প্রতিক্রিয়া

আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়, এটি নিজেই একটি সমস্যা

মানসিক অবসাদ থেকে সহজ ও মুক্তির পথ হিসেবে আজকাল আত্মহত্যাকে বেঁচে নিচ্ছে দেশের সার্বোচ্চ বিদ্যাপিঠের অনেকেই। উদ্বেকজনক হারে বাড়ছে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতা। কয়দিন পরপর এমন ঘটনা আমরা দেখছি। সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদমাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া কয়েকজনের আত্মহত্যার খবর প্রকাশ পায়। বিভিন্ন কারণে এইসব ঘটনা ঘটছে। এই আত্মহত্যার  ঘটনাগুলো আমাদের ভাবিয়েছে এবং ভাবাচ্ছে। কিন্তু সমস্যা সমাধানে আত্মহত্যাই একমাত্র পথ নয়। বেঁচে থাকার আকুতি প্রতিটি জীবের সহজাত প্রবৃত্তি । পরিবেশের সাথে লড়াই করে কীভাবে টিকে থাকতে হয় তার কৌশল জীবের মধ্যে লুকিয়ে আছে। সব মানুষই বাঁচতে চাই। তারপরও কিছু মানুষ আত্মহত্যার পথ বেঁচে নেই। বেঁচে থাকা তাদের জন্য এতোটাই কষ্টের হয় যে, মরে যাওয়ার মাধ্যমে মুক্তির স্বাধ খুঁজে তারা। নারী আত্মহত্যার চেষ্টা করে বেশি, কিন্তু আত্মহত্যার কারণে মৃত্যু বেশি হয় পুরুষের।  

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, প্রতি বছর সারা পৃথিবীতে আট লক্ষেরও বেশি মানুষ আত্মহত্যা করে। যার অর্থ প্রতি ৪০ সেকেন্ডে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও একজন মানুষ আত্মহত্যা করে থাকেন। এছাড়াও আরো বহুগুণ মানুষ আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। সারা বিশ্বে যত আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে থাকে তার ৭৫ শতাংশ হয়ে থাকে নিম্ন বা মধ্য আয়ভুক্ত দেশগুলোতে।  এই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান হলো দশ নম্বরে।
গোটা দুনিয়ায় ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যাই মৃত্যুর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কারণ। ২০১২ সালের পরিসংখ্যান অনন্ত এরকমই বলছে।

শিক্ষার্থীদের  আত্মহত্যা নিয়ে কাজ করা সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন  আঁচল  ফাউন্ডেশনের একটি গভেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,  বাংলাদেশের  বিশ্ববিদ্যালয়সহ  উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেবল ২০২১ সালেই কেবল  ১০১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। আত্মহত্যা করা ১০১ জনের মধ্যে ৬২ জন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এই ১০১ জনের মধ্যে ৬২ জন ছেলে ও ৩৬ জন মেয়ে।

এতো আত্মহত্যার কারণ হিসেবে ধরা হয় মূলত বেকারত্ব, মানসিক চাপ,তীব্র বিষন্নতা, একাকিত্ব, পারিবারিক জটিলতা,সম্পর্কের অবনতি, পড়াশোনা নিয়ে হতাশা, আর্থিক সংকটকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে সেশনজটে পড়ে পিছিয়ে যাওয়া, চাকরি পাওয়ার অনিশ্চিয়তা, পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা এইসব কারণে বিষন্নতা তৈরী হচ্ছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। যা আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু এটাও মানতে হবে যে আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়।  তাছাড়া মানসিক  স্বাস্থ্যের বিষয়ে আমরা  উদাসীন। কেন যেন মানতেই পারি না ভালো মন্দ যাই ঘটুক, সেটি জীবনেরই অংশ। জীবনটা অনেক মূল্যবান। আমাদের নিজেদের সচেতন হতে হবে। আত্মবিশ্বাস না হারিয়ে ধৈর্য্যশীল হতে হবে। প্রতিযোগিতা নয়  বরং সহযোগিতাই পারে পৃথিবীটাকে বদলে দিতে। একটি মানুষ  আত্মাহত্যার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন  তখন তার মধ্যে জ্ঞান বুদ্ধি কাজ করে না।  কত তুচ্ছ কারণেই না মানুষ আত্মহত্যা করে।  ভাবতেই ভীষণ দুঃখ লাগে।  

আমরা কি কিছু করতে পারি না?  আশেপাশের নিরাশাগ্রস্থ মানুষগুলোকে  কি একটু সাহস যোগাতে পারি না? যারা নিজেরা নিজেদেরকে  সহায়তা করতে পারছে না  তাদের মনোবল বৃদ্ধিতে  আপন করে একটু কথা বলতে পারি না?

হ্যা পারি। যারা মরতে চাই  তাদের মনকে জীবনের প্রতি ভালোবাসা  তো জাগাতে পারি। বেশি কিছু না একটু উদ্যোগী হতে বলছি।  অশনি সংকেত পেতে চোখ কান সজাগ রাখতে হবে। আমাদের আশেপাশের কেউ যেন মানসিক সমস্যার গুমরে না মরে।  আসুন আত্মহত্যাকে না বলি, জীবনকে ভালোবাসতে শিখি।

মোস্তফা কামাল
শিক্ষার্থী : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল: mustofa9988aa@gmail.com