
বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ূম বলেছেন, রাষ্ট্র সংস্কার কোনো সাংবিধানিক প্রকল্প নয়। রাষ্ট্র সংস্কার একটি রাজনৈতিক প্রকল্প। সংবিধানের দোহাই দিয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ ব্যাহত করার সুযোগ নেই। এমনটা হলে জনগণ আবার রাজপথে নামবে।
আজ শুক্রবার রাজধানীর তোপখানা রোডে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এ কথা বলেন হাসনাত কাইয়ূম। ‘সংস্কারের সাংবিধানিক বৈধতা: নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কুপ্রভাব’ শীর্ষক এই আলোচনা সভার আয়োজক বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন।
জাতীয় সংসদের সরকারি দলের প্রতি ইঙ্গিত করে হাসনাত কাইয়ূম বলেন, আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের যেভাবে সংবিধানের দোহাই দিতেন, বলতেন সংবিধান মেনেই নির্বাচন হবে, এরাও এ রকম সংবিধান মেনে সংস্কারের কথা বলছে।
ওবায়দুল কাদেরসহ জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পরিণতির কথা স্মরণে রাখতে জাতীয় সংসদের বর্তমান সরকারি দলকে পরামর্শ দেন হাসনাত কাইয়ূম। তিনি বলেন, বিগত সময়ে মানুষ সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্রকে বিদায় করেছিল। সংবিধান সংস্কারের রাজনীতির পক্ষ নিয়ে গণ–অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিল। আর এই সংবিধান পরিবর্তনের জন্য মানুষ বর্তমান ক্ষমতাসীন দলকে ‘কনস্টিটুয়েন্ট পাওয়ার’ দিয়েছে।
নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার জন্য ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানে দেশের লাখো মানুষ রাস্তায় নেমেছিল বলে উল্লেখ করেন হাসনাত কাইয়ূম। তিনি বলেন, সংস্কারের ধারণা সংবিধানের ভেতরে আছে—এমনটি মনে করে গুলিয়ে ফেলার চেষ্টা সব মানুষকে বোকা বানানোর চেষ্টার শামিল। সংবিধান সংস্কারের ধারণাটি একটি রাজনৈতিক প্রকল্প, সাংবিধানিক প্রকল্প নয়।
জাতীয় সংসদের সরকারি দলকে সতর্ক করে হাসনাত কাইয়ূম বলেন, নিজেদের এত চতুর, এত চালাক, প্রতারণায় এত সক্ষম মনে করার কোনো কারণ নেই।
২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থান সংবিধান সংশোধন নয়, বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বৈরতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ছিল বলে মন্তব্য করেন হাসনাত কাইয়ূম। তিনি বলেন, তরুণসহ সাধারণ মানুষের এই আকাঙ্ক্ষাকে পাশ কাটিয়ে অভিজ্ঞতাহীন ও সুবিধাবাদী গোষ্ঠীগুলো পুরোনো ব্যবস্থার বৈধতা খোঁজার চেষ্টা করছে। রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কারের মালিকানা দাবি করলেও তারা প্রকৃত পরিবর্তনের পরিবর্তে নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার পুরোনো রাজনীতিকেই পুনর্বাসিত করতে আগ্রহী।
হাসনাত কাইয়ূম বলেন, ’৭১, ’৯০-এর মতো ’২৪-এর বিজয়ও হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। সংসদ আজ জনগণের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পরিবর্তে আইনি জটিলতার অজুহাতে পুরোনো ব্যবস্থাকে রক্ষার পাহারাদারে পরিণত হয়েছে। এই প্রতারণার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গণ–অভ্যুত্থানের মূল চেতনা পুনরুদ্ধারসহ একটি টেকসই রাজনৈতিক সংস্কার নিশ্চিত করাই এখন জনগণের প্রধান দায়িত্ব।
জাতীয় সংসদে সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে ‘হাসিঠাট্টা’ হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন হাসনাত কাইয়ূম। গণভোট অধ্যাদেশের সমালোচনাকে ‘গভীর ষড়যন্ত্র’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আলোচনা সভা সঞ্চালনা করেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ হাসিবউদ্দীন হোসেন। তিনি বলেন, গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষের সমর্থন সত্ত্বেও দায়িত্বপ্রাপ্তরা সংবিধান সংস্কারকে গুরুত্ব না দিয়ে জন–আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে প্রতারণা করছেন। সংসদে সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে হাসিঠাট্টা হচ্ছে। গণভোট অধ্যাদেশ বাতিলের মাধ্যমে পুরোনো স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামো টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে।
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের নির্বাহী কমিটির সদস্য ফরিদুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদার ভূঁইয়া, রাষ্ট্র সংস্কার ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি লামিয়া ইসলাম।