সংবাদপত্রের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। আজ রোববার সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে
সংবাদপত্রের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। আজ রোববার সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে

বিশেষ কমিটির মতবিনিময়

বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে সংবিধান সংশোধনের পরামর্শ সম্পাদকদের

সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকেরা।

আজ রোববার সংবিধান সংশোধন–সম্পর্কিত জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি মতবিনিময় করে সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে। সেখানেই এ পরামর্শ এসেছে। জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।

সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের পরামর্শের জবাবে কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাঁরা এই পরামর্শের সঙ্গে একমত। বিরোধী দলকে কমিটিতে যোগ দেওয়ার জন্য বারবার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিরোধী দল যখনই কমিটিতে আসবে, তখনই তাদের স্বাগত জানানো হবে।

পরে কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের মতবিনিময় সম্পর্কে জানান। তিনি বলেন, আগামী জানুয়ারিতে বছরের প্রথম অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন বিল সংসদে আসবে বলে তাঁরা আশা করছেন। বিল পাস হওয়ার পর কিছু সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুসারে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে গণভোট দেওয়ার প্রয়োজন হবে।

মতবিনিময়ে অংশ নেন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী, বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, সাবেক গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ, প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ, দেশ রূপান্তর সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি, নিউ নেশন সম্পাদক মোকাররম হোসেন, ডেইলি ওয়াদা সম্পাদক শফিকুল আলম, কালবেলা সম্পাদক শন্তোষ শর্মা, মানবকণ্ঠ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম, প্রতিদিনের বাংলাদেশ সম্পাদক মারুফ কামাল খান, বাংলাভিশনের প্রধান সম্পাদক আব্দুল হাই ছিদ্দিক, নয়া দিগন্ত–এর নির্বাহী সম্পাদক মাসুমুর রহমান খলিলি, আমার দেশ–এর যুগ্ম সম্পাদক এম আব্দুল্লাহ, বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড–এর নির্বাহী সম্পাদক শাখাওয়াত লিটন প্রমুখ।

যেসব পরামর্শ এসেছে

আজকের মতবিনিময় সভাটি ছিল রুদ্ধদ্বার। সভায় উপস্থিত ছিলেন, এমন একাধিক সূত্র জানায়, সম্পাদক ও সাংবাদিকেরা বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের মতামত ও পরামর্শ দেন। সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ও ঐকমত্য নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন অনেকে। তাঁরা বলেছেন, বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দল নেই। সবাই মিলে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া নিলে সেটাই ভালো হবে। অন্যথায় অতীতের মতো সংকট রয়ে যেতে পারে।

সভা সূত্র আরও জানায়, অতীতের মতো এই আলোচনা শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ারও পরামর্শ এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনার আলোচনা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানো, গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকারের একক নিয়ন্ত্রণের বাইরে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগের ব্যবস্থা করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।

প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান যাতে এক ব্যক্তি না হতে পারেন, সে বিধান করারও পরামর্শ এসেছে। কেউ কেউ বলেছেন, সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার মানসিকতার ফল অতীতে ভালো হয়নি, সামনেও ভালো হতে পারে না।

ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব৵বস্থা ও এর কাঠামো ঠিক করার পরামর্শ দিয়েছেন অনেক সম্পাদক ও সাম্পাদিকেরা। বৈঠক সূত্র বলছে, রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান না করা, বিচার বিভাগকে এই প্রক্রিয়ার বাইরে রাখারও পরামর্শ এসেছে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের প্রয়োজনীয়তা আছে কি না, এ প্রশ্নও কেউ কেউ তুলেছেন। এটি করতে হলে এমনভাবে করতে হবে, যাতে উচ্চকক্ষে শুধু নিম্নকক্ষের আসনসংখ্যার অনুপাতে প্রতিনিধিত্ব চালু না করা হয়। মোটকথা, ভিন্নমত ও বিরোধী দলের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব রাখার কথা এসেছে।

সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে বিশেষ কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিশিষ্ট সাংবাদিকেরা কমিটিকে বিভিন্ন মতামত ও পরামর্শ দিযেছেন। অনেকে পরবর্তী সময়ে লিখিত আকারে তাঁদের প্রস্তাবগুলো পাঠাবেন বলেও জানিয়েছেন।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সম্পাদকদের মধ্যে অনেকেই প্রস্তাব দিয়েছেন যেন বিরোধী দলকে বিশেষ কমিটিতে অংশগ্রহণ করানোর জন্য আহ্বান জানানো হয়। কমিটিও এ বিষয়ে একমত। বিরোধী দল কমিটিতে এসে বক্তব্য দিলে সবার মতামতের ভিত্তিতে তা গ্রহণ করা বা ধারণ করা যেত।

আরেক প্রশ্নের জবাবে বিশেষ কমিটিপ্রধান বলেন, তাঁরা সংবিধান সংশোধনের কাজটি ঐকবদ্ধভাবে করতে চান। বিরোধী দলের প্রতি তাঁদের আহ্বান থাকবে অবিরাম।

গণভোট প্রসঙ্গ

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৈঠকে একজন সাংবাদিক জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অনুষ্ঠিত গণভোট প্রসঙ্গে জানতে চান। জবাবে কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, গণভোটের অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তরিত হয়নি। তবে তাঁরা গণভোটকে ধারণ করেন, জুলাই সনদকে ধারণ করেন। সংবিধান সংশোধনী বিল পাস হওয়ার পর কিছু বিষয়ে আবার গণভোট দেওয়ার প্রয়োজন হবে।

এ বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে গণভোটের বিষয় ছিল। আওয়ামী লীগ পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তা উঠিয়ে দেয়। অভ্যুত্থানের পর উচ্চ আদালত ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনর্বহালের আদেশ দিয়েছেন। এটা সংবিধানে আসবে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধানের প্রস্তাবনা, ৪৮ ও ৫৬ অনুচ্ছেদসহ কিছু জায়গায় কোনো পরিবর্তন আনতে চাইলে গণভোটে দিতে হবে। সংসদে বিল পাস হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি সই করার আগে সেটা গণভোটে দিতে হবে।

অবশ্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পুরো সংশোধনীর ওপর গণভোটের প্রয়োজন হবে না। এবার প্রস্তাবনাসহ কিছু জায়গায় পরিবর্তন আসবে। তাই এটা গণভোটে যাওয়ার কথা।

সভায় বিএফইউজের সাবেক মহাসচিব আব্দুল আজিজ, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান, বাংলাদেশ পার্লামেন্ট জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হারুন জামিল ও সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী খান, ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সাবেক সভাপতি খাজা মাইন উদ্দিন ও বর্তমান সভাপতি দৌলত আকতার মালা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

বিশেষ কমিটির সদস্যদের মধ্যে নূরুল ইসলাম মনি, জয়নুল আবেদীন, জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমীন, সাকিলা ফারজানা ও মাহমুদুল হক উপস্থিত ছিলেন।