স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর সার্কিট হাউস এলাকার তথ্য ভবন মিলনায়তনে
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর সার্কিট হাউস এলাকার তথ্য ভবন মিলনায়তনে

রাষ্ট্র–প্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না হওয়ায় আক্ষেপ মির্জা ফখরুলের, ‘আমি দেখছি কিছুই বদলায়নি’

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মানুষের আত্মত্যাগ এবং পরবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও প্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না হওয়ায় আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠনের পর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেছেন, ‘আমি দেখছি যে কিছুই বদলায়নি।’

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন মির্জা ফখরুল। আজ বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর সার্কিট হাউস এলাকার তথ্য ভবন মিলনায়তনে এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এ ছাড়া এই আয়োজনে তথ্য অধিদপ্তরের প্রকাশনার মোড়ক উন্মোচন করা হয়; উদ্বোধন করা হয় আলোকচিত্র প্রদর্শনীর। আলোচনা সভার শুরুতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালনের পাশাপাশি দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।

অনুষ্ঠানে আক্ষেপ করে মির্জা ফখরুল নানা প্রসঙ্গ তুলেন। তিনি বলেন, আগে যারা ঘুষ খেত, তারা ঘুষ খাওয়ার ফন্দিফিকির করছে। একইভাবে যারা ভালো একটা কাজ আটকে দিত, তারা এখনো তা আটকে দিচ্ছে। লোকজন ভোল পাল্টাচ্ছে। ভোল পাল্টানো লোকজনই এখন অনেক বেশি জুলাই যোদ্ধা হয়ে গেছে।

বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘এই কথাগুলো আক্ষেপে বলছি। আক্ষেপে বলছি এ জন্য, আমার বয়স অনেক। আমি তো সত্যিকার অর্থেই এবার পরিবর্তনটা দেখতে চেয়েছিলাম। এখন পর্যন্ত সেটা আমি দেখছি না আমাদের মধ্যে।’

প্রশাসনের পুরোনো সংস্কৃতি বহাল রয়েছে বলে উল্লেখ করেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী। তিনি বলেন, শুধু সরকার বা রাজনৈতিক নেতৃত্ব নয়, সমাজের প্রতিটি মানুষের মন–মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন, অন্যথায় জুলাইয়ের আত্মত্যাগ কাঙ্ক্ষিত ফলাফল বয়ে আনবে না।

হতাশা ভর করলেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রচেষ্টায় পরিবর্তন দেখছেন বলে উল্লেখ করেন মির্জা ফখরুল। বিএনপির মহাসচিব বলেন, তিনি আশাবাদী এ কারণে যে তিনি পরিবর্তন দেখছেন একজন মানুষের মধ্যে, তিনি তারেক রহমান। তিনি চেষ্টা করছেন। তিনি নতুন নতুন নজির স্থাপন করছেন। সেই নজিরকে যদি সবাই মিলে সামনে নিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে হয়তোবা পরিবর্তনটা হবে। সে জন্য সবাই মিলে প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন দেওয়া দরকার।

মির্জা ফখরুল বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাস মূলত পরিবর্তনের ইতিহাস। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান—প্রতিটি পরিবর্তনের জন্যই মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে। তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জুলাই গণ-অভ্যুত্থান প্রথমে একটি নির্দিষ্ট দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছিল। পরে তা রাষ্ট্র ও সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনে রূপ নেয়। সে অভ্যুত্থানে বহু তরুণ প্রাণ হারিয়েছেন। অসংখ্য পরিবার সন্তান হারানোর বেদনা বয়ে বেড়াচ্ছে। এই আত্মত্যাগের মূল্য তখনই সার্থক হবে, যখন রাষ্ট্র ও সমাজে প্রকৃত পরিবর্তন প্রতিষ্ঠিত হবে।

রাজনৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমে পরিবর্তনের কিছু উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন বিএনপির মহাসচিব। তিনি বলেন, সেই প্রচেষ্টাকে সফল করতে সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে।

