
বিএনপি সরকারের ছয় মাসের কাজের মূল্যায়ন নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, ‘সরকার অ্যাকাউন্ট টু হিজ কমিটমেন্ট, সরকার ব্যর্থ। মোটা দাগে ব্যর্থ। এবং সে ফ্যাসিস্ট সরকারের পথ ধরেই হাঁটছে। পরিণতি সে দিকেই যাচ্ছে।’
আজ মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর মগবাজারের আল ফালাহ মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মিয়া গোলাম পরওয়ার এ কথা বলেন। ‘বিএনপি সরকারের ৬ মাসের মূল্যায়ন’ নিয়ে জামায়াত এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
এতে বলা হয়, গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অনীহা, ভয়াবহ গ্যাস-জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় কার্যকর পরিকল্পনার অভাব, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, দ্রব্যমূল্যের চাপ, শিক্ষকদের কৌশলে রাজনীতি থেকে বিরত রাখার চক্রান্ত, ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের অভিযোগ, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ বন্ধকরণ, গুম প্রতিরোধ আইনে উদ্বেগজনক ফাঁক এবং পররাষ্ট্রনীতিতে কৌশলগত দুর্বলতা—এই বিষয়গুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো সরকারের প্রথম ছয় মাসের রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা, অগ্রাধিকার ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে।
গ্যাস, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ–সংকট সমাধানে সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলে লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়। বিকল্প এলএনজি উৎস, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, কৌশলগত ফুয়েল রিজার্ভ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে শিল্প ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অগ্রাধিকার নিয়ে সরকারের পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা কী, জানতে চেয়েছে জামায়াত।
প্রথম ছয় মাসেই প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় এবং গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের অভিযোগ জোরালো হয়েছে বলে লিখিত বক্তব্যে অভিযোগ করা হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক সংঘর্ষ, দখল, চাঁদাবাজি ও সহিংসতার ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী ও অঙ্গসংগঠনের নামে অভিযোগ এসেছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
সরকারের পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ অমীমাংসিত বিষয়গুলোতে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। রোহিঙ্গা সংকটেও প্রত্যাবাসনের বাস্তব অগ্রগতি নেই। মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির দুর্বলতা স্পষ্ট বোঝা গেছে।
সরকারের প্রথম ছয় মাসে খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংকের তারল্যসংকট, আমানতকারীদের আস্থাহীনতা এবং উচ্চ সুদের চাপ থেকে বের হওয়ার দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি বলে লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়।
গুম প্রতিরোধ আইনে ফাঁক দৃশ্যমান হয়েছে উল্লেখ করে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, গুম প্রতিরোধের নামে এমন কোনো আইন হতে পারে না, যেখানে গোপন আটক বা অস্বীকৃত হেফাজতের সামান্য সুযোগও থেকে যায়।
সংবাদ সম্মেলনে মিয়া গোলাম পরওয়ার সরকারের কাছে আট দফা দাবি জানান।
এগুলো হলো-
গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে নির্দিষ্ট সময়সীমাসহ রোডম্যাপ প্রকাশ করতে হবে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ, ১৮০ কার্যদিবসের বাস্তবায়ন কাঠামো এবং গণভোটে অনুমোদিত সংস্কারগুলো কোন প্রক্রিয়ায় ও কত দিনের মধ্যে বাস্তবায়ন হবে, তা স্পষ্ট করতে হবে; সমন্বিত এনার্জি সিকিউরিটি স্ট্র্যাটিজি প্রণয়ন করতে হবে; প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয়, রাষ্ট্রীয় সংস্থা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ-পদায়নের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয়ের পরিবর্তে মেধা, যোগ্যতা, পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষতাকে একমাত্র মানদণ্ড করতে হবে এবং বিতর্কিত রাজনৈতিক নিয়োগ পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি নিশ্চিত করতে হবে; রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, মধ্যপ্রাচ্য, জ্বালানি কূটনীতি, শ্রমবাজার ও বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট লক্ষ্য, কৌশল ও পরিমাপযোগ্য ফলাফলসহ একটি পূর্ণাঙ্গ ফরেন পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক প্রকাশ করতে হবে; দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে; ব্যাংকিং খাতে আস্থা, শৃঙ্খলা ও সুশাসন ফিরিয়ে আনতে হবে।একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে যেকোনো দলীয় বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে এবং সর্বশেষ প্রতিরোধ আইনে গোপন আটক বা অস্বীকৃত হেফাজতের সব ধরনের আইনি সুযোগ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। চূড়ান্ত আইন প্রণয়নের আগে সংশোধিত খসড়া প্রকাশ, স্বাধীন তদন্তব্যবস্থা নিশ্চিত এবং গুমের শিকার পরিবার, মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মতামত গ্রহণ করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান, হামিদুর রহমান আযাদ, আবদুল হালিম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান (মিলন), নূরুল ইসলাম বুলবুল, মতিউর রহমান আকন্দ, শফিকুল ইসলাম মাসুদ, কর্মপরিষদ সদস্য জাহিদুর রহমান, ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি রেজাউল করিম প্রমুখ।