তিন জোটের রূপরেখা নির্বাসনে

অর্জন শুধু এরশাদের পতন!

কার্টুন : শিশির
কার্টুন : শিশির

তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও পূর্ণ গণতন্ত্র, কার্যকর জাতীয় সংসদ, নাগরিকের মৌলিক অধিকার, আইনের শাসন ও সুশাসন নিশ্চিত করার বিষয়গুলো থেকে রাষ্ট্র অনেক দূরে অবস্থান করছে। স্বৈরাচার এইচ এম এরশাদের পতন ঘটলেও গত আড়াই দশকে গণতন্ত্রের জাগরণ বা বিকাশ যেমন ঘটেনি, তেমনি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও আসেনি পরিবর্তন।
রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সংসদবিষয়ক গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্বৈরাচার এরশাদকে হটাতে তিন জোটের ওই রূপরেখা ছিল স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে জাতীয় রাজনীতিতে ঐক্যের মাইলফলক। কিন্তু গত ২৫ বছরে রূপরেখার অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়নি বড় দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। আর বাম দলগুলো সেই সব অঙ্গীকার কার্যকরের দাবি অনেকাংশে ভুলে গেছে বা এড়িয়ে চলছে।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৫ দল, বিএনপির নেতৃত্বে সাত দল ও ওয়ার্কার্স পাটিং-জাসদের নেতৃত্বে পাঁচটি বাম দল ১৯৯০ সালের ২১ নভেম্বর যৌথভাবে ওই রূপরেখা ঘোষণা করেছিল। জামায়াত তিনদলীয় জোটে না থাকলেও এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তাল মিলিয়ে অংশ নেয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, দেশে একধরনের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকলেও রাজনীতি ও সমাজজীবনে ক্রান্তিকাল চলছে। অনেক ক্ষেত্রেই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি থাকলেও খুন, নাশকতা, নৃশংসতা, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো নাগরিকদের উদ্বিগ্ন ও অতিষ্ঠ করে তুলেছে। গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা থেকে বিচ্যুত হয়ে দেশ অনেকটা ‘একমুখী’ সড়কে হাঁটছে।
জানতে চাইলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান প্রথম আলোকে বলেন, তিন জোটের রূপরেখায় রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ও গণতন্ত্রের চর্চায় অনেকগুলো সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার থাকলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেগুলো প্রতিপালন করা হয়নি।
রওনক জাহানের মতে, রূপরেখা অনুযায়ী একটি ‘সার্বভৌম সংসদ’ প্রতিষ্ঠিত হলেও জবাবদিহির প্রশ্নে এটি কার্যকর হয়নি। ১৯৯৪ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত নির্বাচিত সাংসদেরা সংসদ বয়কট করায় সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা হয়নি। এতে সংসদে সরকারি দল বা জোটের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত চারটি জাতীয় নির্বাচনে (১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাদ রেখে) দুইবার সরকারে ও দুবার বিরোধী দলে থাকা বিএনপি এখন সংসদের বাইরে। অন্যদিকে ২০০৮ সালে ৭ দশমিক ০৪ শতাংশ ভোট পাওয়া এরশাদের জাতীয় পার্টি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নিয়ম রক্ষার নির্বাচনের পর সরকারেও আছে আবার বিরোধী দলের ভূমিকায়ও আছে।
