গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট জোট গঠন করে নানা কর্মসূচিতে সক্রিয় বাম দলগুলো, তবে নির্বাচনী রাজনীতিতে তার প্রতিফলন নেই
গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট জোট গঠন করে নানা কর্মসূচিতে সক্রিয় বাম দলগুলো, তবে নির্বাচনী রাজনীতিতে তার প্রতিফলন নেই

রাজনীতির হালচাল-৪

বাম দলগুলো পথহারা ভোটের মাঠে, রাজনীতিতেও

দরিদ্র, শ্রমিক ও কৃষকের জন্য রাজনীতি করার দাবি বাম দলগুলোর দীর্ঘদিনের। কিন্তু ভোটের ফল বলছে, যাদের পক্ষে রাজনীতি করার কথা, সেই শ্রেণির ভোটও তারা টানতে পারছে না। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বামপন্থী জোটের সব প্রার্থীই হারিয়েছেন জামানত।

এই নির্বাচন সামনে রেখে বাম ধারার নয়টি দল জোট গঠন করে। এর মধ্যে এককালে চীন ও রুশপন্থী হিসেবে পরিচিত প্রায় সব ধারার দলই ছিল। জোট গড়লেও আসনগুলোতে একক প্রার্থী নিশ্চিত করতে পারেনি। যেমন কিশোরগঞ্জ-১ আসনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী) আলাদা আলাদা প্রার্থী দেয়। কিন্তু কেউ এক হাজার ভোটের ঘর পেরোতে পারেননি। এমনকি বামপন্থী দলগুলোর জোটের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছেন যে মনীষা চক্রবর্তী, তিনিও বরিশাল-৫ আসনে জোটের একক প্রার্থী ছিলেন না।

গত নির্বাচনে বামপন্থী দলের প্রার্থীরা জয়লাভ তো দূরের কথা, জোটের সব প্রার্থীই জামানত হারিয়েছেন। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট আসনে গৃহীত মোট ভোটের আট ভাগের এক ভাগের সমান ভোটও তাঁরা পাননি। এই জোটের নাম ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’। গত বছরের ২৯ নভেম্বর জাতীয় কনভেনশনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এ জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটে। জোটের পক্ষ থেকে ১৪৯ আসনে প্রার্থী দেওয়া হয়েছিল।

বাসদের আলোচিত প্রার্থী মনীষা চক্রবর্তী বরিশাল থেকে ২২ হাজার ৪৮৬ ভোট পান, যা জোটের নেতা–কর্মীদের দৃষ্টিতে সম্মানজনক। জোটের বড় শরিক সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন নরসিংদী-৪ আসনে নির্বাচন করে মাত্র ৮৩৯ ভোট পান। সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ হিল ক্বাফী কুমিল্লা-৫ আসন থেকে পান ৩৪২ ভোট। বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ কিংবা উপদেষ্টা খালেকুজ্জামান নির্বাচনেই অংশ নেননি।

বামপন্থী দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার, দলের গঠনতন্ত্র, নেতাদের বক্তৃতার মূল বিষয় হচ্ছে দরিদ্র শ্রেণি, শ্রমজীবী ও কৃষক। কিন্তু শ্রমিক অঞ্চল, উত্তরবঙ্গের অপেক্ষাকৃত দরিদ্র জনগোষ্ঠী কিংবা কৃষিপ্রধান এলাকা—কোথাও তাদের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়নি। শহুরে মধ্যবিত্তের কাছেও যেতে পারেনি তারা।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে মধ্যপন্থীদের দিয়ে দেশ চলছে এবং তা প্রতিষ্ঠিত। মূল আলোচনা ছিল মধ্যপন্থীদের চাপে রাখা কিংবা ভারসাম্য রক্ষা করবে কে? বামপন্থী নাকি ডানপন্থী দল। ভোটের রাজনীতিতে বামপন্থীদের পেছনে ঠেলে দিন দিন এগিয়েছে ইসলামপন্থীরা। এর বড় উদাহরণ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ঐক্যজোট, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিস, জমিয়তসহ অন্যান্য দল।

