
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দল থেকে মনোনয়ন না দেওয়ার জন্য বিএনপিকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, ‘আমাকে মনোনয়ন না দেওয়ার কারণেই আমি বুঝতে পেরেছি, বাংলাদেশের টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত কত লাখ মানুষের ভালোবাসা, দোয়া ও সহযোগিতা আমার পাশে ছিল। একটা দলীয় গণ্ডির মধ্যে থেকে নির্বাচন করলে এটা বোঝার সৌভাগ্য আমার হতো না।’
এ সময় রুমিন ফারহানা তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ‘দেশনেত্রী যিনি আমাকে স্নেহ দিয়ে রাজনীতিতে এনেছিলেন এবং আমি বিশ্বাস করি তাঁর অপূর্ণতা এই সংসদে কোনো দিন পূরণ হবে না।’
নিজ নির্বাচনী এলাকার জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এই স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য বলেন, ‘আমার অসংখ্য নেতা–কর্মী বঞ্চিত হয়ে, ভয়ভীতির মধ্যে থেকে আমার নির্বাচন করেছে। দল থেকে বহিষ্কার হয়েছেন; কিন্তু তারা আমাকে ছেড়ে যায়নি।’
রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য, বর্তমানে স্বতন্ত্র সদস্য রুমিন ফারহানা আজ মঙ্গলবার এ কথা বলেন। সকাল সাড়ে ১০টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়।
এতটুকু স্বাধীনতা রাষ্ট্রপতিকে দিতে পারিনি
রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনার জন্য বারবার আলোচনা হয়েছে। সরকারি দল, বিরোধী দল, চব্বিশের অভ্যুত্থানের আগে-পরে সব সময় বলা হয়েছে ক্ষমতার ভারসাম্য আনার কথা। বিএনপি তার ভিশন ২০৩০ ও ৩১ দফায় এ–সম্পর্কিত প্রস্তাব রেখেছে। এ কারণে প্রত্যাশা ছিল, এবার রাষ্ট্রপতি মন্ত্রিপরিষদ অনুমোদিত ভাষণের বাইরে গিয়ে নিজের মতো করে ভাষণ দিতে পারবেন। কিন্তু আমরা দেখলাম, এবারও মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদিত ভাষণ দিতে হয়েছে। এতটুকু স্বাধীনতা আমরা রাষ্ট্রপতিকে দিতে পারিনি, তাহলে আমরা কোন ভারসাম্যের কথা বলছি?’
দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার সমালোচনা
বাংলাদেশ ব্যাংক ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার সমালোচনা করেছেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে প্রিন্সটন বা ক্যালিফোর্নিয়া থেকে পিএইচডি ডিগ্রিধারী অভিজ্ঞতাসম্পন্ন লোকজন নিয়োগ পেয়েছেন। বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠনের পর যিনি নিয়োগ পেয়েছেন তিনি হলেন বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য এবং সোয়েটার ফ্যাক্টরির একজন মালিক।
রুমিন ফারহানা বলেন, একই ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রেও। সব কটি বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় ভিসি, প্রো-ভিসি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দল করা দোষের কিছু নয়; কিন্তু দল না করলে যদি নিয়োগ না হয়, সেটা দুর্ভাগ্যজনক।
হাজারো মানুষের আত্মত্যাগ হচ্ছে এই সংসদ