এ নিয়ে সরকারদলীয় নেতাদের বক্তব্য হচ্ছে, বিএনপি নির্বাচন বর্জনই শুধু করেনি, তা প্রতিহত করার ঘোষণা দেয়। এমনকি জ্বালাও-পোড়াও ও সহিংসতা করে নির্বাচন ঠেকাতে ব্যর্থ হয়। আর বিএনপির নেতাদের বক্তব্য হচ্ছে, সরকারের কূটচালে পড়ে এবং সরকারি দলের বিজয় নিশ্চিত করার সব আয়োজন দেখে দলটি প্রহসনের নির্বাচন বর্জন করে।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, যে দলের পক্ষে যেমন যুক্তিই দেওয়া হোক না কেন, এ দেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভোট প্রায় অর্ধেক অর্ধেক। এ দুটি দলের দূরত্ব কমাতে না পারলে সংসদ কার্যকর বা সার্বভৌম, যা-ই বলা হোক না কেন, কার্যত এটা একদলীয় সংসদই হয়ে থাকবে। তাঁর মতে, দুঃখজনক হচ্ছে, বিরোধী দল রাজনীতিকে সংসদের বাইরে রাজপথে নিতে চায়, আর সরকারও তাদেরকে সংসদে ধরে রাখার চেষ্টা না করে রাজপথে নিয়ে মোকাবিলা করতে চায়। এই গবেষকের দৃষ্টিতে দায়িত্বশীল সরকার ও নিয়মতান্ত্রিক বিরোধী দলই গণতন্ত্রের চাবিকাঠি।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, দেশের রাজনৈতিক সংকট যত গভীর হচ্ছে, ততই তিন জোটের রূপরেখায় উল্লেখ থাকা বিষয়গুলো সামনে চলে আসছে। কিন্তু যেকোনো উপায়ে ক্ষমতায় টিকে থাকা বা ক্ষমতা পাওয়ার রাজনীতিতে গণতন্ত্র, সুশাসন ও মৌলিক অধিকারের বিষয়গুলো অনেক ক্ষেত্রেই ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষমতার ক্ষুধা এতটাই বেশি যে সেই ক্ষুধা মেটাতে গিয়ে দেশ থেকে গণতন্ত্র বিদায় হয়েছে।’ তাঁর মতে, স্বাধীনতা-পরবর্তী ৪৪ বছরের শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক অর্জন ছিল ওই রূপরেখা, যার মূল কথা ছিল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই গণতন্ত্র শিকড়সুদ্ধ উপড়ে ফেলে অগণতান্ত্রিক পন্থায় দেশ চলছে।
এক প্রশ্নের জবাবে এমাজউদ্দীন বলেন, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা থাকলেও ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নৈতিকভাবে ভয়ংকর প্রশ্নবিদ্ধ, যেখানে অর্ধেকেরও বেশি আসনে মানুষ ভোট দেওয়ার সুযোগই পায়নি।
নব্বইয়ের ডিসেম্বর থেকে একানব্বইয়ের আগস্ট পর্যন্ত রূপরেখা অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় সব দলের সম্মতিতে ১৬ বছরের মাথায় ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারের পরিবর্তে সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়। আর রাজনীতিতে সমঝোতার ভিত্তিতে সর্বশেষ অর্জন করা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বর্তমান সরকারের সময়ে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বিলুপ্ত করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, নব্বইয়ে তিন জোটের রূপরেখা সইয়ের সময় পাঁচ দলের পক্ষ থেকে পরবর্তী তিনটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করার প্রস্তাব ছিল। কিন্তু সেটি তখন গ্রহণ করা হয়নি। তাঁর মতে, রূপরেখা অনুযায়ী সংসদীয় গণতন্ত্র চালু হলেও এ পর্যন্ত সংসদ পরিচালিত হয়েছে একদলীয়ভাবে। তাই এক অর্থে সংসদ আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর থাকলেও এর কার্যকারিতা অন্য অর্থে নেই।
কেউ কাউকে বিশ্বাস করেনি: নব্বই-পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনগুলোতে বিএনপির শাসনামলে আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিএনপি একে অপরকে বিশ্বাস করেনি, এক দল অপরের বিজয়কেও মেনে নেয়নি। পরাজিত দল সব সময়ই বিজয়ীর বিরুদ্ধে সূক্ষ্ম কারচুপি, স্থূল কারচুপি বা ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ তুলেছে।
সর্বশেষ ২০১৩ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা উঠে যাওয়ায় সেই অবিশ্বাসের সংস্কৃতি গণতন্ত্র, নির্বাচন ও সংসদকে বিপদাপন্ন করে তোলে। এখন সংসদের বিরোধী দল এরশাদেরই জাতীয় পার্টি, বিরোধী দলের নেত্রী হয়েছেন এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদ এবং জাতীয় পার্টির পাঁচ নেতাই মহাজোট সরকারের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী। আর সাড়ে নয় বছরের স্বৈরশাসক এরশাদ নিজে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতের মর্যাদা ভোগ করছেন।