গত নির্বাচনে ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’ গড়ে ভোটে অংশ নিয়েছিল সিপিবি–বাসদসহ ৯টি দল। জোট থেকে প্রার্থী দেওয়া হয়েছিল ১৪৯ আসনে। কোনো প্রার্থীরই জামানত টেকেনি। সর্বোচ্চসংখ্যক ভোট পেয়েছিলেন বরিশালে বাসদের মনীষা চক্রবর্তী। মই প্রতীকে তাঁর ভোট ছিল ২২ হাজার ৪৮৬টি।

অন্যদিকে স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের শাসনামল এবং নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান পর্যন্ত বামপন্থী দলগুলো মধ্যপন্থী দলগুলোকে কখনো চাপে রাখা এবং তাদের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার কাজ করেছে। যেমন এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে একে অপরের কার্যালয়ে বৈঠকে বসার ক্ষেত্রে অস্বস্তি ছিল। তখন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন দুই জোটের বৈঠক হয়েছিল সিপিবির কার্যালয়ে। কিন্তু এখন সিপিবি বা অন্য কোনো বাম দলের সেই অবস্থান আছে বলে কেউ মনে করে না। কিছু আলোচনা সভা বা প্রেসক্লাব-গুলিস্তানে ছোটখাটো মিছিল-সমাবেশে সীমাবদ্ধ তাদের কার্যক্রম। অর্থাৎ বামপন্থী দলগুলো রাজনীতি ও ভোটের মাঠ—সবখানেই অনেকটা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে।

বাম গণতান্ত্রিক বিকল্প গড়ে তোলা হবে—এই আলোচনা দীর্ঘদিনের। নেতৃত্বে দলাদলি, বিভক্তি ও কথিত তাত্ত্বিক বিরোধে নিজেদের মধ্যেই কোনো ঐক্য নেই। এ ছাড়া দলগুলোর মধ্যে সন্দেহ-অবিশ্বাস ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রকট। ফলে একেকটি বামপন্থী দল একাধিক ভাগে বিভক্ত হয়ে নামের শেষে ব্র্যাকেট যুক্ত করেছে। বাম দলগুলোর মধ্যে ভাঙন এমন রূপ নিয়েছে, যা ‘অণু-পরমাণুতে’ রূপ নেওয়ার মতো হাস্যরসের সৃষ্টি করে।

স্বাধীনতার আগে কমিউনিস্ট নেতারা ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের অধীন এবং স্বতন্ত্র নির্বাচন করে কিছুটা সাফল্য দেখায়। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রাখার কারণে ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন দলের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচন করে ৯টি আসন পায় বাম ধারার দলগুলো। তবে রাজনীতির মূল শক্তি হিসেবে স্থায়িত্ব পায় বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী। এরপর কমিউনিস্ট বা বামপন্থীরা আর নিজের শক্তিতে দাঁড়াতে পারেনি। দিন দিন শুধু ক্ষয় হয়েছে।

গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টভুক্ত বাম দলগুলোর প্রার্থীদের মধ্যে সর্বাধিক ভোট পান মনীষা চক্রবর্তী। বরিশাল–৫ আসনে তিনি ২২ হাজার ৪৮৬ ভোট পান, তাতেও জামানত রক্ষা হয়নি

ভোটে বামদের ক্ষয় যেভাবে

পঞ্চগড়-২ আসনটিতে সিপিবি সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী ছিল দীর্ঘদিন ধরেই। এর মধ্যে বোদা উপজেলা অন্যতম। সেখানেই জন্ম সিপিবির প্রয়াত সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ফরহাদের। তিনি ওই আসন থেকে ১৯৮৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিল। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সংসদ সদস্য হন সিপিবির মোজাহার হুসেন। ১৯৯৩ সালে মোজাহার হুসেন বিএনপিতে যোগ দেন এবং একাধিকবার সংসদ সদস্য হন। ১৯৯৬ সালে সেখানে সিপিবির প্রার্থী সেলিম উদ্দিন প্রার্থী হয়ে মাত্র ৯৫২ ভোট পান। ২০০১ সালের নির্বাচনে সেলিম উদ্দিন সিপিবির প্রার্থী হিসেবে ১ হাজার ৬৭৩ ভোট পান। ২০০৮ সালের নির্বাচনে সিপিবির আশরাফুল আলম ৯৩৬ ভোট পান। গত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে আশরাফুল আলমের ভোট একটি কমে হয়েছে ৯৩৫টি।

