
বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম অভিযোগ করে বলেছেন, ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের পর দেশে বিকল্প রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গণতন্ত্র মঞ্চের অনেক নেতা তাঁদের নীতি–আদর্শ বিসর্জন দিয়েছেন। তাঁরা সামগ্রিক রাজনৈতিক স্বার্থ উপেক্ষা করে ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম মিলনায়তনে ‘গণভোট, রাষ্ট্র সংস্কার ও সিরাজুল আলম খানের প্রাসঙ্গিকতা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন হাসনাত কাইয়ুম। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, রাজনৈতিক তাত্ত্বিক সিরাজুল আলম খানের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এই আলোচনা সভার আয়োজন করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি)।
হাসনাত কাইয়ুম বলেন, ‘গণতন্ত্র মঞ্চের নেতারা কে কোথায় আছে, এটা আপনারা জানেন। দুর্ভাগ্য হচ্ছে, গণতন্ত্র মঞ্চ আমরা যাদের নিয়ে করেছিলাম, এমনকি গণতন্ত্র মঞ্চের আদর্শের সঙ্গে যারা একমত ছিল, তারা পর্যন্ত সামান্য একটা আসন, মন্ত্রিত্ব, পাতি মন্ত্রিত্বের সামান্য লোভে, সামান্য লাভে আদর্শের বিসর্জন করেছে।’
গণতন্ত্র মঞ্চের এসব নেতার হাতে বাংলাদেশে ‘বিকল্প রাজনীতি’ গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি। তিনি বলেন, দেশের ইতিহাসে যেকোনো গণ–অভ্যুত্থান ও বৃহৎ আন্দোলনে জনগণ জীবন দিলেও পরবর্তীতে তারা ফলভোগ করতে পারে না। স্বার্থপর গোষ্ঠী গণ–অভ্যুত্থানের ফল কুক্ষিগত করে নেয়। চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের পর সেই জায়গাকে ভাঙার সচেতন চেষ্টা তিনি করেছিলেন।
হাসনাত কাইয়ুম বলেন, ‘এই প্রচেষ্টায় গণতন্ত্র মঞ্চকে আমরা পাইনি। গণতন্ত্র মঞ্চের কাউকে কাউকে পেয়েছিলাম।’
বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি বলেন, অতীত আন্দোলনে কৌশলগত বড় ভুল ছিল কেবল দ্রুত জয়ের চিন্তা করা। ফলে শত্রু-মিত্র বিবেচনা না করে বেইমান, দালাল বা এজেন্টদের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এই অসচেতনতার কারণেই বারবার বিজয় সাধারণ জনগণের হাতছাড়া হয়ে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর কাছে বিক্রি হয়ে যায়।
ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে ১৯৭১, ১৯৯০ কিংবা ২০২৪ সালে বারবার আন্দোলনে অংশ নেওয়াদের মধ্যে বিভাজনের রাজনীতি তৈরি করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন হাসনাত কাইয়ুম। তিনি মনে করেন, এই ক্ষতিকর বিভাজন দূর করতে, দেশের ভবিষ্যৎ মুক্তির আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সিরাজুল আলম খানের বায়াত্তর সালের জাতীয় সরকারের রূপরেখা আবার বিবেচনায় নেওয়া দরকার।
চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের নামে দীর্ঘ আলোচনা হলেও প্রকৃত অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত মুক্তি নিয়ে কোনো কার্যকর সিদ্ধান্ত হয়নি বলে মন্তব্য করেন অনলাইন গণমাধ্যম চরচার সম্পাদক সোহরাব হাসান। তিনি বলেন, বড় রাজনৈতিক দলগুলো আপস না করায় জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী আনুপাতিক হারে ভোট বা সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন পদ্ধতি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। বর্তমান সংস্কারপ্রক্রিয়া ও উচ্চকক্ষ গঠনের বিতর্কিত পদ্ধতির কারণে আগামী কয়েক বছর রাজনৈতিক গোলযোগে পার হবে। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের পরিবর্তে কেবল ধনী ও দলীয় নেতারাই লাভবান হবেন। যদি ৫ শতাংশ মানুষের কাছে সব ক্ষমতা চলে যায়, আর ৯০ শতাংশ মানুষ বঞ্চিত থাকে, তবে রাষ্ট্র সংস্কারের পুরো প্রক্রিয়াই ব্যর্থ হবে। প্রতিটি অভ্যুত্থানে সাধারণ ও শ্রমজীবী মানুষই সবচেয়ে বেশি জীবন দেয়। অথচ রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতার ভাগাভাগি আর অবদানের গৌরব নিয়ে নিজেদের মধ্যে লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকে।
আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গীতিকবি ও রাষ্ট্রচিন্তক শহীদুল্লাহ ফরায়জী। তিনি বলেন, প্রচলিত প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা দূর করতে সিরাজুল আলম খান অংশীদারত্বমূলক শাসনের দর্শন দিয়েছিলেন। তাঁর দর্শন অনুযায়ী, রাজনীতি কেবল নির্বাচনকেন্দ্রিক নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনায় শিক্ষক, চিকিৎসক, কৃষক, শ্রমিকসহ সর্বস্তরের নাগরিক সমাজের প্রত্যক্ষ অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা।
জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন বলেন, সীমান্তে বর্তমানে এমন একটি পরিস্থিতি রয়েছে, যেখানে গ্রামবাসী ও বিজিবিকে পুশ ইন ঠেকাতে দিনরাত পাহারা দিতে হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশ এই সংকট নিয়ে এখন পর্যন্ত ভারতের কাছে স্পষ্ট কোনো বার্তা দিতে পারেনি।
আলোচনা সভার সভাপতিত্ব করেন জেএসডির সিনিয়র সহসভাপতি তানিয়া রব। তিনি বলেন, ১৭ বছরের ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হয়েছে মাত্র দুই মাসের আন্দোলনে। এটা প্রমাণ করে, বর্তমান শাসকদের পথ অত্যন্ত পিচ্ছিল। ৬৯ শতাংশ মানুষের সমর্থিত গণভোট ও রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে স্বৈরাচারের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে হবে। শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, শাসনব্যবস্থার আমূল সংস্কার প্রয়োজন। সিরাজুল আলম খানের আদর্শে সাম্য, ন্যায়বিচার ও ১৮ কোটি মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে দলমত–নির্বিশেষে দেশের স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
জেএসডির সাংগঠনিক সম্পাদক সামসুল আলমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন পেশাজীবী সংগঠক ও গবেষক হেলালুজ্জামান, জেএসডির স্থায়ী কমিটির সদস্য মো. তৌহিদ হোসেন, মো. সিরাজ মিয়া প্রমুখ।