রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও এমপিদের বেতন বাড়ালে অন্যায় হবে: জামায়াতের আমির

সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। ঢাকা। ২৩ সেপ্টেম্বর
ছবি: প্রথম আলো

পে স্কেলে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি কোনো কোনো মহল রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ সদস্য ও সংসদ সদস্যদের আর্থিক সুবিধা বাড়ানোর চিন্তা করছে বলে উল্লেখ করেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, এটা অন্যায় সিদ্ধান্ত হবে। জামায়াত এটা চায় না। টাকা রোজগার করতে বিরোধী দল সংসদে যায়নি। সরকার এ ধরনের উদ্যোগ নিতে চাইলে বিরোধী দল তাতে বাধা দেবে।

আজ বুধবার দুপুরে রাজধানীর মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিট সাংবাদিকদের মতবিনিময় সভায় শফিকুর রহমান এ কথা বলেন।

শফিকুর রহমান বলেন, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার আগে জামায়াতে ইসলামী সরকারি প্লট না নেওয়া এবং শুল্কমুক্ত গাড়ির সুবিধা না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। সেটি তাঁরা নেননি। সরকারি দলের সংসদ সদস্যরাও নির্বাচিত হওয়ার পর একই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পরে সংসদে এ বিষয়ে সিদ্ধান্তও হয়েছে, কোনো এমপি এই সুবিধা নেবেন না।

সরকার এক বছরের মধ্যে এক-দেড় কোটি নতুন কর্মসংস্থানের কথা বলেছিল, কিন্তু এখন অনেকে কর্মসংস্থান হারাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন শফিকুর রহমান। গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে সেভাবে আলোচনা আসছে না বলে আক্ষেপ করেন তিনি।

জামায়াত কেন এটা করতে যাবে

রাজধানী ঢাকায় যানবাহনে আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় সরকারি দলের নেতা ও সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্যের লংমার্চ কর্মসূচির প্রসঙ্গ টেনেছেন। এই অভিযোগ প্রসঙ্গে জামায়াতের আমির বলেন, ‘এখন বলা হচ্ছে, ট্রেনে আগুন, বাসে আগুন, ককটেল ফোটানো এটা বিরোধী দল, এটা জামায়াতের লোকেরা, এটা এনসিপির লোকেরা করেছে। জামায়াত কেন এটা করতে যাবে? সে কি নিজে নিজের কর্মসূচি বানচাল করতে চাইবে? বরঞ্চ যদি আমাদের কর্মসূচিটাই বানচাল করার জন্য কেউ এ ধরনের প্যানিক সিচুয়েশন তৈরি করে থাকে, এই দায় তাদের।’

শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমার আগামীকাল লংমার্চ, আমি আজকে কি ককটেল ফুটাব, বাসে আগুন দেব, ঢাকাকে অস্থির করব? এটা কোনো পাগল করবে? আমি তো চাইব যে আমার কর্মসূচি সাকসেসফুল হোক।’

সংসদে বিভিন্ন বিষয়ে বিরোধী দলের দেওয়া নোটিশ নিয়ে আলোচনার সুযোগ দেওয়া হয় না বলে অভিযোগ করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, জ্বালানি, সার, বিদ্যুৎ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, শিশুধর্ষণ ও হত্যা এবং নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁরা দফায় দফায় নোটিশ দিয়েছেন। কিন্তু সব নোটিশ আলোচনায় আনা হচ্ছে না।

জামায়াতের জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বক্তব্য ও নোটিশকে সরকার গুরুত্ব না দেওয়ায় বিরোধী দল রাজপথের আন্দোলনে নেমেছে বলে জানান শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, সরকার বিরোধী দলের ভালো পরামর্শগুলো গ্রহণ না করলে তাদের কিছু করার নেই। এ ক্ষেত্রে তারা চাইলে ফাইল ছুড়ে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে বের হয়ে যেতে পারেন। তবে তাঁরা এসব করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চান না। তাঁরা মনে করেন এতে সমস্যার সমাধান হবে না।

লংমার্চের বিষয়ে সরকারি দলের সমালোচনার বিষয়ে শফিকুর রহমান আরও বলেন, ‘আমরা তো জনগণের স্বার্থে এই দাবিগুলো নিয়ে মাঠে নেমেছি। আর এই দেশে লংমার্চ কি এটাই প্রথম? এর আগে আর কোনো দিন হয় নাই? রোডমার্চ হয় নাই? এখন সরকারি দলে যাঁরা আছেন তাঁরা করেন নাই? আমরা একসাথে মিলে করি নাই? আলাদা আলাদা করেছি, একসাথে করেছি। সবাই করেছি।’

কোটি কোটি টাকা মানুষের পকেট থেকে যাবে

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সম্পর্কে জামায়াত আমির বলেন, প্রতিদিন লাখ লাখ লিটার তেল ব্যবহার হয়। মূল্যবৃদ্ধির কারণে নতুন করে কোটি কোটি টাকা মানুষের পকেট থেকে যাবে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে উদাহরণ দেওয়া হচ্ছে, আশপাশের দেশগুলোতে জ্বালানি তেলের দাম বাংলাদেশের চেয়ে বেশি।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা সে দেশগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থার মতো কি না, সে প্রশ্ন রেখে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘যদি আমাদের অর্থনীতির সামঞ্জস্যতা ওই দেশের অর্থনীতির সঙ্গে না থাকে, তাহলে শুধু জ্বালানি নিয়ে ওখানে তুলনা করবেন?’

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরে তিন দফায় জ্বালানি তেলের (ডিজেল দুবার, পেট্রল ও অকটেন তিনবার) দাম বাড়ানো হয়েছে উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, দাম বাড়িয়ে বলা হয় সহনীয় মাত্রায় বাড়ানো হয়েছে। যিনি দাম বাড়িয়েছেন তাঁর জন্য এটি সহনীয় হতে পারে, কিন্তু বাইকচালক, যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে।

ইন্টারভিউতে যা বলি, ফটোকার্ডে তা আসে না

সংসদ নির্বাচনের পরে বিরোধীদলীয় নেতা সাক্ষাৎকার কেন দেন না, মতবিনিময় সভায় সাংবাদিকেরা সেটি জানতে চান। তখন আমির বলেন, ‘ইন্টারভিউতে যা বলি, ফটোকার্ডে তা আসে না। মিসলিড করা হয়। কাটপিচ, লেজ নাই, মাথা নাই, মাঝখান থেকে পেট ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এটার মাধ্যমে মানুষ কনফিউজড হয়।...যদি আমরা এ নিশ্চয়তা পাই যে এগুলো হবে না, তাহলে আমরা কথা ইনশা আল্লাহ বলব।’

নির্বাচনের পরে এখন পর্যন্ত সরকারি খরচে বিদেশ সফরে যাননি উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, তিনি সরকারি খরচে হাত দিতে চান না। মাসিক যে ভাতা পান, তা–ও অন্য খাতে দিয়ে দেন, নিজে নেন না।

নিজের জন্য বরাদ্দ করা সরকারি বাসা প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, সেখানে বিভিন্ন কূটনীতিক, ব্যবসায়ী, সংগঠন ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তিনি বৈঠক করেন। তবে এখানে তিনি থাকেন না বলে জানান।

মতবিনিময় সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম মা’ছুম, হামিদুর রহমান আযাদ, আবদুল হালিম, রফিকুল ইসলাম খান, মুয়াযযম হোসাইন হেলাল, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান (মিলন), মোবারক হোসাইন, মতিউর রহমান আকন্দ, শফিকুল ইসলাম মাসুদ প্রমুখ।