দুর্গম হাচৌকপাড়া এলাকার শিশু ওরা। স্কুল অনেক দূরে—দশ থেকে বারো কিলোমিটার তো হবেই। দুর্গম পথে ভরসা কেবল দুখানি পা। হৃদয় মেম্বারপাড়া, মাটিরাঙ্গা, খাগড়াছড়ি
দুর্গম হাচৌকপাড়া এলাকার শিশু ওরা। স্কুল অনেক দূরে—দশ থেকে বারো কিলোমিটার তো হবেই। দুর্গম পথে ভরসা কেবল দুখানি পা। হৃদয় মেম্বারপাড়া, মাটিরাঙ্গা, খাগড়াছড়ি

মতামত

জ্বালানিসংকটে মিশ্র ক্লাস: প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কী হবে

বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটকে সাময়িকভাবে মোকাবিলা করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একটি সিদ্ধান্ত এসেছে—বিশ্ববিদ্যালয় বাদে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্লেন্ডেড পদ্ধতিতে শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। অর্থাৎ অনলাইন ও অফলাইনে সপ্তাহে তিন দিন করে দুইভাবে শিক্ষাকার্যক্রম চলবে, যত দিন না বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটের নিরসন হয়। বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি উন্নয়নশীল, অনুন্নত এমনকি উন্নত সব দেশেই দ্রুত বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে জ্বালানিসংকটের তীব্রতা সারা বিশ্বে বিশেষত এশিয়ার দেশগুলোতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশেও ইতিমধ্যে জ্বালানিসংকট প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে।

জ্বালানিসংকটের সময়ে বিদ্যুৎ সাশ্রয় বা খরচ বাঁচানোর জন্য সরকার ভাবছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্লেন্ডেড অর্থাৎ মিশ্র পদ্ধতিতে ক্লাস নেওয়ার। আমরা সবাই জানি, কোভিড মহামারিতে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশও শিক্ষাব্যবস্থায় মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এ ছাড়া দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। দেশের এসব চরম পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে মনোনিবেশ করতে পারেনি। জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের অসীম সাহস আর ত্যাগকে আমরা কোনোভাবে অস্বীকার করতে পারি না। তাই সেসব ত্যাগের কথা চিন্তা করে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পাবলিক পরীক্ষায় সিলেবাস কমিয়ে দেওয়াসহ শিক্ষাসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষ ছাড় করেছিল।

২০২৬ সালের প্রথমদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও মাসব্যাপী রমজানের কারণেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার ওপর যথেষ্ট প্রভাব পড়েছিল। সেসব ঘাটতি পূরণের জন্য বন্ধের দিনে শনিবার (প্রথম পর্যায়ে ১০ সপ্তাহ) ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে নেওয়া হয়েছে।

এরই মধ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক যে জ্বালানিসংকট দেখা দিয়েছে, তা থেকে সাময়িক পরিত্রাণের জন্য এবং দিনের আলোর পরিপূর্ণ ব্যবহার ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য সপ্তাহে তিন দিন করে মিশ্র পদ্ধতিতে পাঠদানের সিদ্ধান্ত সরকারের পক্ষ থেকে প্রায় চূড়ান্ত করা হয়েছে। অপর দিকে বলা হচ্ছে, সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খোলা থাকবে।

এ মিশ্র পদ্ধতিতে পাঠদান করার প্রস্তাব আনার আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঢাকা শহরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতামত নেয় বলে সংবাদপত্রের মাধ্যমে জানা যায়। আর এ ব্লেন্ডেড পদ্ধতিতে পাঠদানের যৌক্তিকতা হিসেবে বলা হচ্ছে, কোভিডকালে যে পদ্ধতিতে অনলাইনে ক্লাস নেওয়া হয়েছে, সেই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা মোটামুটি অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে। তাই এ পদ্ধতিতে শিক্ষাকার্যক্রম চালালে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে এবং বর্তমান জ্বালানিসংকটকালীন পরিস্থিতিকেও মোকাবিলা করা অধিকতর সহজ হবে।

