হোসেন জিল্লুর রহমান
হোসেন জিল্লুর রহমান

অভিমত

খালেদা জিয়ার প্রতি এই আবেগ শুধু মৃত্যুজনিত শোক নয়

বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে দেশজুড়ে যে গভীর শোক ও অভূতপূর্ব আবেগ প্রকাশ পাচ্ছে, আমিও তার শরিক। জানাজায়, মানুষের চোখে-মুখে, সামাজিক পরিসরে যে অনুভূতির বিস্তার দেখা যাচ্ছে, তা নিছক একটি মৃত্যুজনিত শোক নয়। এটি একই সঙ্গে একটি সময়ের সমাপ্তি, একটি রাজনৈতিক জীবনের সমগ্র মূল্যায়নের প্রতি আবেগও বটে। আমার মনে হয়, এই মুহূর্তে আবেগের সঙ্গে সঙ্গে তার একটি সার্বিক ও সংযত মূল্যায়ন করাও যথার্থ দায়িত্ব।

এই অভূতপূর্ব আবেগের একটি বড় কারণ নিঃসন্দেহে তাঁর চলে যাওয়া। তবে এর পাশাপাশি একটি সামগ্রিক মূল্যায়নও মানুষের মনে কাজ করছে। বেগম খালেদা জিয়া যে ভূমিকায় শেষ পর্যন্ত আবির্ভূত হয়েছিলেন, সেটির জন্য তিনি প্রথাগত কোনো প্রস্তুতি নিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেননি। তাঁর তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা রাজনৈতিক শিক্ষা ছিল না, সরাসরি জনপরিষদে সক্রিয় রাজনীতির মধ্য দিয়ে তাঁর উত্থানও হয়নি। জনপরিসরে তাঁর প্রবেশ অনেকাংশেই দায়িত্বের উত্তরাধিকার সূত্রে; কিন্তু এই বাস্তবতাই একমাত্র সত্য নয়।

বেগম খালেদা জিয়া সে রকম ছিলেন না। তিনি ছিলেন জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী। ১৯৭১ সালের অন্তরীণ জীবনের কষ্ট তিনি নিজে ভোগ করেছেন। স্বাধীনতাযুদ্ধের পুরো প্রেক্ষাপট তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। ১৯৭৫ সালের অস্থিরতা, ৭ নভেম্বরের অনিশ্চিত সময়, রাষ্ট্র কোন দিকে যাবে, সেই অনিশ্চয়তা—এ সবকিছু তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন।

অনেক সময় তাঁকে গৃহবধূ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু গৃহবধূ শব্দটি তাঁর ক্ষেত্রে যথাযথ নয়। গৃহবধূ বলতে আমরা সাধারণত এমন একজনকে বুঝি, যাঁর কোনো ধরনের জনসম্পৃক্ততা নেই। বেগম খালেদা জিয়া সে রকম ছিলেন না। তিনি ছিলেন জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী। ১৯৭১ সালের অন্তরীণ জীবনের কষ্ট তিনি নিজে ভোগ করেছেন। স্বাধীনতাযুদ্ধের পুরো প্রেক্ষাপট তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। ১৯৭৫ সালের অস্থিরতা, ৭ নভেম্বরের অনিশ্চিত সময়, রাষ্ট্র কোন দিকে যাবে, সেই অনিশ্চয়তা—এ সবকিছু তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়ার মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর তিনি বিধবা হন। এই সব অভিজ্ঞতা তাঁকে রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ করে দেয়।

তার পরও বলতে হয়, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের জায়গায় খালেদা জিয়ার উঠে আসা কোনো সহজ পথ ছিল না, কোনো মসৃণ পথ ছিল না। কেউ তাঁকে ডেকে এনে ক্ষমতায় বসিয়ে দেয়নি; বরং সামরিক শাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রশ্নে তাঁর আপসহীন অবস্থানই তাঁকে প্রথমে রাজনৈতিক এবং পরে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে নিয়ে আসে। এটি ছিল তাঁর নিজস্ব অর্জন। দায়িত্বের উত্তরাধিকার দিয়ে শুরু হলেও সেই দায়িত্বকে জনপরিসরে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত সক্ষমতারই প্রমাণ।

বেগম খালেদা জিয়াকে সার্বিক মূল্যায়নের একটি দিক হলো তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক প্রস্তুতি ছাড়াই তিনি নিজেকে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। এটিকে নিঃসন্দেহে তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। এ কারণেই জনমানুষের চিন্তায় তাঁর একটি জোরালো অবস্থান তৈরি হয়েছিল।

আরেকটি দিক হচ্ছে, তাঁর জীবনের দীর্ঘ সময়জুড়ে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ছিল। ১৯৭১ সালের অন্তরীণ জীবন, স্বামীর হত্যাকাণ্ড, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে জেল-জুলুম এবং সর্বশেষ দেড় দশকে তাঁর ওপর নেমে আসা অন্যায় কষ্ট মানুষের মনে গভীর সহানুভূতি তৈরি করেছে। আমাদের সমাজে অন্যায়ভাবে কষ্ট পাওয়া মানুষের প্রতি সহমর্মিতা একটি স্বাভাবিক প্রবণতা। বেগম খালেদা জিয়া সেই সহমর্মিতা পেয়েছেন; কারণ, তাঁর ওপর চাপিয়ে দেওয়া কষ্ট অনেকের কাছেই অন্যায় বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

তার পরও বলতে হয়, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের জায়গায় খালেদা জিয়ার উঠে আসা কোনো সহজ পথ ছিল না, কোনো মসৃণ পথ ছিল না। কেউ তাঁকে ডেকে এনে ক্ষমতায় বসিয়ে দেয়নি; বরং সামরিক শাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রশ্নে তাঁর আপসহীন অবস্থানই তাঁকে প্রথমে রাজনৈতিক এবং পরে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে নিয়ে আসে। এটি ছিল তাঁর নিজস্ব অর্জন।

রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে খালেদা জিয়াকে মূল্যায়নে আমি তিনটি বিষয়কে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে চাই। প্রথমত, আধিপত্যবাদবিরোধী মনোভাব। বিশেষ করে আঞ্চলিক আধিপত্যবাদ প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট, দৃঢ় ও ধারাবাহিক। এটি কোনো কৌশলগত লোভ বা সুবিধাবাদী অবস্থান ছিল না; বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্বার্থের প্রশ্নে তিনি এই অবস্থানকে জনসমক্ষে সততার সঙ্গে তুলে ধরতে পেরেছিলেন। এই ধারাবাহিকতা তাঁর রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।

দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রশ্নে তাঁর ভূমিকা। বাংলাদেশের ব্যক্তি খাত ও বাজার অর্থনীতির বিকাশ সত্তর ও আশির দশকে শুরু হলেও প্রকৃত গতি পায় নব্বইয়ের দশকের প্রথমার্ধে, তাঁর শাসনামলেই। বেসরকারি ব্যাংকিং, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ব্যক্তি খাতের বিকাশের যে ভিত্তি তৈরি হয়, তা মূলত তাঁর সময়েই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। তবে এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি কখনো একক কৃতিত্ব দাবি করেননি। তিনি নিজেকে জনসমক্ষে বিশেষজ্ঞ হিসেবে তুলে ধরেননি; বরং পরামর্শভিত্তিক, সমবেত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দিয়েছেন। সাইফুর রহমানের মতো অর্থমন্ত্রীদের তিনি সম্মান ও গুরুত্ব দিয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা যে একক ও অতিরিক্ত কর্তৃত্ববাদী সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা দেখছি, তার বিপরীতে তাঁর সময়ের এই কলিজিয়াল ডিসিশন মেকিং বা সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়া ছিল একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।

তৃতীয়ত, নারীর ক্ষমতায়নের প্রশ্নে তাঁর অবদান। সম্ভবত নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি এই বিষয়ে সংবেদনশীল ছিলেন। নব্বইয়ের দশকের প্রথমার্ধে মেয়েদের শিক্ষা বিস্তারে গার্লস স্টাইপেন্ড কর্মসূচি, ফুড ফর এডুকেশন এবং শর্তসাপেক্ষ নগদ সহায়তার মতো উদ্যোগ নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে। পরবর্তী সময়ে বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এসব কর্মসূচিকে উদ্ভাবনী সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

আরেকটি দিক হচ্ছে, তাঁর জীবনের দীর্ঘ সময়জুড়ে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ছিল। ১৯৭১ সালের অন্তরীণ জীবন, স্বামীর হত্যাকাণ্ড, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে জেল-জুলুম এবং সর্বশেষ দেড় দশকে তাঁর ওপর নেমে আসা অন্যায় কষ্ট মানুষের মনে গভীর সহানুভূতি তৈরি করেছে। আমাদের সমাজে অন্যায়ভাবে কষ্ট পাওয়া মানুষের প্রতি সহমর্মিতা একটি স্বাভাবিক প্রবণতা।

রাজনৈতিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও খালেদা জিয়ার একটি স্বতন্ত্র অবদান রয়েছে। অসংখ্য কষ্ট, উসকানি ও চাপের মধ্যেও তিনি সাধারণত স্বল্পভাষী ছিলেন। কটূক্তি ও ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে নিজেকে সচেতনভাবে দূরে রেখেছেন। গ্রেস আন্ডার প্রেশার, অর্থাৎ চরম চাপের মধ্যেও সংযত ও মার্জিত থাকা, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিরল। এই বৈশিষ্ট্য তিনি রেখে গেছেন।

বেগম খালেদা জিয়া তাঁর দল বিএনপিকে নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কাঠামোর মাধ্যমে সংহত অবস্থায় রেখে যাচ্ছেন। কিন্তু তাঁর মূল্যায়ন কেবল দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে করলে তা অসম্পূর্ণ হবে। তাঁর রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের নিজস্ব অর্জন, তাঁর নৈতিক অবস্থান, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে তাঁর সংযত আচরণ—এগুলো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য শিক্ষণীয়। তাঁর প্রয়াণের পর আমাদের উচিত, আবেগের পাশাপাশি এই সার্বিক মূল্যায়নের দিকেও দৃষ্টি দেওয়া এবং সেখান থেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণ করা।

# হোসেন জিল্লুর রহমান: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা