রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন বঙ্গভবন
রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন বঙ্গভবন

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: ২৪৭ বনাম ৯০, তবু হিসাব ভোটের বাইরেই

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী জোটের দুই প্রার্থীর মনোনয়নপত্রই বৈধ হয়েছে। ২০ আগস্ট ভোট হবে। প্রাথমিক সমীকরণে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পক্ষে ২৪৭ এবং জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদের পক্ষে ৯০ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন।

সংখ্যার এই ব্যবধানে জয়-পরাজয় নিয়ে কার্যত কোনো অনিশ্চয়তা নেই। মির্জা ফখরুলের জয় প্রায় নিশ্চিত। এরপরও ভোটটিতে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে। তবে সেটি ফলাফলের চেয়ে অলি আহমদ কত ভোট পান, বিরোধী জোটের ৯০টি ভোট অটুট থাকে কি না এবং দুই শিবিরের বাইরের সংসদ সদস্যরা কোন দিকে যান—এসব প্রশ্নকে ঘিরে।

আজ রোববার রাষ্ট্রপতি পদে জমা দেওয়া মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হয়। বিএনপির সদ্য সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং এলডিপির চেয়ারম্যান অলি আহমদ—দুজনের মনোনয়নপত্রই বৈধ ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সুযোগ রয়েছে। তবে কোনো প্রার্থীরই মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সম্ভাবনা নাই। ফলে ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদকক্ষে দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোট হবে। ভোটার হবেন সংসদ সদস্যরা।

গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেন। সংবিধান অনুসারে, পদত্যাগের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হয়।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও কর্নেল (অব.) অলি আহমদ; রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপি ও ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী তাঁরা

সংখ্যার চেয়ে ভোটের বিন্যাসে নজর

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনসহ বর্তমানে সদস্য রয়েছেন ৩৪৯ জন। বিএনপির সদস্য ২৪৭ জন। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের সদস্য ৯০ জন। চট্টগ্রাম-৪ আসনে নির্বাচিত ঘোষিত বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা আদালতের রায়ে বাতিল হওয়ায় তিনি শপথ নিতে পারেননি। ফলে আসনটি শূন্য রয়েছে।

দুই প্রধান রাজনৈতিক শিবিরের বাইরে থাকা ১২ সদস্যের মধ্যে তিনজন বিএনপির মিত্র গণসংহতি আন্দোলন, গণ অধিকার পরিষদ ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি)। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সদস্য একজন। বাকি আটজন স্বতন্ত্র; তাঁদের প্রায় সবাই একসময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

এই সমীকরণে মির্জা ফখরুলের জয় প্রায় নিশ্চিত হলেও বাকি ১২টি ভোট রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অলি আহমদ স্বতন্ত্র কিংবা ইসলামী আন্দোলনের ভোট টানতে পারলে বিরোধী জোট সেটিকে রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে তুলে ধরতে পারবে। অন্যদিকে মির্জা ফখরুল বিএনপির বাইরের ভোট পেলে ক্ষমতাসীন দল তাঁর প্রতি বৃহত্তর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার বার্তা দিতে পারবে।

অলি আহমদের সামনে মূল লক্ষ্য তাই রাষ্ট্রপতি হওয়া নয়; নিজের জোটের ভোট অটুট রেখে এর বাইরে কতটি ভোট পাওয়া যায়, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ভোট প্রকাশ্য, ৭০ অনুচ্ছেদে বিতর্ক

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা প্রকাশ্যে ভোট দেন। ব্যালট পেপারে পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশাপাশি ভোটদাতা সদস্যের নাম ও আসন নম্বরও উল্লেখ করতে হয়। ফলে কে কাকে ভোট দিয়েছেন, তা শনাক্ত করা যায়।

জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি ১১ আগস্ট বলেছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকর থাকবে। কেউ দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দিলে তাঁর সংসদ সদস্য পদ শূন্য হবে।

জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হবেন রাষ্ট্রপতি

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য দল থেকে পদত্যাগ করলে কিংবা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তাঁর আসন শূন্য হবে। তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নির্বাচন কমিশন পরিচালিত একটি স্বতন্ত্র সাংবিধানিক প্রক্রিয়া হওয়ায় এতে ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হবে কি না, তা নিয়ে ভিন্ন আইনি মত রয়েছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইনে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে দেওয়া বৈধ ভোট বাতিলেরও কোনো বিধান নেই।

রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আইনি ব্যাখ্যা যা-ই হোক, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে কোনো সংসদ সদস্য ভোট দেবেন—এমন সম্ভাবনা খুবই কম।

সর্বশেষ ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোট হয়েছিল। ওই সংসদে বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিসহ বেশ কয়েকটি দলের সদস্য ছিলেন। মোট ৩৩০ সদস্যের মধ্যে ৬৬ জন ভোট দেননি। এবারের সংসদের প্রায় সব সদস্যই ক্ষমতাসীন ও বিরোধী—এই দুই রাজনৈতিক শিবিরে বিভক্ত। ফলে বড় ধরনের ভোট-বিচ্যুতির সম্ভাবনা আরও কম।

অলির প্রার্থিতায় রাজনৈতিক বার্তা

অলি আহমদ শুধু একজন বিরোধী প্রার্থী নন। তিনি বিএনপির সাবেক নেতা, জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৮০ সালে সেনাবাহিনী ছেড়ে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের যোগাযোগমন্ত্রীও ছিলেন তিনি।

অর্থাৎ একসময়ে বিএনপির ঘরের মানুষ অলি আহমদ এখন বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর প্রার্থিতার এই প্রতীকী দিকটি জামায়াতের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের মধ্যে একজন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করে জোটটি আলাদা রাজনৈতিক বার্তা দিতে চাইছে। জাতীয় নির্বাচনের আগেও অলি আহমদকে সামনে রেখে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিল জামায়াত। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও সেই রাজনীতির ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে।

জোটসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়ার আশ্বাসের ভিত্তিতে এলডিপি জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে এসেছিল। ফলে পরাজয় নিশ্চিত জেনেও তাঁকে প্রার্থী করা একদিকে সেই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা, অন্যদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিপরীতে বিরোধী পক্ষের উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা।

জাতীয় নির্বাচনের পর বিরোধী দলগুলোর ঐক্য কতটা টেকসই, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সেই ঐক্যের পরীক্ষা হবে। অলি আহমদ জোটের ৯০টি ভোটের সব কটি পেলে বিরোধীরা ঐক্যের বার্তা দিতে পারবে। ভোট কমে গেলে জোটের ভেতরের দুর্বলতাও প্রকাশ পাবে।

মির্জা ফখরুল দীর্ঘদিন বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্ব এবং তারেক রহমানের দেশের বাইরে থাকার সময়ে তিনি দলের কঠিন সময়ের অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন। তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়ার মধ্য দিয়ে বিএনপি দীর্ঘদিনের একজন পরীক্ষিত নেতাকে সক্রিয় দলীয় রাজনীতি থেকে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামোর ভিন্ন ভূমিকায় নিয়ে যাচ্ছে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফল প্রায় নিশ্চিত হলেও ২০ আগস্টের ভোট তাই অর্থহীন আনুষ্ঠানিকতা নয়। ফখরুলের জয়ের চেয়ে অলি কত ভোট পেলেন, বিরোধী জোটের ৯০টি ভোট অটুট থাকল কি না, দুই শিবিরের বাইরের ভোট কোন দিকে গেল এবং কোনো ভোট-বিচ্যুতি ঘটল কি না, ভোটের পরের রাজনীতিতে এসব প্রশ্নই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।