আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে একই মঞ্চে নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ করেছেন ঢাকা-১৩ আসনের ৯ প্রার্থী। ইশতেহারে এই নির্বাচনী এলাকার মাদক, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি বন্ধ এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নসহ নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রার্থীরা।
আজ বুধবার সকালে মোহাম্মদপুরের সূচনা কমিউনিটি সেন্টারে এই নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ করেন তাঁরা। একই সঙ্গে অনুষ্ঠানে সব প্রার্থী নির্বাচনের আচরণবিধি মেনে চলার শপথ পাঠ করেন।
ঢাকা-১৩ আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন।
ঢাকা অঞ্চলের অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা এ এইচ এম কামরুল হাসান অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন। ঢাকা-১৩ আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. ইউনুচ আলীর সভাপতিত্বে ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. সাদিকুর রহমান, বছিলা আর্মি ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার মেজর কাজী সাদীর আসাফ, র্যাব-২–এর কোম্পানি কমান্ডার মেজর মো. কবির, ঢাকা মহানগর পুলিশের মোহাম্মদপুর বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার জুয়েল রানা বক্তব্য দেন।
এর আগে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ববি হাজ্জাজ, ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক, বাসদ মনোনীত প্রার্থী খালেকুজ্জামান, গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মিজানুর রহমান, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের প্রার্থী শাহরিয়ার ইফতেখার, ইনসানিয়াত বিপ্লবের প্রার্থী ফাতেমা আক্তার মুনিয়া, বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টির প্রার্থী মো. শাহাবুদ্দিন, স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ মো. রবিউল ইসলাম ও আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী সোহেল রানা একে একে তাঁদের ইশতেহার পাঠ করে শোনান।
প্রার্থীরা ঢাকা-১৩ আসনের (মোহাম্মদপুর, আদাবর ও শেরেবাংলা নগরের আংশিক) জনগণের জীবনমান উন্নয়নের জন্য নানা প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেন।
ইশতেহারে তাঁরা বলেছেন, নির্বাচিত হলে এই নির্বাচনী এলাকার কিশোর গ্যাং, মাদক, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে তাঁরা জিরাও টলারেন্স নীতি গ্রহণ করবেন। যানজট নিরসন, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, নিরাপদ পানি ও দখলমুক্ত পরিবেশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে কাজ করবেন।
ইশতেহারে ৯ দফা প্রতিশ্রুতির ঘোষণা দিয়েছেন ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের প্রার্থী ববি হাজ্জাজ। ‘দিনবদলের এখনই সময়’ শিরোনামে এসব প্রতিশ্রুতির মধ্যে—কিশোর গ্যাং, মাদক, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নেওয়া; বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি নিয়ে ভোগান্তি দূর; নারীদের নিরাপত্তার উদ্যোগ, রাস্তা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন; ২৪/৭ ফোন ও ফিজিক্যাল হেল্প ডেস্কের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করার কথা বলা হয়েছে।
ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘এই এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তাহীনতা ও নাগরিক ভোগান্তির শিকার। এই ইশতেহার প্রতিশ্রুতি নয়, একটি বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা। লক্ষ্য একটাই, নিরাপদ, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক ঢাকা-১৩ গড়ে তোলা।’
আর ঢাকা-১৩ আসনের জন্য ১৩টি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ‘রিকশা’ প্রতীকের প্রার্থী মাওলানা মামুনুল হক। এর মধ্যে ভূমি, ট্রেড লাইসেন্স, জন্ম নিবন্ধনসহ সব সেবায় ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু; সন্ত্রাস, মাদক নির্মূল ও কিশোর গ্যাং সংশোধন; গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ সংকটের টেকসই সমাধান; ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক সম্প্রীতি; নারীর অধিকার ও শিশুর বিকাশ; শহীদ ও বীরদের সম্মান এবং জবাবদিহির রাজনীতি প্রতিষ্ঠা অন্যতম।
মামুনুল হক বলেন, ‘ইশতেহারে প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি জবাবদিহিমূলক, পরামর্শমূলক রাজনীতির জন্য চলমান রাজনীতির দুটি অশুভ ধারা লুটপাট ও দুর্নীতি এবং সন্ত্রাস ও পেশিশক্তির বলয় থেকে রাজনীতিকে মুক্ত করেই ছাড়ব।’
জলাবদ্ধতা, স্মার্ট স্বাস্থ্যসেবা, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা সহায়তা তহবিল গঠন, খেলার মাঠ পুনরুদ্ধার করার প্রতিশ্রুতি দেন স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ মো. রবিউল ইসলাম। ইশতেহার পাঠ শেষে তিনি বলেন, ‘একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান হাদির প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। একই সঙ্গে সবার কাছে হাদি হত্যার বিচার চাচ্ছি। যেই প্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন, সংসদে গিয়ে হাদি হত্যার বিচার চাইবেন।’
ইশতেহার নয়, নির্বাচিত হলে দুটি কাজ করার ঘোষণা দেন আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী সোহেল রানা। তিনি বলেন,‘জনগণ আমাকে নির্বাচিত করলে প্রথম কাজ হবে, রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে এই এলাকার ১০ হাজার পথভ্রষ্ট তরুণ ও কিশোরদের চিহ্নিত করে আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থান তৈরি করা। আর দ্বিতীয় কাজ হবে, উন্নয়নকাজের জন্য বরাদ্দ হওয়া অর্থের সঠিক ব্যবহার করা। এই দুটি কাজ করতে পারলে সমস্যা অর্ধেক সমাধান হয়ে যাবে।
ইশতেহার পাঠ শেষে রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. ইউনুচ আলী প্রার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘সবাই এই এলাকার জনগণের জন্য নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এখন পর্যন্ত সব প্রার্থী এই আসনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সহযোগিতা করছেন। আগামী দিনেও পরিশুদ্ধ মন নিয়ে এভাবে সহযোগিতা করে যাবেন। আমরা একটা সুষ্ঠু, সুন্দর ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিতে চাই। সবাইকে সহযোগিতা করার অনুরোধ জানাচ্ছি। নির্বাচনে যিনি বিজয়ী হবেন, তিনি সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এলাকার উন্নয়নে কাজ করবেন, সেই প্রত্যাশা রাখছি।’
বছিলা আর্মি ক্যাম্পের কমান্ডার মেজর কাজী সাদীর আসাফ বলেন, ‘এই এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সেনাবাহিনী কাজ করছে। এই আসনের জন্য দুটি সেনাক্যাম্প করা হয়েছে। আমরা সহযোগিতার জন্য প্রস্তুত রয়েছি। সবাই ভোট দিতে আসবেন। নিরাপদে ভোট প্রদান করবেন। এটাই আমাদের অঙ্গীকার।’
র্যাব-২–এর কোম্পানি কমান্ডার মেজর মো. কবির বলেন, ‘জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সুষ্ঠু নির্বাচন আমরা উপহার দিতে চাই। আপনারা সবাই সহযোগিতা করবেন।’
জুয়েল রানা বলেন, ‘সব প্রার্থী আচরণবিধি মেনে প্রচার চালাবেন। আমরা আপনাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করব। নির্বাচনের মাধ্যমে একজন সংসদ সদস্য হবেন, কিন্তু জিতে যাব আমরা সবাই।’