
রাজশাহীতে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস দেওয়ার জন্য নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল। গ্যাসের জন্য এখানে হরতালও হয়েছে। গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময় তড়িঘড়ি করে গ্যাস পাইপলাইন স্থাপন করা হয়। এ জন্য ১০৮ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। সংযোগও দেওয়া শুরু হয়। কিন্তু দুই বছর পর তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সাড়ে ৮ লাখ মানুষের এই শহরে আনুমানিক ৪০ হাজার মানুষ আবাসিক গ্যাসের সুবিধা পাচ্ছে।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের গত নির্বাচন হয়েছিল ২০১৩ সালের ১৫ জুন। তার ঠিক এক সপ্তাহ আগে ৭ জুন বাসাবাড়িতে গ্যাস-সংযোগ দেওয়া শুরু হয়। তাড়াতাড়ি সংযোগ দেওয়ার জন্য দরপত্র ছাড়াই পুরোনো ঠিকাদারকে দিয়ে রাইজার উত্তোলনের কাজ শুরু করা হয়েছিল। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন পরাজিত হন। বিএনপির প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল মেয়র নির্বাচিত হন। নির্বাচনের ঠিক দুই বছরের মাথায় ২০১৫ সালের জুনে গ্যাস-সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। তাই শহরের মানুষ বলছেন, রাজনৈতিক কারণে রাজশাহীতে গ্যাস এসেছিল। আবার রাজনৈতিক কারণেই বন্ধ হয়ে গেছে।
দুই বছরে রাজশাহীতে ৯ হাজার ১৫৫টি বাসাবাড়িতে গ্যাস-সংযোগ দেওয়া হয়েছে। ৮টি কারখানা ও একটি সিএনজি স্টেশনও গ্যাস পেয়েছে। এখনো ৯টি কারখানায় গ্যাস-সংযোগ
দেওয়ার বিষয় প্রক্রিয়াধীন। আরও ৩০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আবেদন জমা পড়ে আছে। একইভাবে নগরের প্রায় ৩০০ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলোর একটিতেও গ্যাস-সংযোগ দেওয়া হয়নি।
আর আবাসিক সংযোগের জন্য এখনো সাড়ে ২১ হাজার গ্রাহকের আবেদন পড়ে রয়েছে। ১ হাজার ৩০০ গ্রাহকের ‘ডিমান্ড নোট ইস্যু’ করা হয়েছে। ৫৫০ জন আবাসিক গ্রাহক তাঁদের বাড়ি ওয়্যারিং করে গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করছেন। তাঁদের কারও বাসা ওয়্যারিং করতে ৪০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়েছে।
নগরের রানীনগর এলাকায় খোন্দকার শাহিদা খাতুনের নামে ডিমান্ড নোট ইস্যু হয়েছে। তাঁর স্বামী খোন্দকার হাবিবুর রহমান বলেন, ডিমান্ড নোট ইস্যু হওয়ার পর তাঁরা বাসায় ওয়্যারিং করে ফেলেছেন। এতে তাঁদের ৪০ হাজার টাকার বেশি খরচ পড়েছে। এখন গ্যাস কোম্পানি তাঁদের দিনের পর দিন ঘোরাচ্ছে।
নগরের একই এলাকার জালাল উদ্দিন মণ্ডল বলেন, তাঁর ওয়্যারিং পর্যন্ত কাজ শেষ করতে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ওয়্যারিং সম্পন্ন করার পর রাইজার বসানোর জন্য গর্ত করে কর্মচারীরা চলে যান। পরের দিন তাঁরাই এসে গর্ত বন্ধ করে দিয়ে যান। জানতে চাইলে তাঁরা বলেছিলেন, গ্যাস-সংযোগ আর দেওয়া যাবে না। তিনি বলেন, বছরখানেক আগে তিনি শেষবারের মতো গ্যাস কোম্পানির কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। গেলেই কোম্পানির লোকজন শুধু বলেন, ‘ধৈর্য ধরেন, পাবেন।’
পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস-সংযোগ পাওয়ার আশায় রাজশাহীর মানুষ দীর্ঘদিন রাজপথে আন্দোলন করেছেন। রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের পাশাপাশি ২০০৪ সাল থেকে ‘গ্যাস আন্দোলন পরিষদ’ নামে একটি সংগঠন আন্দোলন শুরু করে। লক্ষাধিক মানুষের গণস্বাক্ষর-সংবলিত ৮৬ কেজি ওজনের স্মারকলিপি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হয়। সে সময় গ্যাসের দাবিতে রাজশাহী নগরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালন করা হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় গেট থেকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় পর্যন্ত মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়।
তখন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুটি দলই গ্যাস দেওয়ার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের বর্তমান মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল বলেছেন, বিএনপি থেকে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার কারণে গ্যাস বন্ধ করা হয়েছে। হয়তো আওয়ামী লীগের প্রার্থী মেয়র নির্বাচিত হলে এমনটি হতো না।
এ বিষয়ে সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, রাজনৈতিক কারণে গ্যাস সংযোগ বন্ধ করা হয়েছে এটা সত্য নয়। বিএনপি প্রার্থী নির্বাচনী জয়ী হওয়ার পরও দুই বছর ধরে আবাসিক গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়েছে। গ্যাস স্বল্পতার কারণে সরকার বাসাবাড়িতে গ্যাস সংযোগ বন্ধ রেখেছে। সেই সঙ্গে এটাও বলা হয়েছে, গ্যাস পাওয়া সাপেক্ষে আবার বাসাবাড়িতে সংযোগ দেওয়া হবে।
রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. জামাত খান বলেন, উত্তরাঞ্চল যে অবহেলিত, গ্যাস-সংযোগ বন্ধ করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে আরেকবার তা প্রমাণিত হয়েছে। রাজশাহী একটি বিভাগীয় শহর অথচ ২০০৪ সালে রাজশাহীতে গ্যাস না দিয়ে পাইপলাইন বগুড়ায় নিয়ে যাওয়া হলো। বগুড়ায় এখন ২০টি সিএনজি ফিলিং স্টেশন। রাজশাহীতে অনেক দেনদরবারের পরে হয়েছে একটি। তাতেও গ্যাসের চাপ কম।
রাজশাহী শিল্প ও বণিক সমিতির সভাপতি মনিরুজ্জামান বলেন, রাজশাহীর শিল্পকারখানায় গ্যাস-সংযোগ না দিলে উত্তরাঞ্চলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে না। অথচ রাজশাহীতে নামমাত্র কয়েকটি কারখানায় গ্যাস-সংযোগ দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক (বিপণন) কামরুজ্জামান বলেন, সবকিছুই সরকারি সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
রাজশাহী সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে এই শহরে প্রায় সাড়ে ৮ লাখ মানুষের বসবাস। আবাসিক বাড়ির সংখ্যা প্রায় ৫২ হাজার। বাণিজ্যিক গৃহের সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার। এই শহরে ৯ হাজার পরিবার আবাসিক গ্যাস সংযোগের সুবিধায় এসেছে। গড়ে প্রতিটি পরিবারের সদস্য সংখ্যা চার জন ধরলে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ আবাসিক গ্যাস সুবিধার সুযোগ পেয়েছে।