মাওলানা মামুনুল হক
মাওলানা মামুনুল হক

এই নির্বাচন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভাগ্য নির্ধারণের নির্বাচন: মাওলানা মামুনুল হক

দেশবাসীকে ইনসাফের পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বলেন, ‘এবারের নির্বাচন কেবল ক্ষমতা বদলের নির্বাচন নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভাগ্য নির্ধারণের নির্বাচন। আপনাদের একটি ভোট হতে পারে ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার নিয়ামক। ভয়মুক্তভাবে ইনসাফের পক্ষে ভোট দিন।’

সোমবার বিকেলে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারে জাতির উদ্দেশে দেওয়া নির্বাচনী ভাষণে এ কথা বলেন মামুনুল হক। ভাষণের শুরুতে তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধ, শাপলা চত্বর ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।

ভাষণে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন করে ইনসাফ ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার করেছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির। তিনি বলেন, ক্ষমতা দখলের রাজনীতি রাষ্ট্র ও সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন ও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

দেশবাসীর উদ্দেশে মাওলানা মামুনুল হক বলেন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ক্ষমতার জন্য নয়, ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনীতি করে। নির্বাচন মানে নাটক আর সংসদ মানে হাত তোলার যন্ত্র, এমন রাজনীতি তাঁরা চান না।

এ সময় সবাইকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে মামুনুল হক বলেন, চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের পর দীর্ঘ সংলাপ শেষে প্রণীত রাষ্ট্র সংস্কারের একগুচ্ছ প্রস্তাব–সংবলিত জুলাই সনদের ন্যায্য দাবিগুলোকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস আন্তরিকভাবে সমর্থন করে। গণভোটের যে বিষয়গুলো সুনির্দিষ্ট পয়েন্ট আকারে সন্নিবেশিত হয়েছে, তার অনেকগুলোতেই দ্বিমত করার অবকাশ থাকলেও এর চেয়ে সুন্দর কোনো বিকল্প নেই। তাই দ্ব্যর্থহীন ভাষায় দেশবাসীকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ভাষণে তরুণদের উদ্দেশে মামুনুল হক বলেন, তাঁরা এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তুলবেন, যেখানে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে উদ্যোক্তা তৈরি, চাকরি ও কর্মসংস্থান। মুষ্টিমেয় গোষ্ঠীর স্বার্থ নয়, বরং কোটি তরুণের ভবিষ্যৎ। প্রতিটি পরিবারের ন্যূনতম একজনের উপার্জনের সুযোগ সৃষ্টি করে কর্মসংস্থান পরিকল্পনা গ্রহণ করবেন। দেশীয় শিল্প ও বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে তাঁরা তরুণদের জন্য সম্মানজনক ও টেকসই কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার খুলে দেবেন।

নারীদের উদ্দেশে মামুনুল হক বলেন, তাঁরা নারীকে ভোগের বস্তু নয়, রাষ্ট্র গঠনের অংশীদার হিসেবে দেখতে চান। ইসলামি মূল্যবোধের আলোকে নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন। কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি হয়রানির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করবেন। অসহায় নারীদের জন্য সরকারি আশ্রয় কেন্দ্র, আইনি সহায়তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবেন। যৌতুক ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে কঠোর আই প্রয়োগ এবং সম্পদে নারীর প্রাপ্তি শতভাগ নিশ্চিত করবেন।

বক্তব্যে কৃষক, শ্রমিক ও প্রবাসীদের জন্যও আলাদা পরিকল্পনার কথা জানান মামুনুল হক। তিনি বলেন, সব কৃষিপণ্য সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া সহজ করবেন। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেবেন। কৃষিযন্ত্র, সার ও বীজে ভর্তুকি এবং সহজ কিস্তির সুবিধা দেবেন। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করবেন। একই সঙ্গে প্রবাসীদের জন্য আলাদা সেবা কাঠামো এবং সম্মানজনক রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ব্যবস্থা করবেন তাঁরা।

কোরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার কথা জানিয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির বলেন, ‘রাষ্ট্রের প্রত্যেক নাগরিকের নিজ ধর্ম পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে, যা সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত হবে। তবে কেউ তাঁর নিজস্ব ধর্ম, উপধর্ম বা ভ্রান্ত মতবাদকে অন্য কোনো স্বীকৃত ধর্মের নামে প্রচার বা প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। রাষ্ট্র পরিচালনায় কোরআন ও সুন্নাহ সর্বোচ্চ নির্দেশনা হিসেবে থাকবে।’

কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণার কথা জানিয়ে মামুনুল হক বলেন, ‘খতমে নবুয়ত অস্বীকারকারী কাদিয়ানি তথা আহমদিয়া সম্প্রদায়কে অমুসলিম হিসেবে স্বীকৃতি দেব, যেমনটি বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশে কার্যকর রয়েছে। তবে কোনো নাগরিকের জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রাষ্ট্র কখনো ক্ষুণ্ন করবে না।’

কওমি শিক্ষার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা তুলে ধরে মামুনুল হক বলেন, কওমি মাদরাসা শিক্ষার উন্নয়ন, সম্প্রসারণ ও মানোন্নয়নের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। কওমি শিক্ষার সরকারি সনদ ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিকে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। এ লক্ষ্যে বিদ্যমান কওমি শিক্ষা বোর্ডসমূহের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন, স্বায়ত্তশাসিত ও আইন দ্বারা সুরক্ষিত কওমি শিক্ষা মঞ্জুরি কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হবে।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ইশতেহারের কথা তুলে ধরে মামুনুল হক বলেন, ইশতেহারে পাঁচটি অধ্যায়ে ২২ দফা সুস্পষ্ট অঙ্গীকার করেছেন তাঁরা। যেখানে ছয়টি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তাঁদের ইশতেহার কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, এটি বাস্তবায়ন তাঁদের ইমানি দায়িত্ব।