হাজারো মানুষের আত্মত্যাগ হচ্ছে এই সংসদ উল্লেখ করে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘এই মানুষগুলো কারা, যাদের আত্মত্যাগে আজ আমরা কেউ এমপি, কেউ মন্ত্রী, কেউ বিরোধী দল হয়ে সংসদে এসেছি। তাদের স্বপ্ন কী ছিল? তারা ছিল দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ জনগণ। তারা নতুন বাংলাদেশ তৈরির স্বপ্ন দেখেছিল। নতুন রাজনীতি নির্মাণ ও নতুন চিন্তার জন্ম দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। গত কয়েক বছরের ভীষণ রকম বৈষম্য থেকে মুক্ত হয়ে সবাইকে নিয়ে একটা বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল। তাদের কাছে আমিসহ এই সংসদ কৃতজ্ঞ বলে মনে করি।’
রুমিন বলেন, ‘যে প্রত্যাশা নিয়ে গণ–অভ্যুত্থান, তাদের প্রত্যাশা কিন্তু বায়বীয় ও অলীক ছিল না। এখনো দেয়ালে দেয়ালে তাকালে দেখব, তারা তাদের স্বপ্নের কথা লিখে গেছে। এই লড়াই কেবল একটা সরকার পরিবর্তনের লড়াই ছিল না।’ তিনি বলেন, সবাইকে নিয়ে সবার বাংলাদেশ গঠন করার স্বপ্ন নিয়ে গণ–অভ্যুত্থান হয়েছিল।
বছর পার না হতেই নারীরা হারিয়ে গেলেন কেন
রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম, ধর্ম-বর্ণ–জাতিগোষ্ঠী বা লৈঙ্গিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে ‘অপর’ করে দেওয়া হবে না। আমি খুব বিনয়ের সঙ্গে বলি, এই আন্দোলনের সম্মুখসারিতে ছিলেন নারীরা। একঝাঁক নতুন প্রজন্মের তরুণ মুখ আমরা পেয়েছিলাম। সেই নারীরা এক বছর পার না হতেই হারিয়ে গেলেন কেন? সাতজন নারী সংসদ সদস্যের এই সংসদে সেই প্রশ্নটা আমি আপনাদের কাছেই রেখে যাচ্ছি।’
স্বতন্ত্র এই নারী সংসদ সদস্য আরও বলেন, মিছিলের সামনের সারিতে নারীর প্রয়োজন হয়, পুলিশের কাঁদানে গ্যাসের শেল ও লাঠিপেটার সামনে নারী ঢাল হয়ে দাঁড়ায়, অস্থির সময় নারীর সাহায্য ছাড়া পার হওয়া যায় না। আর সবকিছু যখন ঠিক হয়ে যায়, তখন নারী হয়ে যায় ট্রলের বস্তু। নারীর পোশাক, নারীর চেহারা, নারীর কথা, নারীর হাসি সবকিছুই তখন হাসির খোরাকে পরিণত হয়। তিনি বলেন, ৫২ শতাংশ মানুষকে পেছনে ফেলে নতুন বাংলাদেশ রচনার কোনো চিন্তা যদি কেউ করে থাকে, সেটা কখনো সম্ভব নয়, কোনো দিন সম্ভব নয়।
বিএনপির সাবেক এই নেত্রী বলেন, ‘কর্মমুখী শিক্ষা দিয়ে চাকরির জন্য প্রস্তুত করতে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি। উচ্চ খাদ্যমূল্যস্ফীতির কারণে বিশ্বব্যাংকের ঝুঁকিপূর্ণ লালতালিকায় ইতিমধ্যে বাংলাদেশের নাম গেছে। একক শিল্প হিসেবে তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে বৈদেশিক ঋণ বেড়ে ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগের ক্রমাবনতি মোকাবিলা করতে হলে রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি ও বিদেশে দক্ষ শ্রমিক পাঠানোর কোনো বিকল্প নেই।’
রুমিন ফারহানা বলেন, গত ১৫ বছরে দেশ থেকে যে বিপুল পরিমাণ টাকা পাচার হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মতে এর পরিমাণ ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। এই টাকা ফেরত আনা না গেলে কিংবা ব্যাংক খাতে থাকা ছয় লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনা না গেলে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের কোনো পরিকল্পনাই কাজে আসবে না। মিথ্যা ইনভয়েসিং বন্ধ করা না গেলে টাকা পাচার বন্ধ হবে না।