তিস্তার ভাঙনে বিলীন চরাচর। সম্প্রতি লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচায়
তিস্তার ভাঙনে বিলীন চরাচর। সম্প্রতি লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচায়

উত্তরে ভোটের বড় ‘ইস্যু’ তিস্তা, কী চান ভোটাররা

কৃষক, রিকশাচালক, দোকানি, দিনমজুর—যে কারও কাছে এ প্রসঙ্গ তুললেই বলেছেন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তিস্তাপারে সুখ আসবে।

তিস্তা শুধু ভাঙে আর ভাঙে। এই শীতেও তিস্তার ভাঙন থেমে নেই। মাসখানেক ধরে ভাঙন শুরু হয়েছে দক্ষিণ বালা পাড়া গ্রামের সামনের চরে। গ্রামবাসীর আশঙ্কা, আর পাঁচ-সাত দিনের মধ্যে তিস্তার ভাঙন গ্রাম ছোঁবে।

তিস্তার দুই তীরের শত শত গ্রামের একটি লালমনিরহাট জেলার আদিতমারী উপজেলার মহিষখোঁচা ইউনিয়নের দক্ষিণ বালা পাড়া গ্রাম। গত শনিবার সকালে ওই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পশ্চিম থেকে পুবে বয়ে যাওয়া তিস্তা গ্রামের দিকে সামান্য ঝুঁকে পড়েছে। তাতেই ফসলসহ মাঠ, চর তিস্তার বুকে ভেঙে পড়ছে। নদীর পাশে দাঁড়ালেই বালুর চর ভেঙে পড়ার দৃশ্য চোখে পড়ে। সেচযন্ত্রের (শ্যালো মেশিন) শব্দের সঙ্গে ঝপ ঝপ করে কানে আসে পানিতে চর ভেঙে পড়ার শব্দ।

সরকার আসলেই বলে, এটা করব, সেটা করব। করে না কিছু। বলে তিস্তা খনন করবে। করে না।
মো. আবু বক্কার সিদ্দিকী

বিস্তীর্ণ চরে ফসলের চাষ। সূর্যমুখী, শর্ষে, পেঁয়াজ, রসুন, আলু আর তামাক। মো. আবু বক্কার সিদ্দিকী প্রায় তিন বিঘা জমিতে সূর্যমুখীর আবাদ করেছেন, কিছু রসুনও আছে। তিস্তার ভাঙন না থামলে তাঁর ফসলও নদীগর্ভে বিলীনের আশঙ্কা আছে। তিনি বলেন, গ্রামের সামনে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি বাঁধ আছে। ভাঙন সে পর্যন্ত না গেলে সরকার কিছু করবে না।

মূল বাড়ি দক্ষিণ বালা পাড়া হলেও মো. আবু বক্কার সিদ্দিকী ১৯৯২ সালে নতুন বাড়ি করেছেন পাশের বারোঘরিয়া গ্রামে। তিস্তায় ১২ বিঘা জমিসহ বসতবাড়ি তলিয়ে যায়। তাঁর ৫০ বছরের জীবনে দুবার নতুন বাড়ি করতে হয়েছে। আসন্ন নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ইচ্ছা আছে তাঁর। তিনি বলেন, ‘সরকার আসলেই বলে, এটা করব, সেটা করব। করে না কিছু। বলে তিস্তা খনন করবে। করে না।’

মো. আবু বক্কর সিদ্দিকীর জমির পাশেই বালুর ওপর তামাকের পাতা শুকাচ্ছিলেন মোর্শেদা বেগম ও তাঁর স্বামী মুজিবর রহমান। দুজনেরই বয়স ৬০ বছরের ওপরে। মোর্শেদা বেগম বলেন, বিয়ের পর থেকে মোট ২৫ বার বাড়ি চলে গেছে তিস্তায়।

দক্ষিণ বালা পাড়া, বারোঘড়িয়া ও গোবর্ধন পাশাপাশি তিনটি গ্রাম। এই গ্রামগুলোয় পাকা বাড়ি বিরল। ঘরগুলো অনেকটা অস্থায়ী ধরনের; টিনের চাল, টিনের বেড়া। গোবর্ধন গ্রামের তামাকচাষি রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘স্থায়ী ঘরবাড়ি করা যায় না। বউ-বাচ্চা নিয়ে নিশ্চিন্তে থাকা যায় না।’

রাশেদুল ইসলাম, মোর্শেদা বেগম, মুজিবুর রহমান ও মো. আবু বক্কার সিদ্দিকী—তাঁরা প্রত্যেকেই তিস্তা সমস্যার সমাধান চান। রাশেদুল ইসলাম জানান, তিস্তার ভাঙন এই এলাকার বড় সমস্যা।

