মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম পার্টির নাম বহাল রেখে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দিতে বিল পাস করেছে জাতীয় সংসদ। এই বিলের বিষয়ে জামায়াতের পক্ষ থেকে আপত্তি জানিয়ে দলের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বক্তব্য দেন। তবে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় জোটের অন্যতম শরিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এই বিলের ওপর কোনো আপত্তি নেই বলে স্পিকারকে জানিয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার সংসদের অধিবেশনে বিলটি উত্থাপন করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়। বিরোধীদলীয় নেতা বিলের ওপর আপত্তি জানিয়ে বক্তব্য দেন। কিন্তু ‘বিরোধী দলের নেতা কোনো আপত্তি করেননি’ উল্লেখ করে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ আপত্তির বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে ভোট দেননি এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীও কোনো জবাব দেননি।
এর আগে সংসদের বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে এ বিলের ক্ষেত্রে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (ভিন্নমত) জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা বলেছিলেন, ‘অধ্যাদেশটি বর্তমান অবস্থায়, কোনো পরিবর্তন ছাড়া পাস হলে দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামের মতো দলগুলো পাকিস্তানের হিসেবে বিদ্যমান থেকে যাবে, যা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। এই অধ্যাদেশের “বীর মুক্তিযোদ্ধা” এবং মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞা পরিবর্তনের দাবি রাখে।’
কমিটির প্রতিবেদনে জামায়াতের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, ২০০২ সালে খালেদা জিয়ার সরকার আমলে আইনে দলগুলোকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী বলা হয়নি। রাজনৈতিক দলকে সশস্ত্র বাহিনী চিহ্নিত করা ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সমর্থন।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা এই অধ্যাদেশে ‘মুক্তিযুদ্ধ’, ‘মুক্তিযোদ্ধা’, ‘মুক্তিযোদ্ধা সহযোগী’, ‘মুক্তিযোদ্ধা পরিবার’ এবং ‘মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্যের সংজ্ঞা’ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অধ্যাদেশে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় বলা হয়, ‘১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন এবং যেসব ব্যক্তি যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ভারতের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং যাঁরা স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস, মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন, এমন বেসামরিক নাগরিকেরা (ওই সময়ে যাঁদের বয়স সরকার–নির্ধারিত সর্বনিম্ন বয়সের মধ্যে ছিল) মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাবেন। এর পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী, মুক্তিবাহিনী, বিএলএফ ও অন্যান্য স্বীকৃত বাহিনী, পুলিশ বাহিনী, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর), নৌ কমান্ডো, কিলো ফোর্স ও আনসার সদস্যরাও বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য হবেন।’
জারি করা অধ্যাদেশে ‘মুক্তিযুদ্ধ’র সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষায় হানাদার ও তাদের সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস, তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধ।
বিলটির ওপর আপত্তি জানিয়ে বিরোধী দলের নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা চেয়েছিলেন দেশটা মানবিক হবে এবং সমাজের সর্বক্ষেত্রে ন্যায়বিচার সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু স্বাধীনতার পরে তার পুরাটাই উল্টোটা হয়েছিল। জনগণের রায়কে সম্মান দেখাতে ব্যর্থ ও অস্বীকার করার কারণে যে যুদ্ধটি (মুক্তিযুদ্ধ) অনিবার্য হয়ে উঠেছিল, কিন্তু বেদনার সঙ্গে লক্ষ করা গেল, দেশের (স্বাধীনতার পর) শাসকেরা সেটা ভুলে গেলেন। একপর্যায়ে তাঁরা বহুদলীয় গণতন্ত্রকে হত্যা করে একদলীয় বাকশাল কায়েম করলেন। ১৯৭৫ সালে এই সংসদে মাত্র সাত মিনিট আলোচনা করে দেশের সব কটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এমনকি আওয়ামী লীগ এতটাই বেপরোয়া ছিল যে ১৯৭০ ও ’৭৩ সালে আওয়ামী লীগ নামে নির্বাচন করে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগকেও নিষিদ্ধ ঘোষণা করল। পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি প্রয়াত জিয়াউর রহমানের হাত ধরে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরে এসেছে এবং এই সংসদ সে ধারাবাহিকতার অংশ।
জামুকা আইনের সংজ্ঞার বিষয়ে জামায়াতের আমির বলেন, এ জিনিসটা স্বাধীনতার পরে তখনকার সরকার আনেনি। জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সরকার আনেনি। এ জিনিসটা সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন ফ্যাসিস্টের বিকৃত প্রতীক শেখ হাসিনা। পরবর্তী পর্যায়ে অন্তর্বর্তী সরকার ধারাবাহিকতা রেখেছে সামান্য পরিবর্তন করে। সেখানে তৎকালীন তিনটি সংগঠনের নাম নেওয়া হয়েছে—তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম পার্টি। পাকিস্তানি বাহিনী ও তার সহায়ক শক্তির সঙ্গে তিনটি রাজনৈতিক দলের নাম এসেছে। বর্তমান উপস্থাপনায় তৎকালীন সংগঠনের কথা বলা হয়েছে।
জামায়াত আমির আরও বলেন, ‘আল্লাহ ভালো জানেন, একাত্তর সালের সেই চরম সময়ে কার কী ভূমিকা ছিল। আল্লাহই পূর্ণাঙ্গ একমাত্র সাক্ষী। বাকি আমরা যারা আছি, তারা আংশিক সাক্ষী। আমরা চাই, বাংলাদেশ রাজনীতি সুস্থ ধারায় চলুক জনগণের প্রতি দায়-দরদ নিয়ে, দেশের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দল কার্যক্রম পরিচালনা করবে।’
১৯৭৯ সালে জারি করা রাজনৈতিক দল অধ্যাদেশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের পুনর্জন্ম হয় উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘সে সময় থাকা সব রাজনৈতিক দল তাদের অধিকার ফিরে পায়। আমরাও (জামায়াতে ইসলামী) সে সময় ফিরে পেয়েছি। সেই দায়-দরদ নিয়ে ১৯৭৯ সাল থেকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার চেষ্টা করছি।’
বিরোধী দলের নেতা শফিকুর রহমান বলেন, ‘আগামীর দিনগুলোতেও আর জাতিতে বিভক্ত নয়, বরং ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো, সম্মানের জাতি গঠন করতে পারি। সব দলের এটাই অঙ্গীকার। আমরা জাতিকে আর বিভক্ত করতে চাচ্ছি না।’
পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল বিল সম্পর্কে এনসিপির কোনো আপত্তি নেই বলে সংসদের নজরে আনার জন্য সংসদকে অনুরোধ করেছেন। এরপর তিনি বিলটি ভোটে দেন। এ সময় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বক্তব্য দিতে চাইলে স্পিকার বলেন, বিরোধী দলের নেতা তো কোনো আপত্তি করেননি। তবু আপনি কিছু বলতে চান? তখন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, উত্থাপিত আকারে বিলটি তোলার জন্য অনুরোধ করছি।’ পরে বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়।