মানবাধিকার সম্মেলনে সুজন সম্পাদক

দেশে এক দিনের গণতন্ত্র ছিল, সেটিও হারিয়েছি

সম্মেলনে বক্তব্য দেন সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। আজ রাজধানীর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মিলনায়তনে
ছবি: প্রথম আলো

দেশের নির্বাচন ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তুোষ প্রকাশ করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার।

আজ শনিবার রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এ কে এম গিয়াস উদ্দিন মিল্কী অডিটরিয়ামে ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি’ আয়োজিত সপ্তম মানবাধিকার সম্মেলনে সুজন সম্পাদক এ অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘একটা সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়। জনগণ ভোটাধিকারের মাধ্যমে মতামত দিতে পারেন, পছন্দের প্রার্থীকে বেছে নিতে পারেন। কিন্তু আমাদের ভোটাধিকারের কী হলো? বাই বাই।’ তিনি বলেন, ‘কিছুদিন আগপর্যন্ত আমাদের এক দিনের গণতন্ত্র ছিল।

অর্থাৎ ভোটের দিন আমরা সবাই রাজা-রানি হওয়ার সুযোগ পেতাম। সেটিও আমরা হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে।’

সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ নয়, প্রশাসনের কাছে দায়বদ্ধ—মন্তব্য করে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘নির্বাচনে জনগণের ভোটের প্রয়োজন হয় না। তাই সরকার দায়বদ্ধ আমলা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে। কারণ, তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে ক্ষমতায় এসেছে মধ্যরাতের ভোটের মাধ্যমে। তাদের কি আর সেই দায়বদ্ধতা আছে?’

বদিউল আলম মজুমদার আরও বলেন, স্বাধীনতাযুদ্ধ হয়েছিল মানুষের অধিকারের চারটি ভিত্তি প্রতিষ্ঠার জন্য। এর অন্যতম গণতন্ত্র। ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলেই কেবল মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব। তিনি বলেন, ‘আমাদের মহান সংসদকে বলা হয় “হাউস অব দ্য পিপল”। তার মানে জনগণের প্রতিনিধিরা সংসদে বসবেন, তাদের কল্যাণে ও স্বার্থে কাজ করবেন। এখন কি আমাদের “হাউস অব দ্য পিপল” আছে? এখন সংসদ হচ্ছে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধিদের, জনগণের নয়। কারণ, তাঁরা জনগণের ভোটে সেখানে যায়নি।’

সম্মেলনে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, মানবাধিকার অনুযায়ী মানুষ তাঁর পছন্দমতো দল, মতাদর্শ অনুসরণ করতে পারবেন। কিন্তু আজ দেশে সেই অধিকার নেই।

সুস্থভাবে, স্বাস্থ্য উপযোগী পরিবেশে বেঁচে থাকাও মানবাধিকার উল্লেখ করে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘চলমান উন্নয়ন মডেলকে “রি–মডেল” না করলে, জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিপর্যয় আটকানো যাবে না। যদি আটকানো না যায়, তাহলে বাংলাদেশের মানচিত্র ভিন্নভাবে আঁকতে হবে। ২১টি উপকূলীয় জেলা বাদ দিয়ে আঁকতে হবে। এমন উন্নয়ন করলাম, যে দেশের অর্ধেকই চলে গেল।’

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ভারতের কৃষকেরা আন্দোলন করে দেখিয়ে দিয়েছেন, কৃষকদের অধিকারের বিরুদ্ধে সরকার আইন করতে পারবে না। তবে দেশে গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা না থাকলে কোনো আন্দোলন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে না।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির প্রধান উপদেষ্টা নুর খান বলেন, আজ দেশের মানুষকে নানাভাবে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। একটি গোষ্ঠী নিজেদের মতাদর্শ কায়েমের জন্য নিজের বিরুদ্ধে যৌক্তিক সমালোচনাকেও গুম, খুনসহ নানা নির্যাতনে নিপতিত করছে। এখন স্বাধীন দেশে বাক্‌–স্বাধীনতার খুবই অভাব।
নুর খান বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এই করোনাকালেও নির্যাতন বন্ধ হয়নি।

মানুষের অধিকার খর্ব করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র বসে নেই; বরং রাষ্ট্র দিন দিন এমন একটি জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে আমাদের, যেখানে একজন মানুষ স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারেন না।’ তিনি বলেন, ‘জীবনের নিরাপত্তা এমন একটা জায়গায় চলে এসেছে, আমি যদি কোনো রাজনীতিতে বিশ্বাস করি, আমি যদি সরকারের বিরুদ্ধে যৌক্তিক সমালোচনা করি, তাহলে নির্ঘাত ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে আমাকে নানাভাবে হেনস্তা করার চেষ্টা করা হবে।’

ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা কাপাইন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক পল্লব চাকমা বলেন, ‘আজ চুম্বুকের চূড়ায় পাঁচ তারকা হোটেল তৈরির যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তা আদিবাসী উচ্ছেদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু তা–ই নয়, সারা দেশেই আদিবাসীদের নানাভাবে উচ্ছেদের গোপন ষড়যন্ত্র চলছে।’

সম্মেলনে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. শরীফুল ইসলাম। আইনজীবী শাহজাদা আল আমিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির পরিচালক আবু হানিফ মোহাম্মদ নোমান, নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম, আইনজীবী সারা হোসেন প্রমুখ।