্ষেপের এক নতুন নজির তৈরি করল। লাতিন আমেরিকা অতীতে বহুবার এ ইতিহাস দেখেছে।

স্নায়ুযুদ্ধের পুরোটা সময় ওয়াশিংটন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বগুলোকে সাম্যবাদের বিরুদ্ধে বড় এক আদর্শিক লড়াইয়ের অংশ বানিয়ে সামরিক হস্তক্ষেপের অজুহাত দিত। আজ সাম্যবাদবিরোধিতার সেই পুরোনো জায়গা দখল করেছে ‘সন্ত্রাসবাদবিরোধী’ লড়াই। যদিও ট্রাম্প ও অতি ডানপন্থীরা আবার সেই সাম্যবাদের জুজু ফেরত এনেছে এবং তাদের বামে থাকা যেকোনো মতবাদকেই এ তকমা দিচ্ছে।

একতরফাভাবে কোনো বিষয়ের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা এবং সেই সংজ্ঞা বিদেশে রপ্তানি করার মাধ্যমে ওয়াশিংটন এমন স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের নতুন পথ খুঁজে নেয়, যেসব দেশ আগেও মার্কিন হস্তক্ষেপের শিকার হয়েছে।