এ প্রসঙ্গে তিন জোটের রূপরেখা প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত জাসদের সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, ব্যক্তি এরশাদকে কেউই ছাড় দেননি। তিনি আইনি প্রক্রিয়ায় সাজা বা রেহাই পেয়েছেন। এখনো তাঁর বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা বিচারাধীন।
জানতে চাইলে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা স্বৈরাচারের ফেলে যাওয়া জুতার মধ্যে পা ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম ।’ তাঁর মতে, সরকার গঠনের পর বিএনপি তিন জোটের রূপরেখা থেকে প্রথম সরে যায় দুটি মহিলা আসন দিয়ে জামায়াতের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলার মাধ্যমে। সর্বশেষ মিরপুর ও মাগুরার উপনির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের কফিনে পেরেক ঠুকে দেয় বিএনপি।
জামায়াত ও জাপা নিয়ে বড় দুই দলের টানাটানি: পর্যালোচনায় দেখা যায়, নির্বাচনের আগে বা পরে সরকার গঠনের জন্য যুদ্ধাপরাধীর দল জামায়াতে ইসলামীকে কাছে টানার চেষ্টা ছিল দুই দলেরই। জামায়াতের সমর্থন নিয়ে একানব্বইয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে। আবার আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও জাতীয় পার্টি সম্মিলিত বিরোধী দল গঠন করে ’৯৪ সালের ২৭ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করে। এ প্রসঙ্গে মিজানুর রহমান চৌধুরী ২৮ ডিসেম্বর সম্মিলিত বিরোধী দল ও বিএনপি সরকারের আলোচনা সভার কথা উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘আলোচনা ভেঙে যাওয়ায় পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতের ১৪৭ জন সংসদ সদস্য একযোগে পদত্যাগ করেন।’ (রাজনীতির তিন কাল, পৃষ্ঠা-২৯২)
আবার এই জামায়াতই ২০০১ সালের পর বিএনপির নেতৃত্বাধীন ‘কোয়লিশন সরকারে’ অংশ নেয় এবং জামায়াতের যুদ্ধাপরাধী দুই নেতা মন্ত্রী হন।
নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান স্বৈরাচার সরকারের পতন ঘটিয়ে গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য হলেও স্বৈরাচারকে নিয়েই বড় দুই দল টানাটানি করেছে। সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর সময় জাতীয় পার্টির সমর্থন পাওয়ার জন্য বিএনপি সরকার ১৯৯১ সালের ৫ আগস্ট রাতে কারাগারের ভেতরে এরশাদের সঙ্গে জাতীয় পার্টির নেতাদের বৈঠকের আয়োজন করে। ওই বৈঠকে উপস্থিত এরশাদ সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরী রাজনীতির তিন কাল বইয়ে এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘সরকার চাইলে কি না হয়!’ তিনি আরও লিখেছেন, সংশোধনীতে সই দিলে পরদিনই রওশন এরশাদকে মুক্তি এবং এরশাদের মামলাগুলো পর্যালোচনা করে শিগগির তাঁকে জামিন দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। পরে অবশ্য আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সমঝোতা হয়ে গেলে জাতীয় পার্টির সমর্থন আর দরকার হয়নি, ৬ আগস্ট দ্বাদশ সংশোধনী পাস হয়।
আবার ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি হেরে গেলে জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগকে সমর্থন দেয়। এর বিনিময়ে ৩০টি সংরক্ষিত মহিলা আসন থেকে তিনটি জাতীয় পার্টিকে দেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে মিজানুর রহমান চৌধুরী লিখেছেন, ‘আমরা যাতে আওয়ামী লীগকে সমর্থন না দিয়ে বিএনপিকে সমর্থন দেই, সে জন্য বিএনপি অনেক দেনদরবার করে।’
১৯৯৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াত যৌথ আন্দোলনের ঘোষণা দেয়, যার সঙ্গে পরে যোগ দেয় ইসলামী ঐক্যজোট। তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই আন্দোলনকে ভোট চোর, স্বৈরাচার ও রাজাকারদের আন্দোলন বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।
