
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বাতিলের সিদ্ধান্তকে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের ‘স্বৈরাচারী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ’ বলে মন্তব্য করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। অবিলম্বে এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় পুনর্বহাল এবং বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছে তারা।
ডাকসু বলেছে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ থেকে সরকারকে বিরত থাকতে হবে। একই সঙ্গে অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলাবিধানের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের কাছে ন্যস্ত করতে হবে।
আজ বুধবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ কথা বলেছে ডাকসু। ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ এই বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা, নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলাবিধান নিশ্চিতের লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করেছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিল পাসের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশ বাতিল করে। সর্বশেষ সচিবালয় বিলুপ্ত করে কর্মকর্তাদের আবার আইন মন্ত্রণালয়ে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সরকারের এমন সিদ্ধান্তের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে ডাকসু বলেছে, সংবিধান অনুযায়ী, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ জন–আকাঙ্ক্ষা।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার সরকার বিচার বিভাগকে প্রভাবিত করে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছে। অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলির ভয় ও পদোন্নতির প্রলোভনের মাধ্যমে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে দমন-পীড়ন করেছে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে নিজেদের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি মৌলিক ভিত্তি। রাষ্ট্রক্ষমতার পৃথক্করণ ও বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতা ছাড়া কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।’
ডাকসুর বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা ছিল বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের অযাচিত প্রভাব হ্রাস এবং সাংবিধানিক ভারসাম্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু এ ধরনের ব্যবস্থা বাতিলের সিদ্ধান্ত বিচার বিভাগের স্বাধীন কার্যক্রমকে আবার নির্বাহী নিয়ন্ত্রণের আওতায় নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি করছে। বর্তমান সরকার বাংলাদেশের জনগণের রায় এবং আকাঙ্ক্ষাকে অবজ্ঞা করছে। গণ-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পরিবর্তে তা বাতিলের সিদ্ধান্ত সরকারের স্বৈরাচারী মনোভাবেরই বহিঃপ্রকাশ।
উল্লেখ্য, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। গত বছরের ৩০ নভেম্বর ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করেছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সেই সরকার। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ১১ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা করে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা বিচারক নিয়োগ ও সচিবালয়–সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো রহিত করার সিদ্ধান্ত নেয়।
গত ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিল, ২০২৬’ পাস হয়। এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আলাদা সচিবালয়ের বিষয়টি আইনি ভিত্তি হারায়। এর ধারাবাহিকতায় গতকাল মঙ্গলবার আইন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিলুপ্ত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ে কর্মরত জুডিশিয়াল সার্ভিসের ১৫ কর্মকর্তা ও বিচারককে মন্ত্রণালয়ে ফেরত নেওয়া হয়।