
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল পরীক্ষা করে সংসদে প্রতিবেদন দিয়েছে সংশ্লিষ্ট দুটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। এর মধ্যে মানবাধিকার কমিশন বিলে কিছু পরিবর্তন আনার সুপারিশ করেছে আইন মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।
আজ বুধবার জাতীয় সংসদে বিল দুটি নিয়ে সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদন উত্থাপন করা হয়। বিল দুটি নিয়ে সংসদীয় কমিটিতে আলোচনা বর্জন করেছিলেন বিরোধী দলের সদস্যরা। কমিটির প্রতিবেদনে এটি উল্লেখ করা হলেও এক জায়গায় আবার বিরোধী দলের সদস্যরা ‘সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন’ বলেও উল্লেখ করা হয়। এটি নিয়ে বিরোধী দল আপত্তি জানালে সরকারি দলের সঙ্গে বিতর্ক হয়।
গত বৃহস্পতিবার সংসদে উত্থাপিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলে বলা হয়েছিল, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তকালীন বা পরবর্তী সময়ে যেকোনো ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে যেকোনো স্থান, অফিস–আদালত, হাজতখানা বা আটককেন্দ্র পরিদর্শন করতে পারবে কমিশন।
সংসদীয় কমিটি এখানে ‘যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে’ শব্দগুলো বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছে। বিল পাসের সময় এই সুপারিশ গৃহীত হলে তদন্তের সময় পরিদর্শনের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে না।
সংসদে উত্থাপিত বিলে বলা ছিল, মানবাধিকার কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে একজন চেয়ারপারসন ও চারজন কমিশনারের সমন্বয়ে কমিশন গঠন করা হবে। এর মধ্যে একজন নারী হবেন। সংসদীয় কমিটি একজন নারীর পাশাপাশি একজন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সদস্য রাখার সুপারিশ করেছে।
এ ছাড়া কমিশন গঠনের জন্য বাছাই কমিটিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি বা তাঁর মনোনীত মানবাধিকার বিষয়ে সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন সাংবাদিক প্রতিনিধি যুক্ত করার সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি।
আইন মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি নওশাদ জমির আজ রাতে সংসদে কমিটির প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। প্রতিবেদনের এক অংশে বলা হয়, বিলটি পরীক্ষায় সদস্যরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। সেখানে বিরোধী দলের সদস্য নাজিবুর রহমান ও আলফারুক আব্দুল লতিফের নামও আছে। আরেকটি অংশে বলা হয়, বিলের ওপর আলোচনার শুরুতে বিরোধী দলের দুই সদস্য বিলটির ওপর বক্তব্য না দিয়ে কমিটি কক্ষ ত্যাগ করেন।
কমিটির সভাপতি বিলটি উত্থাপনের প্রস্তাব করলে আপত্তি জানান নাজিবুর রহমান। তিনি বলেন, তাঁরা কেন কমিটির আলোচনায় অংশ নেননি, সেটা কমিটির বৈঠকে বিস্তারিত বলেছিলেন এবং লিখিতভাবে কমিটিকে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেটা কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। আরেক জায়গায় বলা হয়েছে, তাঁরা সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। এটা নিয়ে তিনি আপত্তি জানান।
জবাবে কমিটির সভাপতি নওশাদ জমির বলেন, বিরোধী দলের সদস্যরা কমিটির সামনে বক্তব্য দিয়েছিলেন। কিন্তু বিস্তারিত আলোচনার আগে তাঁরা কক্ষত্যাগ করেছিলেন।
এরপর আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বিরোধী দলের সদস্যরা বিলের বিরোধিতা করে তাঁদের মত প্রকাশ করেছেন। ইনঅ্যাকশন ইজ অলসো অ্যাকশন।
এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, স্থায়ী কমিটির বৈঠক থেকে ওয়াকআউটের নজির মনে হয় এটি প্রথম। বিরোধী দল নোট অব ডিসেন্ট হিসেবে বক্তব্যটা দিলে সেটা বিলের প্রতিবেদনে থাকত। কিন্তু তাঁরা সেটা দেননি।
জবাবে নাজিবুর রহমান বলেন, ইনঅ্যাকশন ইজ অলসো অ্যাকশন—এটা কোর্টের বিষয়। সংসদের না। তাঁরা লিখিত বক্তব্য দিয়েছিলেন। সেটা রিপোর্টে রাখা হয়নি। তাই রিপোর্টটি অসম্পূর্ণ। তিনি তাঁদের বক্তব্যটি রিপোর্টে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান।
বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, বিরোধী দলের সদস্যরা লিখিত দিয়েছেন, কমিটিকে পড়ে শুনিয়েছেন। এটা রিপোর্টে থাকা উচিত।
পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পিকারের উদ্দেশে বলেন, কমিটিতে সদস্যরা কে কী বলেছেন, সেটা রিপোর্টে উল্লেখ থাকে না। তবে স্পিকার ‘সক্রিয়’ শব্দটা কেটে দিতে পারেন।
জবাবে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, বিলটি যখন পাসের আগে দফাওয়ারি আলোচনা হবে, তখন সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা আলোচনা করার সুযোগ পাবেন। আলোচনার মাধ্যমে এটি অনুমোদিত হতে পারে। তিনি বলেন, সংসদীয় কমিটির রিপোর্ট সংসদে উত্থাপিত হলো।
এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলের ওপর প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। এ বিলে তেমন কোনো পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়নি।
এই প্রতিবেদন উপস্থাপনের সময় আপত্তি জানান এই কমিটির সদস্য জামায়াতে ইসলামীর নুরুল ইসলাম বুলবুল। তিনি বলেন, তাঁরা কেন ওয়াকআউট করেছিলেন, সে বক্তব্য কমিটির বৈঠকে দিয়েছেন। প্রতিবেদনে সক্রিয় শব্দটি কার্যকর নয়।
তখন স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, ওয়াকআউট করার বিষয়টি রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। রিপোর্ট উপস্থাপিত হলো।
পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সক্রিয় শব্দটি সংসদ সচিবালয়ের আবিষ্কার, তারা এটা কপি পেস্ট করেছে। সামনে এটা থাকবে কি না, সেটা স্পিকার ঠিক করবেন। বিরোধী দলের আপত্তি থাকলে বিল পাসের সময় সেটা আনতে পারবে।
এর আগে নওশাদ জমির সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিলের ওপর স্থায়ী কমিটির প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপন করেন।