মো. আবু বক্কর সিদ্দিকীর জমির পাশেই বালুর ওপর তামাকের পাতা শুকাচ্ছিলেন মোর্শেদা বেগম ও তাঁর স্বামী মুজিবর রহমান। দুজনেরই বয়স ৬০ বছরের ওপরে। মোর্শেদা বেগম বলেন, বিয়ের পর থেকে মোট ২৫ বার বাড়ি চলে গেছে তিস্তায়।

তিস্তার ভাঙনের কারণে উত্তরাঞ্চলের মানুষের দারিদ্র্য দূর হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন লালমনিরহাট জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি আবু হাসনাত রানা। তিনি বলেন, ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা একটি জনপ্রিয় ইস্যু। একই সঙ্গে এটি একটি আন্তর্জাতিক বিষয়ও বটে। বাংলাদেশ, চীন, ভারতসহ সব পক্ষকে তিস্তা মহাপরিকল্পনার ব্যাপারে একমত হতে হবে।’

কোথা থেকে কোথায় যায় তিস্তা

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তিস্তা নিয়ে এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫ হাজার ৩৩০ মিটার উচ্চতায় হিমালয়ে তিস্তার উৎস। ভারতের সিকিমের পর পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার জেলা হয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে তিস্তা। বাংলাদেশ অংশে তিস্তার ডান পাড়ে নীলফামারী জেলার ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলা, রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলা। বাঁ পাড়ে লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারী ও সদর উপজেলা এবং কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট, উলিপুর ও চিলমারী উপজেলা। সর্বশেষ গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা। সুন্দরগঞ্জে তিস্তা মিশেছে ব্রহ্মপুত্র নদে।

ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশ মিলিয়ে তিস্তা নদীর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৪১৫ কিলোমিটার। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তিস্তা নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ১১৫ কিলোমিটার।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা একটি জনপ্রিয় ইস্যু। একই সঙ্গে এটি একটি আন্তর্জাতিক বিষয়ও বটে। বাংলাদেশ, চীন, ভারতসহ সব পক্ষকে তিস্তা মহাপরিকল্পনার ব্যাপারে একমত হতে হবে।
লালমনিরহাট জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি আবু হাসনাত রানা

‘তিস্তা নদী: পরিবেশগত সংকট ও পুনরুদ্ধার’ শিরোনামের এক গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়েছে, তিস্তার উজানে ভারতীয় অংশে একাধিক বাঁধ নির্মাণের কারণে বাংলাদেশ অংশে তিস্তার পানিপ্রবাহ কমেছে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ। এতে শুষ্ক মৌসুমে পানিসংকটে কৃষকের খরচ বেড়েছে ৩০০ শতাংশ। অন্যদিকে বর্ষায় উজান থেকে আসা অতিরিক্ত পানির কারণে সৃষ্ট বন্যায় ক্ষতি হয় ফসলের। এসব কারণে দুই পাড় থেকে ২০২০ সালে ৯০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। গবেষণাটি গত ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন ও বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল নেটওয়ার্কের (বাপা-বেন) জাতীয় পরিবেশ সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়।

মানুষ কী চায়

মহিষখোঁচা বাজারে একটি চায়ের দোকানে কাজ করেন মো. উজ্জ্বল মিয়া। বয়স ২৫ বছর। তিনি ভোটার হয়েছেন ২০১৯ সালে। প্রথম ভোট দেওয়ার সুযোগ হয়েছিল ২০২৪ সালে। ভোটে কেন্দ্রে যাওয়ার পর জানতে পারেন, তাঁর ভোট অন্য কেউ দিয়ে দিয়েছে। এই তরুণ বলেন, তিনি আশা করেন এবার তিনি নিজের ভোটটি নিজেই দিতে পারবেন।

উজ্জ্বল আরও বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তিস্তা সমস্যার সমাধান হবে। শুধু মো. উজ্জ্বল নয়; কৃষক, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, দোকানি, দিনমজুর, রাজনীতিক—যে কারও কাছে তিস্তার প্রসঙ্গ তুললেই প্রত্যেকে বলেছেন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তিস্তাপারে সুখ আসবে। কিন্তু কেউই ঠিক বলতে পারেন না কী সেই মহাপরিকল্পনা বা তাতে কী আছে।

চায়ের দোকানে কথা বলার সময় আরও কয়েকজন আলোচনায় যুক্ত হন। উজ্জ্বল বলেন, মহাপরিকল্পনায় নদী খনন ও নদীপাড়ে বাঁধ দেওয়ার কথা বলা আছে। দোকানমালিক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা শুনেছি নদীর পাড়ে কলকারখানা করা হবে।’ কাপড়ের দোকানি রবিউল ইসলাম বলেন, মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে চীন ও বাংলাদেশ সরকার। ভারতের কারণে অনেক ক্ষতি হচ্ছে, এমন কথা বলার পর তিনি উল্লেখ করেন, মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রতিবেশীকে সঙ্গে রাখা ভালো।

নদী খননের ব্যাপারেই মানুষের আগ্রহ বেশি এবং খনন থেকে মানুষ লাভটাও চোখের সামনে দেখতে পারেন। গোবর্ধন গ্রামের রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘তিস্তা খনন হলে জায়গাজমি ভাসবে (জাগবে)। এতে জমি ফেরত পাওয়া যাবে। কৃষি বাড়বে।’

উজ্জ্বল আরও বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তিস্তা সমস্যার সমাধান হবে। শুধু মো. উজ্জ্বল নয়; কৃষক, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, দোকানি, দিনমজুর, রাজনীতিক—যে কারও কাছে তিস্তার প্রসঙ্গ তুললেই প্রত্যেকে বলেছেন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তিস্তাপারে সুখ আসবে। কিন্তু কেউই ঠিক বলতে পারেন না কী সেই মহাপরিকল্পনা বা তাতে কী আছে।

‘কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন অব তিস্তা রিভার প্রজেক্ট’ বা তিস্তা নদীর সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প নিচ্ছে সরকার। এটি তিস্তা মহাপরিকল্পনা নামেও পরিচিত। এ প্রকল্পের মাধ্যমে নদী খনন, ভূমি উদ্ধার ও উন্নয়ন, বাঁধ নির্মাণ, চর খনন, নদীর দুই পাড়ে স্যাটেলাইট শহর নির্মাণ, বালু সরিয়ে কৃষিজমি উদ্ধারসহ নানা কাজের কথা বলা হয়েছে।

উত্তরবঙ্গে গ্রামে বা শহরে প্রত্যেকেই তিস্তার ব্যাপারে সোচ্চার। প্রতিটি দলের প্রার্থী তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় তিস্তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। যে পাঁচটি জেলার ওপর দিয়ে তিস্তা বয়ে গেছে, নির্বাচনী ইস্যুটি শুধু সেই পাঁচটি জেলায় সীমাবদ্ধ নেই। তিস্তা এখন পুরো উত্তরবঙ্গের ইস্যু।

তিস্তার সমস্যা সমাধান আমাদের অনেক বেশি প্রয়োজন। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য যা করার দরকার, আমরা করব। চীনের রাষ্ট্রদূত রংপুরে আসলে আমরা বলেছি আমরা চীনের সঙ্গে এই ইস্যুতে কাজ করতে প্রস্তুত।
লালমনিরহাট জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির ও লালমনিরহাট-৩ আসনের জামায়াতের প্রার্থী মো. আবু তাহের

বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও লালমনিরহাট জেলা বিএনপির সভাপতি আসাদুল হাবিব দুলু গত শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন বিএনপির অগ্রাধিকার। এ ব্যাপারে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা এক দিকে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা চাই, অন্যদিকে তিস্তাপারের দুই কোটি মানুষের দুঃখ–দুর্দশা–কষ্ট দূর করতে সব ধরনের উদ্যোগ নিতে প্রস্তুত।’

উত্তরবঙ্গে গ্রামে বা শহরে প্রত্যেকেই তিস্তার ব্যাপারে সোচ্চার। প্রতিটি দলের প্রার্থী তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় তিস্তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। যে পাঁচটি জেলার ওপর দিয়ে তিস্তা বয়ে গেছে, নির্বাচনী ইস্যুটি শুধু সেই পাঁচটি জেলায় সীমাবদ্ধ নেই। তিস্তা এখন পুরো উত্তরবঙ্গের ইস্যু।

লালমনিরহাট জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির ও লালমনিরহাট-৩ আসনের জামায়াতের প্রার্থী মো. আবু তাহের প্রথম আলোকে বলেন, ‘তিস্তার সমস্যা সমাধান আমাদের অনেক বেশি প্রয়োজন। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য যা করার দরকার, আমরা করব। চীনের রাষ্ট্রদূত রংপুরে আসলে আমরা বলেছি আমরা চীনের সঙ্গে এই ইস্যুতে কাজ করতে প্রস্তুত।’

তিস্তার সমস্যা নিয়ে রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও চিন্তিত। সমস্যা সমাধানে বহুদিন ধরে নানা আন্দোলন সংগ্রামও হয়েছে নাগরিক সমাজের নেতৃত্বে। গড়ে উঠেছে একাধিক সংগঠন। রেল, নৌ যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির কুড়িগ্রাম জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক খন্দকার আরিফ প্রথম আলোকে বলেন, ‘তিস্তা উত্তরাঞ্চল বা গোটা রংপুর বিভাগের একটি বড় ইস্যু। তিস্তা মহাপরিকল্পনার একটি আলাপ মানুষজন শুনেছে। কিন্তু মানুষজন কোনো ধরনের বাস্তবায়নের দৃশ্য চোখে দেখছে না। এ নিয়ে তাদের মধ্যে হতাশা আছে।’