মির্জা ফখরুল একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, মেধাভিত্তিক ও তরুণবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, জুলাইয়ের চেতনার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হবে এমন একটি রাষ্ট্র গঠন করা, যেখানে মানুষের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না। কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন বাস্তবে রূপ নেবে।

‘জুলাইয়ের চেতনার উৎস মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মধ্যেই নিহিত’

আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক সংগ্রামে বিরোধীদলের নেতা-কর্মীরা কারাবরণ, নির্যাতন ও মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছেন। এই দীর্ঘ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় জুলাই গণ–অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের কৌশল ও ছাত্রদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে আন্দোলন সর্বজনীন রূপ পায়। শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচার পতনের পথ তৈরি হয়।

মুক্তিযুদ্ধকে যেমন কোনো ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক প্রকল্পে পরিণত করা উচিত নয়, তেমনি জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের চেতনাকেও কোনো স্বার্থান্বেষী উদ্যোগের অংশ হতে দেওয়া যাবে না বলে মন্তব্য করেন তথ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ–অভ্যুত্থান একই গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার ধারাবাহিকতা। ভবিষ্যতের বাংলাদেশে রাজনৈতিক চর্চার ক্ষেত্রে এ চেতনাই পথনির্দেশক হওয়া উচিত।

জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষা পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আবার মানুষকে রক্ত দিতে হয়েছে। জুলাইয়ের চেতনার উৎস মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মধ্যেই নিহিত। রাষ্ট্রে অন্যায়, নিপীড়ন ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের শক্তি সেখান থেকেই এসেছে।

‘জুলাইয়ের চেতনা বিকৃতের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে হবে’

বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান এ কে এম আবদুল হাকিম বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় ন্যায়সংগত ও সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী বলেন, বিগত সময়ে ফ্যাসিবাদী শাসন টিকিয়ে রাখতে গণমাধ্যমের একটি অংশ ভূমিকা রেখেছিল। একই সঙ্গে তিনি শহীদদের স্মরণে ‘জুলাই শহীদ স্মৃতিসৌধ’ নির্মাণ, শহীদ পরিবারের জন্য সম্মানজনক সহায়তা এবং হত্যাকাণ্ডের দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।

জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান হঠাৎ করে ৩৬ দিনে সৃষ্টি হয়নি; এর পেছনে ছিল দীর্ঘ ১৭ বছরের দমন-পীড়ন, গুম, হত্যা ও রাজনৈতিক নিপীড়নের ইতিহাস, যা ভুলে গেলে আন্দোলনের প্রকৃত প্রেক্ষাপট আড়াল হয়ে যাবে। জুলাই ও মুক্তিযুদ্ধ পরস্পরবিরোধী নয়, বরং তা গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মুক্তচিন্তার বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষার ধারাবাহিকতা। তাই জুলাইয়ের চেতনাকে বিকৃত বা দুর্বল করার সব ধরনের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে হবে।

বাংলাদেশ স্কাউটসের উপপ্রধান জাতীয় কমিশনার ও শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ বলেন, জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণেরা নিজেদের সহযোদ্ধাদের নিহত হতে দেখেও পিছু হটেননি। দীর্ঘ ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকাঠামো থেকে মুক্তির তীব্র আকাঙ্ক্ষাই তাঁদের সেই সাহস জুগিয়েছিল।

আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রুটিন দায়িত্ব) মো. শাহ আলম, বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) সদস্য চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস, প্রতিদিনের বাংলাদেশের সম্পাদক মারুফ কামাল খান প্রমুখ।

প্রদর্শনী

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে তথ্য ভবন প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী বিশেষ চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। এতে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ ধরে তোলা বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসা আলোকচিত্র প্রদর্শন করা হচ্ছে; পাশাপাশি প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে ২০২৪ সালের ৬ আগস্টের কয়েকটি জাতীয় দৈনিকের প্রথম পাতা। এতে গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার খবর আছে।