এভাবে রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে জামায়াত বিএনপির সঙ্গে জোট গড়ে তোলে, আর জাতীয় পার্টি আনুষ্ঠানিক জোট না গড়লেও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের বাইরে মহাজোট সরকার ও বিরোধী দলে রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, বড় দুটি দল জামায়াত ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে সম্পর্ক করেছে ভোট ও ক্ষমতার রাজনীতির জন্য। এখন সংসদে বিরোধী দল বলে যেটি চলছে, তা ‘নতুন আবিষ্কার’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তত্ত্ব, গণতান্ত্রিক দেশের দৃষ্টান্ত, বইপত্র বা গবেষণা—কোথাও বিরোধী দলের এমন বিরল দৃষ্টান্ত নেই। এমনকি এরশাদের সময় যে গৃহপালিত বিরোধী দল ছিল, তারাও এখনকার বিরোধী দলের মতো মন্ত্রিসভায় থাকেনি।
সার্বভৌম সংসদ প্রতিষ্ঠা: রূপরেখার মূল কথা ছিল ‘সার্বভৌম সংসদ’ প্রতিষ্ঠা করা এবং এর চেতনা ছিল গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধারণ করে সংসদীয় গণতন্ত্র অংশগ্রহণমূলক করা। যদিও সপ্তম থেকে নবম সংসদ পর্যন্ত সংসদ চলেছে অনেকটা বিরোধী দল ছাড়াই।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী সংসদীয় গণতন্ত্র চালু হয়েছে এবং সেই ধারায় দেশ চলছে।
তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু অবশ্য মনে করেন, গত কয়েক বছরে সংসদীয় গণতন্ত্রে একধরনের ভারসাম্য এসেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি সংসদে স্থায়ী কমিটি গঠন, কমিটিতে বিরোধী দলের সাংসদকে নেওয়া, নারী আসন ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করাসহ বিভিন্ন অগ্রগতির কথা উল্লেখ করেন।
অবশ্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধী দল ছাড়া সংসদীয় গণতন্ত্র কার্যকর হতে পারে না। জাতীয় সংসদের নথিপত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সপ্তম সংসদে বিএনপি বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় মোট কার্যদিবস ছিল ৩৮৩দিন। এর মধ্যে বিএনপি বর্জন করে ১৬৩দিন। অন্যদিকে অষ্টম জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় মোট কার্যদিবস ছিল ৩৭৩দিন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ বর্জন করে ২২৩ দিন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বৈরাচার হটানোর লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র, যা এ দেশে বারবার পদপিষ্ট করা হয়েছে। তিনি মনে করেন, এখন দেশে তিন জোটের রূপরেখার সম্পূর্ণ উল্টো অবস্থা বিরাজ করছে। ৫ জানুয়ারির একপেশে ও গোঁজামিলের নির্বাচনের মাধ্যমে এমন সংসদ আমরা পেয়েছি, যেখানে স্বৈরাচারের দলই একদিকে সরকারের অংশ, অন্যদিকে বিরোধী দলের ভূমিকায়।
আইনের শাসন ও মৌলিক অধিকার সুরক্ষা: রূপরেখায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী সব আইন বাতিল করার কথা বলা হয়েছিল।
আইনজ্ঞরা বলছেন, বিশেষ ক্ষমতা আইনসহ মৌলিক অধিকারপন্থী আইন বাতিল হওয়া দূরে থাক, বরং সন্ত্রাস দমন আইন, দ্রুত বিচার আইন এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনসহ এমন সব নতুন আইন যুক্ত হয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে বিনা বিচারে জেলে রাখা যায়, সন্দেহের বশে গ্রেপ্তার করা যায়। এ ছাড়া সন্ত্রাসী ও জঙ্গিরা একদিকে নৃশংসভাবে খুন-খারাবি করছে, অপর দিকে একের পর এক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আইনের শাসন নিশ্চিত করার বদলে তা পদদলিত হচ্ছে।
অধ্যাপক রওনক জাহান বলেন, বিভিন্ন গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দেশে আইনের শাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নিম্নমুখী প্রবণতা রয়েছে। এর কারণ, যারা ক্ষমতায় আসে, তারা রাষ্ট্রীয় সংস্থা ও সম্পদকে সরকারি দলের সুযোগ-সুবিধার কাজে ব্যবহার করে এবং অন্যায়ভাবে বিরোধীদের শাস্তি দেয়। এটা করতে গিয়ে আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর পরিবর্তে আইনকানুন লঙ্ঘন করে সরকার।
