
পাঁচ বছর আগে নির্বাচনী ইশতেহারে পাঁচটি প্রধান সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন। এর বাইরে আরও ১০টি প্রতিশ্রুতি ছিল সাঈদ খোকনের। প্রধান সমস্যাগুলোর সমাধান হয়নি। অন্যান্য প্রতিশ্রুতিরও বাস্তবায়ন চিত্র আশাব্যঞ্জক নয়। তবে কিছু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিয়েছেন, কাজ চলমান রয়েছে।
নগরবিদেরা বলছেন, নির্বাচনের আগে বর্তমান মেয়র এমন অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যেগুলো সিটি করপোরেশনের এখতিয়ারের বাইরে। আবার এমন অনেক প্রতিশ্রুতি ছিল যেগুলোর বাস্তবায়ন সিটি করপোরেশনের একার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে যেসব প্রতিশ্রুতি সরাসরি সিটি করপোরেশনের বাস্তবায়নের কথা, সেগুলোতে মেয়র সফল হতে পারেননি।
নগর গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, পাঁচ বছর আগের পরিস্থিতিই ছিল জটিল। এই পাঁচ বছরে ঢাকার জনসংখ্যা আরও বেড়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সমস্যা আরও বিস্তৃত হয়েছে। সাঈদ খোকনের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো ছিল উচ্চাকাঙ্ক্ষী। যানজটের মতো বৃহত্তর সমস্যা তাঁর পক্ষে একা নিরসন সম্ভব ছিল না।
২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল সর্বশেষ ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের আগে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র সাঈদ খোকন ‘পরিকল্পিত উন্নয়ন, সুযোগের সমতা, নিরাপদ ও দূষণমুক্ত আধুনিক ঢাকা’ শিরোনামে ইশতেহার ঘোষণা করেন। তাতে যানজট নিরসন, দূষণমুক্ত, নাব্য ও নিরাপদ বুড়িগঙ্গা, পানি-গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যা, পরিচ্ছন্ন-দূষণমুক্ত ও স্বাস্থ্যকর মহানগরী, দুর্নীতি সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।
এর বাইরে সাঈদ খোকন আরও ১০টি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেগুলোর মধ্যে ছিল ডিজিটাল মহানগরী, সবার জন্য শিক্ষার সুযোগ, বস্তি উন্নয়ন ও দলিত হরিজন সম্প্রদায়ের মানবিক মর্যাদা ও সুযোগের সমতা, আবাসন সমস্যা সমাধানে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ, ঐতিহ্য সংরক্ষণ, অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ, ক্রীড়া ও চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা, কামরাঙ্গীরচরে নবগঠিত তিনটি ওয়ার্ডের উন্নয়ন ও নগর প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করা।
প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে কথা বলতে সাঈদ খোকনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
যানজট পরিস্থিতি অসহনীয় হয়েছে
গত পাঁচ বছরে রাজধানীর যানজট পরিস্থিতি আরও দুর্বিষহ হয়েছে। সিটি করপোরেশনকে যানজট নিরসনে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। রিকশার নিবন্ধন নিতে হয় সিটি করপোরেশন থেকে। ঢাকায় কত রিকশা চলে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। বিশ্বব্যাংক বলছে, ঢাকার রাস্তায় কমপক্ষে আট লাখ রিকশা চলে। শহর দাপিয়ে বেড়ানো এসব অবৈধ রিকশা বন্ধে সিটি করপোরেশন কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ঢাকায় এখন ঘণ্টায় গড়ে প্রায় ছয় কিলোমিটার গতিতে চলছে যানবাহন। যানজটে ঢাকায় প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। আর যানজটের কারণে বছরে যে আর্থিক ক্ষতি হয়, অঙ্কের হিসাবে তা প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা।
দূষণের শীর্ষে এসেছে ঢাকা
অপরিচ্ছন্নতা, দূষণ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ—সাঈদ খোকন ঢাকার সমস্যা সঠিকভাবেই চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। এসব সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু গত পাঁচ বছরে এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে উদ্যোগ ছিল না বললেই চলে।
কয়েক বছর ধরেই ঢাকার বায়ুমান খারাপ হচ্ছে। চলতি বছর একাধিকবার বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরের তালিকার শীর্ষে উঠে আসে ঢাকা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা এয়ার ভিজ্যুয়ালের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ডিসেম্বর মাসের বেশির ভাগ সময় ঢাকা ছিল বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরের তালিকার শীর্ষ পাঁচে।
চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হয়নি
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) তিন বছর আগের এক গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকার ফুটপাতে বছরে প্রায় ১ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয়। ওই গবেষণায় বলা হয়, দুই সিটি করপোরেশন মিলে ঢাকার ফুটপাতের দৈর্ঘ্য ৪৩০ কিলোমিটার। এই ফুটপাত দখল করে আড়াই লাখের বেশি হকার ব্যবসা করে। ফুটপাতে বসতে একজন হকারকে এলাকাভেদে ৫০ থেকে ৩০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়।
নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রায়ই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও বেশির ভাগ ফুটপাত দখলমুক্ত করা যাচ্ছে না। সিটি করপোরেশনের উদাসীনতা ও চাঁদাবাজদের দাপটে এই উদ্যোগ পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে অভিযানের পরপরই সেখানে আবার বসে পড়ছেন হকাররা। দক্ষিণ সিটি করপোরেশন হকারদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে নগরীর পাঁচটি স্থানে ‘হলিডে মার্কেট’ চালুর উদ্যোগ নেয়। এর মধ্যে দুটি মার্কেট চালু হয়েছিল, এখন তা–ও বন্ধ।
বুড়িগঙ্গার সৌন্দর্যবর্ধনের প্রকল্প খেই হারিয়েছে
২০১৬ সালে ‘ঢাকা ইন্টিগ্রেটেড আরবান ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড স্মার্ট সিটি ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্ট’ নামে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও বিএমডিএফের আর্থিক সহায়তায় বুড়িগঙ্গা নদীর দুই তীর সংরক্ষণ এবং সৌন্দর্যবর্ধনে উদ্যোগ নিয়েছিল ডিএসসিসি। পুরান ঢাকার হাজারীবাগ থেকে নারায়ণগঞ্জের পাগলা পর্যন্ত আধুনিকায়ন করার কথা ছিল। পরে প্রকল্প কাটছাঁট করে বাবুবাজার সেতু থেকে সদরঘাট পর্যন্ত করার সিদ্ধান্ত হয়।
তবে কাজ বাস্তবায়নের আগেই বাধা দেয় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। নদীর পাড়ের এই সৌন্দর্যবর্ধনে বিআইডব্লিউটিএর একই ধরনের একটি প্রকল্প ছিল। অনেক চিঠি চালাচালির পর প্রকল্পটি আর বাস্তবায়ন করতে পারেনি ডিএসসিসি।
ডিজিটাল মহানগরী
২০১৫ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর নগরের গুরুত্বপূর্ণ ৫০টি গণপরিসরে ‘বিনা মূল্যে ইন্টারনেট বা ফ্রি ওয়াই–ফাই জোন’ করার ঘোষণা দেন মেয়র সাঈদ খোকন। ২০১৬ সালের ১১ মে লালবাগ কেল্লার ভেতর একটি ওয়াই–ফাই জোন উদ্বোধনও করেন তিনি। কিন্তু এরপর আরও কোথাও ওয়াই–ফাই জোন বাস্তবায়ন করতে পারেননি।
বস্তি উন্নয়ন হয়নি, দলিতরা ভবন পেয়েছেন
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১ হাজার ৭৫৫টি বস্তি রয়েছে। এসব বস্তিতে মোট খানার সংখ্যা ৪০ হাজার ৫৯১ এবং জনসংখ্যা ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৬ জন। বস্তিবাসীর জীবনমান উন্নয়নে গত পাঁচ বছরে ডিএসসিসি নিজস্ব কোনো প্রকল্প বা কর্মসূচি নেয়নি।
তবে ডিএসসিসির পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের মধ্যে দলিত সম্প্রদায়ের জন্য দয়াগঞ্জে দুটি ও ধলপুরে তিনটি ছয়তলা আবাসিক ভবন করে দিয়েছে ডিএসসিসি। এখন বংশালের মিরনজল্লা ক্লিনার কলোনিতে আরও তিনটি ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের একটি প্রকল্পের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করছে ডিএসসিসি।
‘জলসবুজে ঢাকা’ অসমাপ্ত রয়ে গেছে
২০১৭ সালের জুনে ‘জলসবুজে ঢাকা’ নামে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে ডিএসসিসি এলাকার আওতাধীন ৩১টি পার্ক ও মাঠ উন্নয়নে কাজ শুরু করে ডিএসসিসি। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল।
ডিএসসিসি সূত্রে জানা যায়, এখন পর্যন্ত তিনটা পার্ক ও তিনটা মাঠের সংস্কারকাজ শেষে উদ্বোধন করা হয়েছে। বাকি মাঠ ও পার্কের সংস্কারকাজ এখনো শেষ হয়নি।
ঘটেছে চুড়িহাট্টার মতো অগ্নিকাণ্ড
এ বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি চকবাজারের চুড়িহাট্টা মোড়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৭১ জন প্রাণ হারান। চকবাজার, চুড়িহাট্টা এলাকায় বিভিন্ন ধরনের প্রসাধনী তৈরির কারখানা বাড়িতে বাড়িতে। এসব গুদাম ও কারখানায় অতি দাহ্যবস্তুর ছড়াছড়ি।
চুড়িহাট্টার আগুনের পর মেয়র সাঈদ খোকন রাসায়নিক কারখানা সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেন। রাসায়নিক কারখানার বিরুদ্ধে ডিএসসিসি কয়েক দিন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে। কিন্তু কয়েক মাস যেতেই সব উদ্যোগ থেমে গেছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি আকতার মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, সাঈদ খোকনের সামনে সুযোগ ছিল ভালো কাজ করার, যা তিনি পারেননি। নিজের এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে নেতৃত্ব নিতে পারলে ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারতেন, সেটিও হয়নি। জনগণের চাহিদা ও নিজের এখতিয়ার না বুঝে প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় এমন পরিস্থিতি হয়েছে বলে এই নগর–পরিকল্পনাবিদ মনে করেন।