কিন্তু আমাদের আশঙ্কার জায়গাটি অন্য জায়গায়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় যে মিশ্র পদ্ধতির কথা ভাবছে, সেটা কার্যকর হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চল, দেশের উপকূলীয় এবং হাওরের স্কুলের শিক্ষার্থীরা, যাদের অভিভাবকদের হাতে স্মার্টফোন দূরে থাক, সাধারণ বাটন ফোনও নেই! পাহাড়ি এলাকার ক্ষেত্রে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জিং হবে তা হলো—বিদ্যুৎ–সুবিধাই যেখানে পৌঁছেনি, সেখানে স্মার্টফোন, অনলাইন ক্লাস এসব ইস্যু জুমিয়া অভিভাবকদের কাছে বিলাসিতার অংশ ছাড়া আর কিছু হবে না। তদুপরি আদিবাসী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ভাষাগত সমস্য তো আছেই। তা ছাড়া সরকারের এ প্রস্তাবে আরও যেটি নির্দেশনায় আছে তা হলো—শিক্ষার্থীরা বাড়িতে বসে অনলাইন ক্লাস করলেও শিক্ষকদের সপ্তাহে ছয় দিনই স্কুলে সশরীরে উপস্থিত থাকতে হবে।

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, পাহাড় কিংবা হাওরের অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয় বিদ্যুৎ–সুবিধার আওতায় আসেনি। ফলে সেখানে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের প্রশ্নটি প্রচণ্ডভাবে অবাস্তব ও অবান্তর। আর তা ছাড়া যেসব বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ–সংযোগ আছে, সেসব প্রতিষ্ঠানে মাসিক বিদ্যুৎ বিল হয় ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা। অন্যদিকে আমরা যদি সরকারি বড় বড় অফিস–আদালতগুলোর দিকে তাকাই তাহলে অধিকাংশ আধুনিক ভবন কেন্দ্রীয়ভাবে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত। যেমন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের কথাই ধরা যাক। একটি অথর্ব প্রতিষ্ঠান যার কোনো দৃশ্যমান কাজ আজ অবধি নেই, সেই প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ কেন্দ্রীয়ভাবে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত, যার মাসিক বিদ্যুৎ বিল কমপক্ষে তিন থেকে চার লাখ টাকা।

তাই আমরা মনে করি, এসব বড় বড় কর্মহীন অফিসগুলোকে কৃচ্ছ্রসাধনের আওতায় এনে দূরবর্তী প্রান্তিক অঞ্চলের স্কুল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদানের কার্যক্রম বর্তমান চলমান পদ্ধতিতে রাখা হোক। আর মিশ্র পদ্ধতির আওতায় শুধু বিভাগীয় এবং জেলা-উপজেলা সদরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আনা হোক। একই সঙ্গে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় অফলাইন না করে অনলাইন পদ্ধতির আওতায় আনা হোক।

আমরা এটা তো মানি যে, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া প্রতিটি শিক্ষার্থীর হাতে নিদেনপক্ষে একটি স্মার্টফোন থাকে। কাজেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সম্পূর্ণ অনলাইনের আওতায় আনলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় বহুলাংশে কমবে। শিশুদের ওপর মানসিক চাপ না বাড়িয়ে বরং তাদেরকে মুক্ত ও স্বাভাবিক পরিবেশে রেখে শিক্ষাদান অব্যাহত রাখা অনেক বেশি শ্রেয় হবে। ঢাকা শহরে প্রতিটি বাচ্চার পেছনে দৈনিক যে জ্বালানি খরচ হয় সেটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা হোক। কিন্তু জ্বালানি সাশ্রয়ের অজুহাতে আমাদের দেশের গ্রামের প্রান্তিক শিশুদের লেখাপড়ার স্বাভাবিক গতিকে বাধাগ্রস্ত করা কোনোভাবে যৌক্তিক হবে না।

বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মানোন্নয়নে যথেষ্ট সচেতন ও কঠোর সে কথা আমাদের সবার জানা আছে। দেশের শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য অতীতে নকল বন্ধে তাঁর কঠোর ভূমিকা সম্পর্কে আমরা যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। তাই আমরা বিশ্বাস রাখি, তিনি বর্তমান এ বৈশ্বিক সংকটকে কাটিয়ে উঠতে সময়োপযোগী সিদ্ধান্তই গ্রহণ করবেন।

আগামী জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। পরীক্ষার্থীরা যাতে নির্বিঘ্নে পরীক্ষাকেন্দ্রে পরীক্ষায় বসতে পারে সেটা নিয়েও আমাদের আগাম প্রস্তুতি রাখা জরুরি। বিগত দুই বছর এবং তারও আগে কোভিডকালে আমাদের ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের ওপর নানা রকম চ্যালেঞ্জ ও ধকল গেছে। তাই তাদেরকে আর চ্যালেঞ্জের মুখে না ফেলে বিকল্প সমাধানের পথ খুঁজে নিতে আমাদের এখনই সচেষ্ট হতে হবে।

  • ইলিরা দেওয়ান কমিশনার, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন

    মতামত লেখকের নিজস্ব