এদিকে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর মাসদার হোসেন মামলার রায় অনুযায়ী বিচার বিভাগ পৃথক্করণ হলেও এই বিভাগের স্বাধীনতা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। পৃথক্করণের পর দেখা গেছে, বিভিন্ন বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের মতবিরোধ প্রকট হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে তিন জোটের রূপরেখা প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘বিচার বিভাগ পৃথক হয়েছে মূলত সুযোগ-সুবিধা ও বেতন-ভাতাকে কেন্দ্র করে। আমরা চেয়েছিলাম সেই স্বাধীনতা, যার মাধ্যমে বিচারের প্রক্রিয়ায় গতি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।’
রেডিও-টেলিভিশনের স্বায়ত্তশাসন: তিন জোটের রূপরেখায় রেডিও-টেলিভিশনের স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার অঙ্গীকার ছিল। নব্বইয়ে এরশাদের পতনের পর সাহাবুদ্দীন আহমদের সময় রাষ্ট্রীয় ওই প্রচারমাধ্যমে নিরপেক্ষতা ফিরে আসে। কিন্তু ওই নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি কমিটি বা কমিশন হলেও সরকারের কবজায় থাকছে রেডিও-টেলিভিশন।
এ প্রসঙ্গে হাসানুল হক ইনু বলেন, নব্বইয়ে যখন দেশে বেসরকারি গণমাধ্যম ছিল না, তখন এই দাবি যৌক্তিক ছিল। কিন্তু এখন বেতার, টিভি ও কমিউনিটি রেডিওর ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। এর মাধ্যমে যেভাবে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা হয়েছে, তাতে রেডিও-টিভির স্বায়ত্তশাসন এখন অপ্রাসঙ্গিক।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডেইলি স্টার-এর সম্পাদক মাহফুজ আনাম প্রথম আলোকে বলেন, রেডিও-টিভির স্বায়ত্তশাসনের দাবি এখন মৃতপ্রায়। কিন্তু জনগণের করের টাকায় জনস্বার্থে এসব গণমাধ্যম চলার কথা, সরকারের স্বার্থে নয়।
সরকারি গণমাধ্যম সরকারের হাতে রেখে বেসরকারি গণমাধ্যম উন্মুক্ত করে দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন রাখেন, তাহলে বিষয়টি কি এমন যে সরকারি গণমাধ্যম সরকারের খবর প্রকাশ করবে, আর বেসরকারি গণমাধ্যম সরকারের খবর প্রকাশ করবে না?
গণমাধ্যম চাপের মধ্যে আছে উল্লেখ করে মাহফুজ আনাম বলেন, গণতান্ত্রিক পরিবেশে যেভাবে গণমাধ্যমের চলার কথা, সেভাবে চলছে না। এমন ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে, যেখানে গণমাধ্যম নিজের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার (সেলফ সেন্সরশিপ) শিকার। তা ছাড়া গণমাধ্যমের ওপর গোয়েন্দা সংস্থার প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
আচরণবিধিও মানা হয়নি: রূপরেখার পাশাপাশি আচরণবিধিতে বলা ছিল, ‘আমাদের তিনটি জোটভুক্ত রাজনৈতিক দলসমূহ নির্বাচনী বক্তব্য ও কার্যক্রমে পারস্পরিক মতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও পরমতসহিষ্ণুতার সাধারণ গণতান্ত্রিক নীতিমালা অনুসরণ করবে ।’ আরও বলা হয়েছিল সংঘাত পরিহার করাসহ দেশপ্রেম ও ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে কটাক্ষ করা থেকে বিরত থাকার কথা।
নব্বইয়ের ক্রান্তিলগ্নে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়া বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ বলেন, ‘সংঘাতের পরিবর্তে সমঝোতা অপরিহার্য; সমঝোতা সৃষ্টি করতে হলে প্রত্যেকেরই কিছু না-কিছু ছাড় দিতে হয়; নিজ নিজ অবস্থান থেকে কিছুটা সরে আসতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশে কোনো নেতা বা দল দেহে প্রাণ থাকতে নিজেদের ভুলত্রুটি স্বীকার করবে না এবং নিজ নিজ অবস্থান থেকে চুল পরিমাণও নড়বে না।’ (ভাষণ সংকলন, গণতন্ত্রে উত্তরণ, গণতন্ত্র বিনির্মাণ; পৃষ্ঠা ১৩৪—১৩৫)।

আরও পড়ুন: