
ঢাকা-৯ সংসদীয় আসনে ফুটবল প্রতীকে নির্বাচন করছেন আলোচিত স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা। গত ৩১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর নির্বাচনী প্রচার স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা তৈরি করেছে। স্বতন্ত্র এই প্রার্থীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. নোমান ছিদ্দিক।
এনসিপি থেকে পদত্যাগের পেছনে জামায়াতের সঙ্গে দলটির নির্বাচনী সমঝোতাই একমাত্র কারণ, নাকি আরও কিছু বিষয় রয়েছে?
তাসনিম জারা: আমি পেশাদার রাজনীতিবিদ ছিলাম না। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান আমাদের মতো পেশাজীবীদের রাজনীতিতে আসার সুযোগ করে দিল। আমি চেয়েছিলাম ভিন্ন ধারার, নতুন একটি গণমুখী রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য কাজ করতে। এনসিপিরও প্রতিশ্রুতি ছিল মধ্যমপন্থী রাজনীতির। কিন্তু যখন দেখলাম তারা (এনসিপি) সেই পুরোনো ধারার রাজনীতির সঙ্গেই জোটবদ্ধ হলো, তখন মনে হলো এই দলে থেকে আমার পক্ষে আর নতুন ধারার রাজনীতি করা সম্ভব নয়। সে কারণেই সরে দাঁড়িয়েছি। স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাজনীতির পথে হাঁটছি।
আমার সাবেক সহকর্মী বা অন্য যাঁরা প্রার্থী আছেন, তাঁদের প্রতি আমার পূর্ণ শ্রদ্ধা রয়েছে। আমি মনে করি, যত বেশি যোগ্য প্রার্থী থাকবেন, ভোটারদের সামনে তত ভালো বিকল্প থাকবে।
এনসিপিতে আপনার সহকর্মী হিসেবে কাজ করা এক নেতা এখন আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী—এ নিয়ে কোনো অস্বস্তি কাজ করে কি না?
তাসনিম জারা: গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই হলো বহুমত। নির্বাচনের মাঠ কোনো ব্যক্তিগত দ্বৈরথের জায়গা নয়, এটি আদর্শ ও কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপনের মঞ্চ। আমার সাবেক সহকর্মী বা অন্য যাঁরা প্রার্থী আছেন, তাঁদের প্রতি আমার পূর্ণ শ্রদ্ধা রয়েছে। আমি মনে করি, যত বেশি যোগ্য প্রার্থী থাকবেন, ভোটারদের সামনে তত ভালো বিকল্প থাকবে। আমি আমার যোগ্যতা ও ভিশন দিয়ে মানুষের সমর্থন চাইব, ব্যক্তিগত কাদা-ছোড়াছুড়ি আমার রাজনৈতিক দর্শনের পরিপন্থী।
একজন নারী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী প্রচারে কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না?
তাসনিম জারা: নারী প্রার্থী হওয়ার একটা ইতিবাচক দিকও আছে। নারীরা খুব স্বাচ্ছন্দ্যে আমার কাছে এসে তাঁদের সমস্যার কথা বলতে পারছেন। অনেকেই বলছেন, ‘আমাদের কথা অন্য কেউ বুঝবে না, তুমি বুঝবে, মা।’ এটা আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া। তবে নেতিবাচক দিক হলো সাইবার বুলিং। শুধু আমি নই, জনজীবনে বা রাজনীতিতে সক্রিয় সব নারীই এর শিকার হচ্ছেন। নারীদের জন্য রাজনীতির মাঠ নিরাপদ করতে আমাদের কাজ করতে হবে।
নারীরা যাতে রাজনীতি ও জনজীবনে অর্থবহ অবদান রাখতে পারেন, সে জন্য আমাদের একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
নির্বাচনের পরিবেশ কেমন, বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় বুলিং-অপপ্রচার ছড়ানো নিয়ে কী বলবেন?
তাসনিম জারা: সোশ্যাল মিডিয়ায় নারীদের বিরুদ্ধে যে বুলিং হয়, তা প্রায়ই চরিত্র হননের উদ্দেশ্যে করা হয়। এর মূল লক্ষ্য হলো নারীদের মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়া বা চুপ করিয়ে দেওয়া; কিন্তু আমরা থামব না। নারীরা যাতে রাজনীতি ও জনজীবনে অর্থবহ অবদান রাখতে পারেন, সে জন্য আমাদের একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কী কী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন?
তাসনিম জারা: একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীকে খুবই অল্প সময়ের মধ্যে মানুষের কাছে নিজের মার্কা (প্রতীক) চেনানো একটা বড় চ্যালেঞ্জ। মানুষের অসুবিধার কথা চিন্তা করে এলাকায় কোনো মাইকিং করছি না আমি, কোনো শোডাউন (মহড়া) করছি না। কারণ, মাইকিং, শোডাউন কিংবা ডিজিটাল ব্যানার দিয়ে শহরটা একেবারে ছেয়ে ফেলা, এগুলো কিন্তু জনসেবার জন্য করা হয় না। এগুলো করা হয় নিজের ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ভোটটা নেওয়ার জন্য। আমরা একেবারেই অলিতে-গলিতে, বাজারে, মহল্লায় তারপর বাসায় বাসায় গিয়ে নতুন রাজনীতির কথাটা বলার চেষ্টা করছি। আমি যদি কোনো নির্বাচনী জোটে থাকতাম, তাহলে হয়তো এটি সম্ভব হতো না। সব মিলিয়ে আমি খুবই আশাবাদী।
সিটি করপোরেশন বলেন, তিতাস বলেন, ওয়াসা বলেন, তাদের জবাবদিহির মধ্যে কে নিয়ে আসবে? সংসদ সদস্য চাইলে এসব সেবা সংস্থাকে জবাবদিহির মধ্যে আনতে পারেন। নির্বাচিত হলে এটি আমার দায়িত্ব হবে।
ইশতেহারে আপনি বলেছেন, বর্ষা শুরুর আগেই ড্রেন (নালা) পরিষ্কার করবেন, বাসার সামনে থেকে ময়লার স্তূপ সরিয়ে আধুনিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করবেন। কিন্তু এই কাজগুলো মূলত সিটি করপোরেশনের...
তাসনিম জারা: আধুনিক বর্জ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করতে, এলাকার পার্কগুলোতে হাঁটার পরিবেশ উন্নত করতে সিটি করপোরেশন ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করব। এই যে বছরের পর বছর ধরে বাসার পাশে, হাসপাতালের পাশে, স্কুলের পাশে বর্জ্য পড়ে থাকে, এটা সিটি করপোরেশনের ফেইলর (ব্যর্থতা)। সিটি করপোরেশন যখন ফেল করছে, যখন দুর্ভোগ বাড়ছে, তখন মানুষ কার কাছে সমাধান চাইবে? সিটি করপোরেশন বলেন, তিতাস বলেন, ওয়াসা বলেন, তাদের জবাবদিহির মধ্যে কে নিয়ে আসবে? সংসদ সদস্য চাইলে এসব সেবা সংস্থাকে জবাবদিহির মধ্যে আনতে পারেন। নির্বাচিত হলে এটি আমার দায়িত্ব হবে।
আপনি একজন চিকিৎসক। সেই জায়গা থেকে নির্বাচনী এলাকার চিকিৎসাব্যবস্থা উন্নত করার জন্য আপনার চিন্তা কী?
তাসনিম জারা: ঢাকা-৯ আসনে ছয় থেকে সাত লাখের বেশি মানুষের বসবাস। যাদের জন্য শুধু মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল আছে। আমার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা হলো মুগদা মেডিক্যালে আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকবে, জনবলের ঘাটতি পূরণের জন্য পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ দেওয়া। ভোটে জয়ী হলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমি যোগাযোগ করব এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনব। শুধু মুগদা মেডিক্যালের ওপর নির্ভর করলে হবে না, লাখ লাখ মানুষের জন্য ‘প্রাইমারি হেলথকেয়ার সেন্টারও’ লাগবে। নির্বাচিত হলে প্রাইমারি হেলথকেয়ার সেন্টারের জন্য আমার প্ল্যান (পরিকল্পনা) হচ্ছে, পাড়ায় অনেক ক্লিনিক আছে, সেগুলো আধুনিকায়নের জন্য বিশেষ বরাদ্দ আনার উদ্যোগ নেব, যাতে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য বড় হাসপাতালে মানুষকে ভিড় করতে না হয়।
আমরা যেটা করব, সেটা হচ্ছে সংসদে যেতে পারলে ‘নো সার্ভিস, নো বিল’ নীতির জন্য খসড়া আইন প্রস্তাব করব এবং চাপ সৃষ্টি করব।
নির্বাচনী ইশতেহারে ‘নো সার্ভিস নো বিল’ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। নির্বাচিত হলে এটি কীভাবে বাস্তবায়ন করবেন। বাস্তবে কাজটি করা কি সম্ভব হবে?
তাসনিম জারা: আমরা যেটা করব, সেটা হচ্ছে সংসদে যেতে পারলে ‘নো সার্ভিস, নো বিল’ নীতির জন্য খসড়া আইন প্রস্তাব করব এবং চাপ সৃষ্টি করব। তিতাস যদি গ্যাস দিতে না পারে, তাহলে মাসিক বিল যাতে মওকুফ হয়, খসড়া আইনে সেই প্রস্তাব করব আমরা। সরকার যদি পাইপলাইনে গ্যাস দিতে ব্যর্থ হয়, সরকার তখন ভর্তুকি মূল্যে বা ন্যায্য দামে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ নিশ্চিত করবে। সিন্ডিকেট করে যদি সিলিন্ডার গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়, তাহলে প্রশাসনকে চাপ দেব, যাতে কঠোর ব্যবস্থা নেয়।