স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল নিয়েও আলোচনায় অংশ নেননি বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। আজ রোববার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনে কমিটির বৈঠক থেকে তাঁরা ওয়াকআউট করেছেন।
এর আগে সকালে আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল নিয়েও আলোচনায় অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকেন বিরোধী দলের সদস্যরা।
গত বৃহস্পতিবার গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল জাতীয় সংসদে তোলা হয়েছিল। বিল দুটি পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য যথাক্রমে স্বরাষ্ট্র এবং আইন মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।
আজ বিকেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে যোগ দিয়ে আলোচনা শুরুর আগে ওয়াকআউট করেন কমিটির দুজন বিরোধী দলীয় সদস্য। তাঁরা হলেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম ও আবদুল বাতেন। বৈঠক সূত্র জানায়, ওয়াকআউট করার আগে এ দুজন বৈঠকে বলেন, জাতীয় সংসদে এ বিলটি উত্থাপনের বিরোধিতা করে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছিলেন তাঁরা। এর অংশ হিসেবে সংসদীয় কমিটির বৈঠকও তাঁরা বর্জন করবেন।
বৈঠক শেষে সংসদ সচিবালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৈঠক থেকে কমিটির সদস্য মো. নূরুল ইসলাম এবং মো. আবদুল বাতেন ওয়াকআউট করেন। এ বিষয়ে কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন বৈঠকে বলেন, ‘কমিটির সদস্য হিসেবে কোনো সংশোধনী বা মতামত থাকলে তা সভায় উপস্থাপন করা, পরামর্শ দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে বিরোধিতা করার সুযোগ রয়েছে। এটিই কমিটির সদস্যদের দায়িত্ব। তবে সভা থেকে ওয়াকআউট করা সংসদীয় রীতিনীতির মধ্যে পড়ে না।’
গত ছয় মাসে দেশে কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেনি বলে বৈঠকে উল্লেখ করা হয় বলে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়। একই সময়ে মব তৈরির চেষ্টা চললেও কোনো রাজনৈতিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটেনি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেনি বলেও সভায় জানানো হয়।
মিরাজ শেখের অপহরণের দায় সরকারের ওপর চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও বৈঠকে আলোচনা হয়। এ ধরনের দোষারোপের রাজনীতি বা ‘ব্লেম গেম’ পরিহার করা উচিত বলে সভায় মত প্রকাশ করা হয়। বৈঠকে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ পরীক্ষাপূর্বক রিপোর্ট প্রদান–সংক্রান্ত বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। আলোচনা শেষে বিলটি সংসদে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।
কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে বৈঠকে অংশ নেন কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, হুইপ রকিবুল ইসলাম, হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ ও শিরীন সুলতানা।
এর আগে সকালে মানবাধিকার কমিশন বিল নিয়ে আলোচনায় অংশ না নেওয়ার কারণ তুলে ধরে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সরকার ভুক্তভোগী, অংশীজন ও দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতামত উপেক্ষা করে একতরফাভাবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫ রহিত করেছে। বাতিলের সময় সরকার আরও শক্তিশালী আরও কার্যকর আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল; কিন্তু বাস্তবে তার চেয়ে দুর্বল ও সীমিত পরিসরের একটি বিল সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছে।
আরও বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত বিলটি জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈশ্বিক জোটের স্বীকৃত মানদণ্ড, প্যারিস প্রিন্সিপালস এবং প্রাসঙ্গিক আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও ঘোষণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে মাত্র দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে যথাযথ মতবিনিময় এবং স্বাধীনভাবে বিলটি পর্যালোচনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া সুযোগ কার্যত সীমিত করা হয়েছে। এর ফলে স্থায়ী কমিটিকে একটি ‘রাবার স্ট্যাম্পে’ পরিণত করার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
এসব কারণে আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বিরোধী দলীয় সদস্যরা এ বিলের কোনো আলোচনা কিংবা পর্যালোচনায় অংশ না নেওয়া এবং বিলটি পাসের প্রক্রিয়ার কোনো পর্যায়েই অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁরা স্থায়ী কমিটির বৈঠক না থাকার সিদ্ধান্তও নিয়েছেন।
প্রসঙ্গত, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবের পাশাপাশি বেশ কিছু প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের লক্ষ্যে কিছু আইনি সংস্কার আনা হয়েছিল। এ জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। বর্তমান সংসদে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ১৬টি অধ্যাদেশ বিল আকারে আনা হয়নি। ফলে এগুলো কার্যকারিতা হারায়। আর সাতটি অধ্যাদেশ রহিতকরণ বিলের মাধ্যমে বাতিল করা হয়। এগুলো আরও যাচাই-বাছাই করে নতুন বিল আনার কথা বলেছিল সরকার। এর একটি গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ।
অন্যদিকে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশ রহিত করে ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনঃপ্রচলনে এ সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিল পাস করা হয়েছিল। তখন অধিকতর যাচাই-বাছাই করে মানবাধিকার কমিশন আইন আরও শক্তিশালী করার কথা বলেছিল সরকার।
এ দুটি আইনের খসড়া অনুমোদন করার পর থেকে মানবাধিকারকর্মী, রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। খসড়ার কিছু বিষয় নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার সংসদে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল তোলার আগে আগে বিরোধী দল সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে।