
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রাধ্যক্ষকে অবরুদ্ধ করা ও বের করে আনাকে কেন্দ্র করে গতকাল রোববার গভীর রাতে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের নেতা–কর্মীদের মধ্যে হাতাহাতি ও ধাক্কাধাক্কি হয়। এতে কয়েকজন আহত হন।
প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ইলিয়াস আল মামুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ফেসবুকে পোস্ট দেওয়াকে কেন্দ্র করে হলের এক শিক্ষার্থীকে তাঁর কক্ষে প্রায় দেড় ঘণ্টা আটকে রেখে নির্যাতন করেছেন। গতকাল দুপুরে তাঁর বিরুদ্ধে এ অভিযোগ ওঠে।
এ ঘটনায় প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগ দাবিতে তাঁকে কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। ছাত্রশিবিরের নেতা–কর্মী, ডাকসু ও হল সংসদের নেতা–কর্মীরা তাঁকে অবরুদ্ধ করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, দিবাগত রাত পৌনে তিনটার দিকে প্রাধ্যক্ষকে সেখান থেকে বের করে নিতে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা যান। সেখানে দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। এ সময় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
আহত শিক্ষার্থীদের মধ্যে হল সংসদের ভিপি আবু নাঈম ও জিএস ইমামুল হাসান রয়েছেন। শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, আহত শিক্ষার্থীদের অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রাধ্যক্ষকে কার্যালয় থেকে বের করে নিতে রাতে সেখানে উপস্থিত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী, সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক আবদুস সালাম, ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ইসরাফিল প্রাং এবং কয়েকজন সহকারী প্রক্টর। একপর্যায়ে তাঁদেরও প্রাধ্যক্ষের কার্যালয়ের ভেতরে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়।
পরে দুই সহ-উপাচার্য সেখান থেকে বের হয়ে যান। এ সময় প্রাধ্যক্ষের কার্যালয়ের গেটে ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ইসরাফিল প্রাংয়ের সঙ্গে হল সংসদের ভিপি আবু নাঈম, জিএস ইমামুল হাসানসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী অবস্থান করছিলেন।
সে সময় প্রক্টর ও প্রাধ্যক্ষকে সেখান থেকে বের করে নিতে চাইলে ছাত্রদলের নেতা–কর্মীদের সঙ্গে শিবিরের ও হল সংসদের নেতা–কর্মীদের হাতাহাতি হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। এ সময় ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ইসরাফিল প্রাং ধাক্কা খেয়ে পড়ে যান। পরে ছাত্রদলের একদল নেতা-কর্মী প্রক্টর ও প্রাধ্যক্ষকে তাঁর কার্যালয় থেকে বের করে নিয়ে যান বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক মল্লিক ওয়াসি তামি সাংবাদিকদের বলেন, অন্যান্য হল থেকে শিবিরের নেতা-কর্মীরা সেখানে এসেছিলেন। পরে ভিপি-জিএসদের একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা সেখানে যান। ছাত্রদলের নেতৃত্বে প্রাধ্যক্ষকে বের করে নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা ভেতরে যাইনি। হল ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা সেখানে গিয়েছিল।’
ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক মিফতাহুল হোসাইন আল মারুফ অভিযোগ করেন, ছাত্রদল একপক্ষীয় হামলা চালিয়েছে। ছাত্রদলের এই হামলাকে ‘মারামারি’ হিসেবে জাস্টিফাই করাটা অন্যায় বলে মনে করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থী ও শিক্ষার্থীদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যখন প্রভোস্টের কাছে জবাব চাইতে গেছেন বা সিসিটিভি ফুটেজ উদ্ধার করতে গেছেন, তখন ছাত্রদল ছাত্রলীগের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় এবং তাঁদের ওপর হামলা করে। প্রভোস্টকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ইসরাফিল প্রাং বলেন, ‘হয়তো কোনো পক্ষ চাইছিল একটা ধাক্কাধাক্কি বা ঝামেলা তৈরি হোক। একজন মানুষ চাইলে অনেক কিছুই করতে পারে, তাই এখানে উদ্দেশ্যটা দেখতে হবে। তবে সবকিছু মিলিয়ে আমার কাছে মনে হয়েছে, এটা সুস্থ ধারার কোনো দাবি আদায়ের প্রক্রিয়া নয়। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া হতে পারে না।’ এ বিষয়ে তদন্ত করতে একটি কমিটি করে দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবোটিকস অ্যান্ড মেকাট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মো. ইব্রাহীম অভিযোগ করেন, গতকাল দুপুরে ফেসবুকে একটি পোস্ট শেয়ার করাকে কেন্দ্র করে প্রাধ্যক্ষের কক্ষে তাঁকে প্রায় দেড় ঘণ্টা আটকে রেখে ভয়ভীতি দেখানো, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া এবং জোরপূর্বক লিখিত বক্তব্যে স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন হলটির প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ইলিয়াস আল মামুন। তিনি বলেছেন, ওই শিক্ষার্থী তাঁর সম্পর্কে ‘সঠিক নয়’—এমন কিছু কথা ফেসবুকে লিখেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে হল সংসদের সঙ্গে কথা বলার পর তাঁকে ডেকে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। তাঁর ভাষ্য, শিক্ষার্থী কথোপকথন রেকর্ড করছিলেন বুঝতে পেরে ফোনটি বের করতে বলা হয় এবং পরে রেকর্ড করা বিষয়টি শিক্ষার্থী নিজেই মুছে দেন।
প্রাধ্যক্ষের দাবি, তিনি শিক্ষার্থীকে বুঝিয়ে বলেছেন এবং পরে নাশতা করিয়ে তাঁকে চলে যেতে দিয়েছেন। দরজা বন্ধ করে আটকে রাখার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ঘটনাটি দিনের বেলা তাঁর কার্যালয়ে ঘটেছে এবং সেখানে হলের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন।