মৌলিক সংস্কার আলোচনার শুরু থেকেই ছিল মতভেদ

রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্ষমতার ভারসাম্য ফেরানোর আলোচনা যত এগিয়েছে, ততই সামনে এসেছে বড় দলগুলোর ভিন্ন হিসাব। বাস্তবে কোন প্রস্তাব, কোন আপত্তি আর কোন রাজনৈতিক দর-কষাকষির ভেতর দিয়ে এগোল—তা নিয়ে দুই পর্বের আয়োজন। আজ পড়ুন প্রথম পর্ব

জাতীয় সংসদের এলডি হলের সেই রুদ্ধদ্বার বৈঠকের দিনটি এখনো মনে আছে। বৈঠক চলছিল, বিরতিতে যে কয়জনের সঙ্গে কথা হচ্ছিল, তাতে বোঝা যাচ্ছিল—আলোচনা সহজ পথে এগোচ্ছে না।

২০২৫ সালের ১৭ এপ্রিল, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বিএনপির প্রথম বৈঠকের দিন মধ্যাহ্নবিরতিতে একটি সূত্র জানাল, আলোচনা খুব একটা উষ্ণ হচ্ছে না। বিএনপি সংস্কার বিষয়ক মৌলিক প্রশ্নগুলোতে শক্ত অবস্থানে আছে। বৈঠক শেষে ঐকমত্য কমিশনের সদস্যদের কারও কারও ব্যক্তিগত মন্তব্যেও হতাশা ছিল।

বোঝা যাচ্ছিল, গণ-অভ্যুত্থানের পর যে ‘সংস্কার’ শব্দটি জাতীয় আকাঙ্ক্ষার ভাষা হয়ে উঠেছিল, সেটা ক্রমেই রাজনৈতিক লড়াইয়ে রূপ নিচ্ছে। লড়াইটা মূলত রাষ্ট্রের ভেতরে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে। প্রধানমন্ত্রী কতটা ক্ষমতা ধরে রাখবেন, রাষ্ট্রপতি কতটা স্বাধীন হবেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ কাদের হাতে থাকবে, সংসদ কি কেবল আনুষ্ঠানিক অনুমোদনদাতা থাকবে, নাকি সত্যিকার জবাবদিহির জায়গা হয়ে উঠবে, সংবিধান সংশোধন ভবিষ্যতে কতটা কঠিন হবে—এসব প্রশ্ন ঘিরে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত সংস্কার-আলোচনার গতিপথ নির্ধারণ করেছে।

আমি শুরু থেকে সংবিধান সংস্কার কমিশন ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের কাজ, পরে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনা কাভার করেছিলাম। এখন ফিরে তাকালে মনে হয়, পুরো প্রক্রিয়া ছিল একই সঙ্গে আশাব্যঞ্জক এবং জটিল। এটা ছিল রাষ্ট্রক্ষমতার কাঠামো নতুন করে ভারসাম্যের প্রশ্নে এক দীর্ঘ দর-কষাকষি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কার। শুধু সরকার বদল নয়, বরং কেমন রাষ্ট্রব্যবস্থা এই পরিবর্তনের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসবে—এই প্রশ্নও তখন সামনে আসে।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাসের মাথায় ২০২৪ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে তারা রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন বা সংস্কার আনার জন্য ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কমিশন গঠন করে। সেগুলো হলো: সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশন।

পরে এসব কমিশনের প্রস্তাবের ভিত্তিতে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির জন্য গঠন করা হয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। দীর্ঘ আট মাস আলোচনার পর কমিশন ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ তৈরি করে। আমি শুরু থেকে সংবিধান সংস্কার কমিশন ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের কাজ, পরে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনা কাভার করেছিলাম। এখন ফিরে তাকালে মনে হয়, পুরো প্রক্রিয়া ছিল একই সঙ্গে আশাব্যঞ্জক এবং জটিল। এটা ছিল রাষ্ট্রক্ষমতার কাঠামো নতুন করে ভারসাম্যের প্রশ্নে এক দীর্ঘ দর-কষাকষি।

শুরু থেকেই নির্বাহী বিভাগ তথা প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমবে—এমন কিছু প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়ে নিজেদের যুক্তি তুলে ধরেছিল বিএনপির প্রতিনিধিদল।

শুরুটা ছিল কাঠামোগত সমস্যার স্বীকৃতি দিয়ে

প্রথম পর্যায়ে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন করা ওই ছয়টি কমিশন নিজ নিজ ক্ষেত্রে সংস্কার আনার লক্ষ্যে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ বা প্রস্তাব তৈরি করে। বিশেষজ্ঞ, পেশাজীবী, অংশীজন, নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে আলোচনা করে এসব প্রস্তাব তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকেও লিখিত মতামত নেওয়া হয়। সংবিধান সংস্কার ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মাধ্যমে বড় আকারে জাতীয় জনমত জরিপও চালিয়েছিল। ২০২৫ সালের ৩১ জানুয়ারি কমিশনগুলো তাদের প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেয়।

এর মধ্যে রাষ্ট্রক্ষমতায় ভারসাম্য আনার প্রস্তাবগুলো ছিল প্রধানত সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘কার্যকর ভারসাম্যের অনুপস্থিতি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার জন্য একটি গুরুতর হুমকি। ক্ষমতার ব্যাপক কেন্দ্রীকরণ প্রধানমন্ত্রীকে স্বৈরশাসকে পরিণত করেছে। সাংবিধানিক সংস্কারের অন্যতম উদ্দেশ্য—ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার উত্থান রোধ এবং রাষ্ট্রক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকেন্দ্রীকরণ, পর্যাপ্ত ক্ষমতায়ন।’

এসব উদ্দেশ্য পূরণে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমানো এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনার প্রস্তাব করেছিল কমিশন। এ জন্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ পদ্ধতি বদলানো, কিছু নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে স্বাধীন ক্ষমতা দেওয়া, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, একই ব্যক্তি যাতে দীর্ঘদিন প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে না পারেন এবং একই সঙ্গে একাধিক পদে থাকতে না পারেন, সে ধরনের বিধান করার প্রস্তাব করা হয়।

শেষ দিনের আলোচনায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। ২০২৫ সালের ৮ অক্টোবর রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে

এসব প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য ছিল সাংবিধানিক সংস্কারগুলো টেকসই করা। এ জন্য সংবিধান সংশোধন পদ্ধতি কঠিন করার প্রস্তাব ছিল; যাতে কোনো দল ক্ষমতায় গিয়ে চাইলেই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংবিধান বদলে ফেলতে না পারে। সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে আইনসভার উচ্চকক্ষ গঠন এবং সংবিধান সংশোধন বিল উচ্চকক্ষেও অনুমোদনের বাধ্যবাধকতার প্রস্তাবও এ লক্ষ্যে করা হয়েছিল বলে কমিশনের সদস্যদের সঙ্গে নানা আলাপে জানা যায়।

সংস্কার কমিশনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়। নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা অতিরিক্ত সীমিত করা হলে সরকার ঠিকমতো কাজ করতে পারবে কি না, সে প্রশ্নও আলোচনায় আসে।

শুরু থেকেই নির্বাহী বিভাগ তথা প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমবে—এমন কিছু প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়ে নিজেদের যুক্তি তুলে ধরেছিল বিএনপির প্রতিনিধিদল।

সংস্কার কমিশনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়। নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা অতিরিক্ত সীমিত করা হলে সরকার ঠিকমতো কাজ করতে পারবে কি না, সে প্রশ্নও আলোচনায় আসে।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠক। ফরেন সার্ভিস একাডেমি

জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন ও কার্যক্রম

সংস্কার কমিশনগুলোর প্রস্তাবগুলো নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির লক্ষ্যে ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠন করা হয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। ১৫ ফেব্রুয়ারি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে একটি বৈঠকের মাধ্যমে কমিশন যাত্রা শুরু করে।

এরপর ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ছয়টি সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঠানো হয়। অন্যদিকে সংস্কার প্রস্তাবগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করে ঐকমত্য কমিশন। এর মধ্যে পুলিশ সংস্কার কমিশন বাদে বাকি পাঁচটি কমিশনের ১৬৬টি সুপারিশকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এগুলোকে ছক আকারে সাজিয়ে মতামত দেওয়ার জন্য ৩৭টি দলের কাছে পাঠানো হয়। এর মধ্যে সংবিধান সংস্কারবিষয়ক ৭০টি, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কারবিষয়ক ২৭টি, বিচার সংস্কারবিষয়ক ২৩টি, জনপ্রশাসন সংস্কারবিষয়ক ২৬টি ও দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কারবিষয়ক ২০টি সুপারিশ ছিল। ৩৩টি দল এসব বিষয়ে তাদের মতামত দিয়েছিল।

এর মধ্যে বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগে জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) গঠন; উচ্চকক্ষের গঠনপ্রক্রিয়া ও ক্ষমতা; প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদ সীমিত করা (এক ব্যক্তি জীবনে সর্বোচ্চ দুবার প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন); একই ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা ও দলীয় প্রধান হতে পারবেন না—এ রকম বেশ কিছু প্রস্তাবে ভিন্নমত জানায় বিএনপি।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী এ ধরনের প্রস্তাবগুলোর নীতিগত সমর্থন করেছিল। পাশাপাশি তারা নিম্নকক্ষ তথা সংসদ নির্বাচনও আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে (পিআর) করার প্রস্তাব দেয়। তাদের এই প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেক আলোচনা হলেও ঐকমত্য কমিশনে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনায় আসেনি।

সংস্কার প্রস্তাবগুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দুই দফায় দীর্ঘ আলোচনা করে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ তৈরি করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এ কমিশনের পক্ষে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার নেতৃত্ব দেন কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। এ সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া কী হবে—সেটা নিয়ে তৃতীয় দফায় আবারও আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক দীর্ঘ আলোচনা হয় ৩০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে। বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া নির্ধারণে একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সঙ্গেও দফায় দফায় আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করে ঐকমত্য কমিশন।

অবশ্য কিছু মৌলিক কাঠামোগত সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে শুরু থেকেই বিএনপি আপত্তি জানিয়ে আসছিল।

কোনো বিষয়ে অধিকাংশ দল একমত হলো, কিন্তু বিএনপি একমত হলো না, সে ক্ষেত্রে সুপারিশ বাস্তবায়ন সম্ভব হবে বলে মনে করেন কি না; এমন একটি প্রশ্নের জবাবে আলী রীয়াজ বলেছিলেন, সংখ্যাই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়; কিন্তু সংখ্যা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দুটো বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এক জায়গায় এসে জাতীয় সনদ তৈরি করতে হবে।

ঐকমত্যের ভিত্তি কী

গত বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকে বলেছিলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে সুপারিশগুলো নিয়ে এসেছি। চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই। আমরা শুধু বোঝাব কেন সংস্কার প্রয়োজন এবং কীভাবে সংস্কার করা যায়। বাকিটা আপনাদের কাজ।’

একটি বিষয়ে আমার খুব কৌতূহল ছিল—কোনো বিষয়ে ঐকমত্য গঠনের ভিত্তি বা কাঠামোটা কী হবে। এটা নিয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে কমিশনের কোনো কোনো সদস্যের মত জেনেছিলাম। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য আসে ১০ মার্চ (২০২৫)। সেদিন এলডি হলে সংবাদ সম্মেলন করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ঘোষণা দেয়, সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দ্রুত আলোচনা শুরু করা এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে ঐকমত্যে পৌঁছে একটি ‘জাতীয় সনদ’ তৈরি করতে চায় কমিশন।

সংবাদ সম্মেলনে আমি জানতে চাইলাম, কোনো সুপারিশের বিষয়ে কটি দল একমত হলে জাতীয় ঐকমত্য হয়েছে বলে ধরা হবে, এমন কোনো কিছু নির্ধারণ করা হয়েছে কি না?

জবাবে ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছিলেন, এখানে শুধু সংখ্যা বিবেচ্য বিষয় নয়। তাঁরা অবশ্যই অধিকাংশ দলের মতকে প্রাধান্য দেবেন। কিন্তু সংখ্যার বিবেচনা যেমন আছে, তেমনি এটাও বিবেচনা করতে হবে যে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান এবং শক্তির প্রভাব সমাজে আছে। তবে কমিশন পূর্বনির্ধারিত কোনো ধারণা থেকে অগ্রসর হচ্ছে না। শুধু টিক চিহ্নের ওপরও তাঁরা নির্ভর করছেন না, আলোচনার মাধ্যমে অনেক বিষয়ে একমত হওয়া যাবে বলে তাঁরা আশা করছেন। সে ক্ষেত্রে সংখ্যা এবং গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলগুলোকে একমতে আনতে পারলে সেটাই হবে গ্রহণযোগ্যতার বিষয়।

কোনো বিষয়ে অধিকাংশ দল একমত হলো, কিন্তু বিএনপি একমত হলো না, সে ক্ষেত্রে সুপারিশ বাস্তবায়ন সম্ভব হবে বলে মনে করেন কি না; এমন একটি প্রশ্নের জবাবে আলী রীয়াজ বলেছিলেন, সংখ্যাই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়; কিন্তু সংখ্যা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দুটো বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এক জায়গায় এসে জাতীয় সনদ তৈরি করতে হবে।

বিএনপির সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনা। জাতীয় সংসদের এলডি হলে

রুদ্ধদ্বার বৈঠক, যে আভাস মিলছিল

স্প্রেড শিটে বা ছকে মতামত নেওয়ার পাশাপাশি প্রথম ধাপে ২০২৫ সালের ২০ মার্চ থেকে ১৯ মে পর্যন্ত ৩২টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এ বৈঠকগুলো হয়েছিল জাতীয় সংসদের এলডি হলে।

প্রথম পর্বে প্রতিটি দলের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করে কমিশন। বৈঠকগুলো ছিল রুদ্ধদ্বার। বৈঠক শেষে ব্রিফিং এবং বৈঠকের সূত্র থেকে তখন আমরা বিভিন্ন বিষয়ে দলগুলোর অবস্থান জেনেছি। মোট ৪৪টি বৈঠক হয়। এর মধ্যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দলের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছিল।

প্রথম পর্বে বিএনপির সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের প্রথম বৈঠকটি হয়েছিল গত বছরের ১৭ এপ্রিল (২০২৫)। ওই বৈঠকের মধ্যাহ্নবিরতিতে একটি সূত্র থেকে জানতে পারলাম, আলোচনার পরিবেশ খুব একটা উষ্ণ ছিল না। বিএনপি নিজের অবস্থানে অনড় ছিল। বৈঠক শেষে কমিশনের সদস্যদের কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে হতাশার কথাও বলেছিলেন।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে এক বৈঠকের মধ্যে সাংবাদিকদের মুখোমুখি জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। জাতীয় সংসদের এলডি হলে

সেদিনের বৈঠক শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘মৌলিক বিষয়গুলোতে আমরা আমাদের অনড় অবস্থান প্রকাশ করেছি। তবে কিছু কিছু বিষয়ে কমিশনের পরামর্শ গ্রহণ করা যায় কি না, আমরা দলীয় ফোরামে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব।’

এরপর ২০ এপ্রিল আবার বৈঠক হয়েছিল বিএনপির সঙ্গে। সেখানেও বিএনপি মৌলিক বিষয়গুলোতে আগের অবস্থানে ছিল। তবে সেদিন বৈঠক শেষে দুটি সূত্র থেকে জানতে পারি—এক ব্যক্তি জীবনে কতবার প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন, তা নিয়ে একটি নতুন প্রস্তাব আলোচনায় এসেছে। সেটা হলো এক ব্যক্তি টানা দুবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। একবার বিরতি দিয়ে তৃতীয়বার আবার হতে পারবেন। এটি নিয়ে পরদিন প্রথম আলোয় প্রধান প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল।

প্রথম ধাপের আলোচনা শেষে কমিশন মোট ২০টি বিষয়কে মৌলিক সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাব হিসেবে চিহ্নিত করে; যেগুলো নিয়ে দলগুলোর মধ্যে মতভিন্নতা ছিল। এগুলো নিয়ে দ্বিতীয় পর্বে সব কটি দলকে একসঙ্গে নিয়ে আলোচনার সিদ্ধান্ত হয়।

দ্বিতীয় পর্বের আলোচনা, মৌলিক সংস্কার ও ভিন্নমত

দ্বিতীয় পর্বের আলোচনা হয়েছিল ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে। ৩০টি দলের সঙ্গে ৩ জুন থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত ২৩টি বৈঠক করে ঐকমত্য কমিশন। এ পর্বের বৈঠক বা আলোচনা টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছিল।

বিষয়বস্তুর বেশির ভাগই ছিল মূলত সংবিধান সম্পর্কিত। এর মধ্যে ছিল সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ; সংসদীয় কমিটির সভাপতিত্ব; নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ; রাষ্ট্রপতির ক্ষমাসংক্রান্ত বিধান; বিচার বিভাগ বিকেন্দ্রীকরণ; জরুরি অবস্থা ঘোষণা; প্রধান বিচারপতি নিয়োগ; প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে থাকার বিধান; নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং ন্যায়পাল নিয়োগের বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা; প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদকাল; সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব; দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, বিশেষত উচ্চকক্ষের গঠন; সদস্য নির্বাচনের পদ্ধতি; উচ্চকক্ষের এখতিয়ার; রাষ্ট্রপতির নির্বাচন পদ্ধতি; রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব; তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠনপ্রক্রিয়া; নাগরিকের মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ এবং রাষ্ট্রের মূলনীতি। পরে পুলিশ কমিশন গঠনের বিষয়টিও এই তালিকায় যুক্ত হয়।

এর মধ্যে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ, প্রধান বিচারপতি নিয়োগ; প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে থাকার বিধান; সরকারি কর্ম কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক ও ন্যায়পাল নিয়োগের বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা; দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের পদ্ধতি ও ক্ষমতা; রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা; তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠনপ্রক্রিয়ার বিষয়ে ঐকমত্য কমিশনে যেভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তাতে বিএনপির ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্ট ছিল। এর বাইরে আরও কিছু বিষয়েও বিএনপির ভিন্নমত ছিল।

বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে অন্য যেকোনো কাজ প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী করতে হয়। এতে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগও কার্যত প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে থেকে যায়।

এ কারণে সাংবিধানিক পদে নিয়োগের জন্য নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ ও আইনসভা—এই তিন অঙ্গের সমন্বয়ে জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিল সংবিধান সংস্কার কমিশন।

তখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছিলাম, এনসিসি গঠনের প্রস্তাবকে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। এটার বাস্তবায়ন হোক, তা বেশ গুরুত্ব দিয়ে ঐকমত্য কমিশনের চাওয়া ছিল।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের এক বৈঠক থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ

অবশ্য এই প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক ছিল। শুরু থেকে এনসিসি গঠনের বিষয়ে বিএনপির জোরালো আপত্তি ছিল। দ্বিতীয় পর্বের আলোচনায় সাংবিধানিক পদে নিয়োগ নিয়ে কয়েক দফা আলোচনা হয়। প্রস্তাবটি একাধিকবার সংশোধন করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত বিএনপি একমত হয়নি।

সংবিধান সংস্কার কমিশনের মূল প্রস্তাব ছিল—এনসিসি হবে রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান। এর সদস্য হবেন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, সংসদের নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষের স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, বিরোধী দল মনোনীত নিম্ন ও উচ্চকক্ষের ডেপুটি স্পিকার, সরকারি দল ও প্রধান বিরোধী দলের বাইরে সংসদে থাকা অন্য দলগুলোর সদস্যদের ভোটে মনোনীত একজন সদস্য।

প্রস্তাবে বলা ছিল, আইনসভা ভেঙে গেলেও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা শপথ না নেওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান এনসিসি সদস্যরা কর্মরত থাকবেন। আইনসভা না থাকাকালে এনসিসির সদস্য হবেন রাষ্ট্রপতি, প্রধান উপদেষ্টা, প্রধান বিচারপতি এবং প্রধান উপদেষ্টা মনোনীত উপদেষ্টা পরিষদের দুজন সদস্য।

প্রস্তাবিত এনসিসির মূল কাজ হবে কিছু প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে নাম সুপারিশ করা। সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবে ছিল প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনার; অ্যাটর্নি জেনারেল; সরকারি কর্ম কমিশনের প্রধানসহ অন্যান্য সদস্য; দুর্নীতি দমন কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনের প্রধানসহ অন্যান্য কমিশনার; প্রধান স্থানীয় সরকার কমিশনারসহ অন্যান্য কমিশনার; প্রতিরক্ষা বাহিনীগুলোর প্রধান এবং আইন দ্বারা নির্ধারিত অন্য কোনো পদে নিয়োগের জন্য নাম চূড়ান্ত করে রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করবে এনসিসি। রাষ্ট্রপতি সে অনুযায়ী নিয়োগ দেবেন।

সংস্কার কমিশনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়। নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা অতিরিক্ত সীমিত করা হলে সরকার ঠিকমতো কাজ করতে পারবে কি না, সে প্রশ্নও আলোচনায় আসে।

এনসিসি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে

জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এনসিসি গঠনের প্রস্তাব নিয়ে দ্বিতীয় পর্বে দলগুলোর সঙ্গে প্রথম আলোচনা করে ২০২৫ সালের ১৮ জুন। জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বেশ কিছু দল এনসিসির বিষয়ে নীতিগত সমর্থন জানায়। তবে গঠনপ্রক্রিয়ায় কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাব ছিল তাদের।

অন্যদিকে বিএনপি ও তাদের মিত্র কিছু দল এ ধরনের কাউন্সিল গঠনের তীব্র বিরোধিতা করে। নিজেদের যুক্তি তুলে ধরে সেদিন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ আলোচনায় বলেছিলেন, বিএনপি এই প্রস্তাবের সঙ্গে নীতিগতভাবে একমত নয়। এ ধরনের একটি কাঠামো করা হলে প্রধানমন্ত্রী পদের কোনো মূল্য থাকে না। তাঁরা মনে করেন, বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনকে প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন করা গেলে এবং নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হলে নির্বাহী বিভাগ কর্তৃত্ববাদী হতে পারবে না।

সাংবিধানিক বিভিন্ন পদে নিয়োগের জন্য আইন সংস্কার করা যায়—এমন মত দিয়ে বিএনপির এই নেতা বলেছিলেন, মাথাব্যথা হয়েছে, তাই মাথা কেটে ফেলা ঠিক হবে না।

বিএনপির মিত্র ১২-দলীয় জোটও এই প্রস্তাবের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। তারা এর পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকারের সমন্বয়ে একটি কমিটি করার প্রস্তাব দেয়।

অন্যদিকে জামায়াত রাষ্ট্রপতি ও প্রধান বিচারপতিকে এই কাউন্সিলের বাইরে রাখার পক্ষে ছিল। এ অবস্থান তুলে ধরে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ ঐকমত্য কমিশনের ওই আলোচনায় বলেছিলেন, বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিকে সব কাজ প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী করতে হয়। এই বিধান অব্যাহত থাকলে কর্তৃত্ববাদকে স্বাগত জানানো হবে। এখানে ভারসাম্য আনতে হবে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন করতে হবে।

এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, মৌলিক সংস্কারে এনসিসি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর মাধ্যমে সাংবিধানিক পদগুলোয় নিয়োগ দেওয়া হলে নিরপেক্ষ নিয়োগ হবে এবং আস্থার জায়গা তৈরি হবে। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘কয়েকটি রাজনৈতিক দল এনসিসি গঠনের বিপক্ষে মতামত দিয়েছে। আমরা বলতে চাই, যাঁরা এনসিসি গঠনের বিপক্ষে, তাঁরা মূলত ফ্যাসিবাদী কাঠামোয় থেকে যেতে চান।’

কিন্তু সাংবিধানিক পদে নিয়োগ, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ও রাষ্ট্রপতির ভূমিকা ঘিরে এই দ্বন্দ্বেই বিতর্ক শেষ হয়নি; উচ্চকক্ষ, পিআর, নারী প্রতিনিধিত্ব, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নোট অব ডিসেন্ট এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে চলে আরও কঠিন লড়াই।

ওই দিনের আলোচনায় এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু বলেছিলেন, ক্ষমতার ভারসাম্য আনা সম্ভব না হলে গণ-অভ্যুত্থানের অভিপ্রায় প্রতিফলিত হবে না। এ ক্ষেত্রে এনসিসি গঠনের প্রস্তাব খুবই সঠিক চিন্তা।

বিতর্কের এক পর্যায়ে এনসিসি গঠনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার। অতীতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, সরকারের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে এবং স্বৈরাচারের উত্থানের বিষয়ে বিরাট ভূমিকা রেখেছে। সরকারি দল ও বিরোধী দল আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যৌথভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্যই এই এনসিসির প্রস্তাব করা হয়েছে।

কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছিলেন, এনসিসিকে সরকার পরিচালনার ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে না। এটি প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে রাষ্ট্রীয় এবং জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরকারি দল, বিরোধী দল এবং রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্তে আসতে পারে।

তবে ১৮ জুনের ওই আলোচনায় এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। আলোচনা শেষে আলী রীয়াজ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, সাংবিধানিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা রাজনৈতিক দলগুলো অনুভব করে। দু-একটি দলের মধ্যে এ ব্যাপারে নীতিগত মতপার্থক্য থাকলেও একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থার বিষয়ে সবাই মত দিয়েছেন।

বিএনপির শর্ত, কমিশনের বিকল্প প্রস্তাব

এরপর ঐকমত্য কমিশনের ২৫ জুনের বৈঠকে আবার এনসিসি নিয়ে আলোচনা হয়। আগের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ঐকমত্য কমিশন এনসিসির পরিবর্তে ‘সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ’ দেওয়ার জন্য একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব করে। তাতে বলা হয়, এটি হবে ‘সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ কমিটি’। এই কমিটিতে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, সংসদের উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের স্পিকার, প্রধান বিরোধী দল ছাড়া অন্যান্য বিরোধী দলের একজন প্রতিনিধি, রাষ্ট্রপতির একজন প্রতিনিধি, প্রধান বিচারপতি মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি। এই কমিটির দায়িত্ব হবে সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের জন্য নাম চূড়ান্ত করা। অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ ও তিন বাহিনীর প্রধান নিয়োগের বিষয়টি এই কমিটির দায়িত্বের বাইরে থাকবে।

 সেদিন সাংবিধানিক পদে নিয়োগের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদ প্রশ্নেও আলোচনা ছিল। সেদিন বিএনপি জানায়, এক ব্যক্তি সারা জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন, এই প্রস্তাব তারা মেনে নেবে। তবে এ ক্ষেত্রে তাদের শর্ত আছে। তা হলো সাংবিধানিক পদগুলোতে নিয়োগের জন্য এনসিসি বা এ ধরনের কোনো কমিটি গঠনের বিধান সংবিধানে যুক্ত করা যাবে না।

বিএনপির বক্তব্য ছিল, এ ধরনের ব্যবস্থা প্রধানমন্ত্রীর হাত-পা বেঁধে দেবে। এর বদলে বিভিন্ন নিয়োগের জন্য আলাদা আইন করা যাবে।

সেদিনের আলোচনার এক পর্যায়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ জানতে চান, এ ধরনের কমিটি করা হলে কী অর্থে সেটা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা খর্ব করবে? জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এ রকম কমিটি হলে প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্র পরিচালনায় পদে পদে বাধাগ্রস্ত হতে হবে। আইনের মাধ্যমে সার্চ কমিটি করলে সংবিধানে নিয়োগ কমিটি যুক্ত করা লাগে না।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের এক সভায় সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজসহ কমিশনের সদস্যরা

তখন আলী রীয়াজ বলেন, যারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে, তারা আইন বদলে দেবে না, তার নিশ্চয়তা কী? জবাবে সালাহউদ্দিন বলেন, তাহলে সংবিধান পরিবর্তন করা হবে না, তার নিশ্চয়তা কী।

তখন আলী রীয়াজ বলেন, সংবিধান পরিবর্তন করা তুলনামূলক কঠিন। একপর্যায়ে সালাহউদ্দিন দলগুলোর ওপর আস্থা রাখার কথা বলেন।

২৯ জুন আবারও সাংবিধানিক পদগুলোতে নিয়োগের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হয়। সেদিন নিয়োগ কমিটির একটি বিস্তারিত প্রস্তাব আলোচনায় উপস্থাপন করে ঐকমত্য কমিশন। বেশির ভাগ দল এই প্রস্তাবে নীতিগতভাবে একমত হলেও বিএনপি, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট, এনডিএম, ১২–দলীয় জোট, লেবার পার্টি ভিন্নমত জানায়।

সেদিনের আলোচনায় বিএনপির পক্ষ থেকে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্ব খর্ব হয়, এমন বিধান সংবিধানে যোগ করা ঠিক হবে না। তিনি এ বিষয়ে অনেকবার বক্তব্য দিয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টা তাঁর ভাষণে উল্লেখ করেছেন যে বিষয়গুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হবে, সেগুলো জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত হবে। যে বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হবে না, সেগুলো বাস্তবায়ন করা হবে না। এ বিষয়ের প্রতি নজর দেওয়ার জন্য কমিশনের প্রতি আহ্বান জানান সালাহউদ্দিন।

নতুন প্রস্তাবের কিছু অংশ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, ২০২৪ সালের এই সময়ে তাঁরা এমন বাংলাদেশ চেয়েছিলেন, যেখানে ক্ষমতার ভারসাম্য ও বিকেন্দ্রীকরণ হবে, জবাবদিহি থাকবে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি প্রধানমন্ত্রীর করায়ত্ত করা হয়, তাহলে এত মানুষের প্রাণ দেওয়া ও ঐকমত্য কমিশনে বসা—এসবের কোনো অর্থ থাকে না।

তখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছিলাম, এনসিসি গঠনের প্রস্তাবকে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। এটার বাস্তবায়ন হোক, তা বেশ গুরুত্ব দিয়ে ঐকমত্য কমিশনের চাওয়া ছিল।

আবার বিকল্প প্রস্তাব, ইসি নিয়ে একমত বিএনপি

সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পদ্ধতি প্রশ্নে ঐকমত্য না হওয়ায় ২২ জুলাই আলোচনায় নতুন প্রস্তাব দেয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সেখানে নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং ন্যায়পাল নিয়োগের জন্য সংবিধানে আলাদা বিধান যুক্ত করার কথা বলা হয়। সংবিধানে সংসদের সরকারি দল, বিরোধী দল ও ক্ষেত্রবিশেষে বিচার বিভাগের প্রতিনিধির সমন্বয়ে বাছাই কমিটির মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়।

পরদিন ২৩ জুলাই ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় এই পদ্ধতিতে নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়ে ঐকমত্য হয়।

ওই দিনে আলোচনায় বিএনপির নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, যেহেতু নির্বাচন পরিচালনা গুরুত্বপূর্ণ, অতীতে ইসি বিতর্কিত হয়েছে, তাই জাতিকে আশ্বস্ত করতে এবং সব দলের মতামতকে শ্রদ্ধা জানাতে একটি জায়গায় আসা যায়। নির্বাচন কমিশনে নিয়োগের বিষয়টি সংবিধানে থাকতে পারে। তবে এই শর্তে যে অন্য কোনো সাংবিধানিক বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের নিয়োগের বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে জটিলতা সৃষ্টি করতে চাওয়া হবে না। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে আইনের মাধ্যমে নিয়োগ করা হবে।

বিএনপির ওয়াকআউট

২৮ জুলাই আবার আলোচনা হয় সরকারি কর্ম কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং ন্যায়পাল নিয়োগের বিধান নিয়ে। ২৫টি দল নিয়োগ পদ্ধতি নিয়ে একমত হলেও বিএনপিসহ ৭টি দল এতে ভিন্নমত দেয়। তারা এসব পদে নিয়োগের জন্য আলাদা আইন করার পক্ষে।

 সেদিন আলোচনা থেকে ওয়াকআউট করেছিল বিএনপি। দলটি আগেই বলেছিল, এ–সংক্রান্ত আলোচনায় তারা আর অংশ নেবে না। সেদিন বৈঠকে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, যেভাবে নিয়োগ পদ্ধতির কথা বলা হচ্ছে, তাতে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নির্বাহী বিভাগ বাধাগ্রস্ত হবে, এমন আশঙ্কা থাকে। প্রধানমন্ত্রীর কর্তৃত্ব খর্ব করা যাবে না। নির্বাহী বিভাগকে কাজ করতে দিতে হবে।

পরে এই চারটি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পদ্ধতি জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত হয় বিএনপিসহ ৭টি দলের ভিন্নমতসহ।

নিয়োগে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি

সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধান এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) মহাপরিচালক এবং আরও ৯টি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষমতা সরাসরি রাষ্ট্রপতির হাতে দেওয়ার প্রস্তাব উঠেছিল ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায়। এর মধ্যে ছিল অ্যাটর্নি জেনারেল, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি), বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি), এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন ও তথ্য কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য এবং বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল ও আইন কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগ। প্রস্তাব ছিল এসব নিয়োগে রাষ্ট্রপতি স্বাধীন থাকবেন, প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ প্রয়োজন হবে না।

তবে শেষ পর্যন্ত মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং বিটিআরসিতে নিয়োগে রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়ে ঐকমত্য হয়। যদিও গভর্নর ও বিটিআরসিতে নিয়োগের বিষয়ে আপত্তি দেয় বিএনপিসহ ৮টি দল।

ক্ষমতার ভারসাম্য প্রশ্নে বিতর্ক

সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা একেবারে সীমিত হয়ে আসবে। কিন্তু এগুলোতে বিএনপির ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্ট আছে। আবার সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থায় এটা কতটা যৌক্তিক, সে প্রশ্নও আছে।

সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবগুলো, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানো, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানো, বিভিন্ন নিয়োগে এনসিসির মতো একটি সংস্থা গঠনের প্রস্তাব নিয়ে নানামুখী আলোচনা হয়েছিল। সংবিধান সংস্কার কমিশনের সুপারিশের সারসংক্ষেপ প্রকাশের পর গত বছরের ২৫ জানুয়ারি ‘প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানোর প্রস্তাব’ শিরোনামে আমার লেখা একটি প্রতিবেদন প্রথম আলোতে ছাপা হয়। সেটা পড়ে সংসদ বিষয়ে গবেষক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক নিজামউদ্দিন আহমদ আমাকে ফোন করেন। প্রস্তাবগুলোর ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে তাঁর সঙ্গে আমার দীর্ঘ আলোচনা হয়।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর তাঁদের সুপারিশ প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে তুলে দেন

পরবর্তী সময়ে ১২ মার্চ বিষয়টি নিয়ে অধ্যাপক নিজামউদ্দিনের একটি বিশ্লেষণ প্রথম আলোতে ছাপা হয়। তাতে তিনি লেখেন, ‘সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে যেসব প্রস্তাব বা সুপারিশ করা হয়েছে, তাতে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলের অপশাসনের পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, এসব সুপারিশের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর পদকেই একেবারে “গৌণ” করে ফেলা হয়েছে। অথচ সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। শুধু বিগত সরকারের ক্ষমতার অপব্যবহারকে দৃষ্টান্ত হিসেবে ধরে সংবিধান পরিবর্তনের প্রস্তাব কতটুকু যুক্তিসংগত, তা ভেবে দেখা দরকার। সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে; এটা শুধু বাংলাদেশেই নয়, ব্রিটেনের অনুকরণে যেসব দেশ সংসদীয় সরকারব্যবস্থা চালু করেছে, প্রায় প্রতিটি দেশেই এ প্রবণতা বিদ্যমান।

অধ্যাপক নিজামউদ্দিন লিখেছেন, ব্রিটেনের মতো অন্যান্য দেশে যেমন অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও নিউজিল্যান্ডে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা হ্রাস এবং তাঁকে অধিকতর জবাবদিহির আওতায় আনার জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতিবেশী ভারতেও প্রধানমন্ত্রীকে অন্যদের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে হয়। এ জন্য বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য যেসব কমিটি গঠন করা হয়, তাতে সরকারের অন্যান্য বিভাগ ও বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব থাকে। লক্ষণীয়, কোনো ব্যক্তির সঙ্গে নয়, বরং সরকারের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য সৃষ্টির জন্য এসব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

 অধ্যাপক নিজামের মতে, কিছু সুপারিশ, যেমন প্রধানমন্ত্রীর পরপর দুবারের বেশি ক্ষমতায় না থাকার বিষয়টি মোটামুটি সবাই সমর্থন করবে বলে ধারণা করা যায়। দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী একই ব্যক্তি না হওয়ার সুপারিশও মোটামুটি গ্রহণযোগ্য। এতে সরকার পরিচালনায় অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীকে সংসদীয় দলের নেতৃত্ব থেকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাব কোনোভাবেই সমীচীন হবে না।

শেষ পর্যন্ত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের বিষয়ে বিএনপির অবস্থান ছিল—তারা এসব ক্ষেত্রে নিয়োগের জন্য আলাদা আইন করবে। তবে সে আইনে কী থাকবে, কেমন হবে; তা এখন পর্যন্ত বিএনপির পক্ষ থেকে পরিষ্কার করা হয়নি।

ইতিমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে। বিএনপি বলেছে, এসব বিষয়ে আরও আলাপ-আলোচনা করে নতুন করে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এখানে একটি আশঙ্কা থেকে যায় যে অতীতে আওয়ামী লীগ যেভাবে নির্বাচন কমিশন নিয়োগে আইন করেছিল এবং দলীয় লোক নিয়োগের সুযোগ রেখেছিল, সেভাবেই সাংবিধানিক পদগুলোতে নিয়োগের বিধান করা হতে পারে। সংসদে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এমন আশঙ্কার কথা ইতিমধ্যে তুলে ধরা হয়েছে।

কিন্তু সাংবিধানিক পদে নিয়োগ, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ও রাষ্ট্রপতির ভূমিকা ঘিরে এই দ্বন্দ্বেই বিতর্ক শেষ হয়নি; উচ্চকক্ষ, পিআর, নারী প্রতিনিধিত্ব, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নোট অব ডিসেন্ট এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে চলে আরও কঠিন লড়াই।