গত নির্বাচনে পঞ্চগড়-২ আসনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপি জিতেছে। সিপিবির প্রার্থীর চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ জাসদ, জাতীয় পার্টি, এমনকি বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির মতো দল।

সাংগঠনিকভাবে সিপিবির আরেকটি শক্তিশালী এলাকা নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর। সেখানেই জন্ম সিপিবির প্রয়াত সভাপতি ও বিপ্লবী মণি সিংহের। এটি নেত্রকোনা-১ আসন। ১৯৯১ সালে ছবি বিশ্বাস সিপিবির প্রার্থী হিসেবে ৩ হাজার ৯১৮ ভোট পান। পরের নির্বাচনে দলটির হয়ে ভোট করেন মণি সিংহের ছেলে দিবালোক সিংহ। তিনি ভোট পান আরও কম—১ হাজার ৭২৮ ভোট। ২০০১ সালের নির্বাচনে দিবালোক সিংহের ভোট বাড়ে, পান ৩ হাজার ৪৯৩ ভোট। ২০০৮ সালে সিপিবির প্রার্থী সিদ্দিকুর রহমান পান ৪ হাজার ৫১৪ ভোট। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে সিপিবির প্রার্থী আলকাছ উদ্দিন মীর পেয়েছেন ৪ হাজার ৪২৯ ভোট। অর্থাৎ সিপিবির ভোট সে অর্থে বাড়েনি।

বামপন্থী রাজনীতির দুর্বলতা বা ঘাটতি নেই, সেটা বলা যাবে না। তবে বর্তমানে দেশে যে রাজনীতি চলছে, তা বামপন্থীদের অনুকূলে নয়। এই রাজনীতির সঙ্গে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার সম্পর্ক নেই।
খালেকুজ্জামান, প্রধান উপদেষ্টা, বাসদ

প্রখ্যাত বামপন্থী রাজনীতিক অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের জন্মস্থান কুমিল্লার দেবীদ্বার। সেখানে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে প্রাদেশিক পরিষদের মন্ত্রীকে হারিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন মোজাফফর। পরেও এলাকাটি বামপন্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে মোজাফফর আহমদ ন্যাপ থেকে নির্বাচন করে ২১ হাজারের বেশি ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ২৬ হাজারের বেশি ভোট পেয়ে অল্প ব্যবধানে হারেন মোজাফফর আহমদ। এরপর ন্যাপ কিংবা বামপন্থী কোনো দল কোনো নির্বাচনেই ভূমিকা রাখতে পারেনি।

একই দশা আরেক বামপন্থী নেতা রাশেদ খান মেননের ক্ষেত্রেও। ১৯৯১ সালে বরিশাল-২ আসন থেকে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, বিএনপিসহ সব দলের প্রার্থীদের হারিয়ে সংসদ সদস্য হন। একই আসনে ১৯৯৬ সালের ভোটে চতুর্থ হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে আরেক ধাপ পিছিয়ে পঞ্চম হন। বিএনপির মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল পান ৬০ হাজারের বেশি। আর মেননের প্রাপ্ত ভোট ৮ হাজারের কিছু বেশি। এরপরের তিনটি নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করে দলটির প্রতীক নৌকা নিয়ে ঢাকা থেকে ভোট করে জয়ী হন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ‘আমি-ডামি’ নির্বাচনে আবার বরিশাল-২ আসন থেকে নির্বাচিত হন মেনন। তবে এবারও নিজ দলের নয়, আওয়ামী লীগের প্রতীকে ভোট করেন। সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বীও কেউ ছিলেন না।

জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু বরাবরই কুষ্টিয়া-২ আসন থেকে ভোট করে আসছেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সাড়ে ২১ হাজার ভোট পেয়ে চতুর্থ হন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে এক ধাপ পিছিয়ে হন পঞ্চম। ২০২১ সালের ভোটে তুলনামূলক ভালো করে তৃতীয় হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করে প্রথমবার সংসদ সদস্য হন তিনি। এরপরের বিতর্কিত দুটি নির্বাচনে (২০১৪ ও ২০১৮) আওয়ামী লীগের সমর্থনে সংসদ সদস্য হয়ে মন্ত্রীও হন। কিন্তু ২০২৪ সালের ‘আমি-ডামি’ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে হেরে যান ইনু।

বাম নেতা রাশেদ খান মেনন, দিলীপ বড়ুয়া, হাসানুল হক ইনু মন্ত্রী হয়েছিলেন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারে

এর বাইরে বামপন্থী দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের বেশির ভাগই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিজয়ী হতে পারেননি। সাম্যবাদী দল, গণ আজাদী লীগ, গণতন্ত্রী পার্টি, ন্যাপসহ অনেক দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের ভোটে দাঁড়াতেই দেখা যায় না।

অবশ্য বাসদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান প্রধান উপদেষ্টা খালেকুজ্জামান ভোটে খারাপ ফল করাকে খুব বড় করে দেখছেন না। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বামপন্থী রাজনীতির দুর্বলতা বা ঘাটতি নেই, সেটা বলা যাবে না। তবে বর্তমানে দেশে যে রাজনীতি চলছে, তা বামপন্থীদের অনুকূলে নয়। এই রাজনীতির সঙ্গে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার সম্পর্ক নেই।

বামপন্থী প্রবীণ এই রাজনীতিক মনে করেন, বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটছে; এটা বেশি দিন চলবে না। তখনই বামপন্থী রাজনীতি শক্তি ফিরে পাবে। তবে এর জন্য বামপন্থীদেরও পরিকল্পনা, কৌশল ও ঐক্য গড়ে তুলতে হবে, এর ঘাটতি আছে।

বামপন্থী দলগুলো এখন মোটাদাগে তিনটি ধারায় যুক্ত রয়েছে। ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদসহ একটি অংশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে; গণসংহতি আন্দোলন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিসহ কয়েকটি দল বিএনপির সঙ্গে; গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টে রয়েছে সিপিবি, বাসদ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন, বাসদ (মার্ক্সবাদী), বাংলাদেশ জাসদ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ-মাহবুব), সোনার বাংলা পার্টি, ঐক্য ন্যাপ।

আওয়ামী লীগ-বিএনপিতে ঝুঁকে যাওয়া

বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৬০। চলতি বছর ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫০টি দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে বামধারার দল ছিল কমবেশি ১১টি। অন্য দলের সঙ্গে জোট করে আরও কিছু অনিবন্ধিত দলের নেতারাও ভোট করেন।

নির্বাচন কমিশনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সব বামপন্থী দলের ভোট ১ শতাংশের কোটা পেরোতে পারেনি। এর মধ্যে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) সর্বাধিক ৬৩টি আসনে নির্বাচনে অংশ নিয়ে শূন্য দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ ভোট পেয়েছে। বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) ৩৬টি আসনে নির্বাচন করে সিপিবির চেয়ে কম ভোট পায়।

জোনায়েদ সাকি ও সাইফুল হক তাঁদের দল নিয়ে আছেন বিএনপির সঙ্গে জোটে। জোনায়েদ সাকি প্রতিমন্ত্রীও হয়েছেন

অথচ ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শুধু সিপিবি একাই সংসদে পাঁচটি আসন পায়, ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১২ আসনে সিপিবিকে ছাড় দিয়েছিল। ওই নির্বাচনে সিপিবি সারা দেশে মোট ভোট পেয়েছিল ছয় লাখের বেশি, যা মোট ভোটের ২ শতাংশের কাছাকাছি। তখন সব মিলিয়ে বামধারার দলগুলো ৩ শতাংশের বেশি ভোট পায়।

বামপন্থী দলগুলো মোটাদাগে তিনটি ধারায় যুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, গণতন্ত্রী পার্টি, সাম্যবাদী দল (এমএল), কমিউনিস্ট কেন্দ্রসহ কিছু দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটভুক্ত হয় ২০০৪ সালে। এরপর ২০০৮ থেকে ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পতনের আগপর্যন্ত তারা জোটবদ্ধ হয়েই নির্বাচনে অংশ নেয়। রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, দিলীপ বড়ুয়া মন্ত্রীও হন। সংসদ সদস্য হন আরও অনেকে। তবে বেশির ভাগই আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীক নৌকা নিয়ে ভোট করেছেন।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনের পর কমিউনিস্টদের রাজনীতির আর তেমন গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা দেখা যায় না। মানুষ তাদের এজেন্ডা বোঝে না। ফলে তাদের কোনো জনসম্পৃক্ততা নেই। ভবিষ্যতেও তারা বাংলাদেশের রাজনীতি কিংবা ভোটে প্রভাব তৈরি করতে পারবে বলে মনে হয় না। বড়জোর আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপির মতো বুর্জোয়া দলগুলোর লেজুড় হিসেবে ছিটেফোঁটা ক্ষমতার স্বাদ পেতে পারে।
মহিউদ্দিন আহমদ, লেখক ও গবেষক

আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির সঙ্গে জোটভুক্ত হয় কিছু বামধারার দল ও নেতা। এর মধ্যে গণসংহতি আন্দোলন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), সাম্যবাদী দল, নাগরিক ঐক্য উল্লেখযোগ্য। তারা বিএনপির সঙ্গে যুগপৎভাবে আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলন করে। তবে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা করে জোনায়েদ সাকির গণসংহতি আন্দোলন ও সাইফুল হকের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি। এর মধ্যে কেবল জোনায়েদ সাকি জয়ী হয়ে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। আ স ম আবদুর রবের জেএসডি, মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্যসহ অন্য দলগুলো আসন সমঝোতার সুযোগ পায়নি।

তৃতীয় ধারাটি হচ্ছে ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’। এই জোটের দলগুলো হচ্ছে সিপিবি, বাসদ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন, বাসদ (মার্ক্সবাদী), বাংলাদেশ জাসদ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ-মাহবুব), সোনার বাংলা পার্টি, ঐক্য ন্যাপ। এর মধ্যে সিপিবি ও বাসদের নেতৃত্বে ছয়টি দল নিয়ে ২০১৮ সালে গঠিত হয়েছিল বাম গণতান্ত্রিক জোট। এর আগে ছিল বাম গণতান্ত্রিক মোর্চা।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি বাতিলের দাবিতে সম্প্রতি স্পিকারকে স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি পালন হয় বাম দলগুলোর নেতৃত্বে

লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের পর কমিউনিস্টদের রাজনীতির আর তেমন গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা দেখা যায় না। মানুষ তাদের এজেন্ডা বোঝে না। ফলে তাদের কোনো জনসম্পৃক্ততা নেই। ভবিষ্যতেও তারা বাংলাদেশের রাজনীতি কিংবা ভোটে প্রভাব তৈরি করতে পারবে বলে মনে হয় না। বড়জোর আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপির মতো বুর্জোয়া দলগুলোর লেজুড় হিসেবে ছিটেফোঁটা ক্ষমতার স্বাদ পেতে পারে।

পৌনঃপুনিক দল ভাঙার কারণে মুসলিম লীগের চেয়েও কমিউনিস্টদের অবস্থা খারাপ হচ্ছে উল্লেখ করে মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, কমিউনিস্টরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার মতো রাজনীতি বোঝে না। তারা শব্দ-পদ-পদবি নিয়ে ঝগড়া করে দল ভাঙে। বুর্জোয়া দলগুলো ক্ষমতায় যেতে পারবে মনে করে এবং গেছে। সে জন্য তাদের মধ্যে ভাঙন হলেও একধরনের সংহতি ধরে রাখতে পারে।