
জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের থাইল্যান্ড সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফেরার সঙ্গে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ করতে যাওয়ার কোনো যোগসূত্র আছে কি না—সাংবাদিকের এমন প্রশ্নে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘সবাই আপনারা জানতে পারবেন।’
আজ শুক্রবার সকালে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ‘বেঙ্গল ডেলটা কনফারেন্স ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে অংশগ্রহণ শেষে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল।
রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন, এ বিষয়ে বিএনপি কী ভাবছে—সাংবাদিক এমন প্রশ্ন করেন। জবাবের মির্জা ফখরুল বলেন, পত্রপত্রিকা পড়ে রাজনীতির কথা বলা যাবে না।
জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ আজ দুপুর সোয়া ১২টার দিকে থাইল্যান্ডের ব্যাংকক থেকে ঢাকায় ফেরেন। চিকিৎসার জন্য তিনি ১৯ জুলাই ব্যাংকক গিয়েছিলেন। নির্ধারিত সময়ের দুই দিন আগেই তিনি দেশে ফিরলেন। স্পিকারের আগাম দেশে ফেরার খবর রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের আলোচনাকে আরও জোরদার করেছে। কারণ, নিয়মানুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদত্যাগপত্র জমা দেন স্পিকারের কাছে। আর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার আগপর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন স্পিকার।
‘বেঙ্গল ডেলটা কনফারেন্স ২০২৬’-এর আয়োজক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিকস (দায়রা)। সকালে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশন শুরু হয়। এরপর দায়রার পক্ষ থেকে বাংলাদেশের ভূরাজনীতি, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা পরিবর্তন নিয়ে সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্যের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয়। অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষকেরা উপস্থিত আছেন।
দুই দিনের এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মির্জা ফখরুল। বক্তব্যের শুরুতে মির্জা ফখরুল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ এবং ২০২৪ সালের গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে প্রাণ দেওয়া ছাত্র-যুবকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ সব সময়ই সংকট মোকাবিলায় সক্ষমতা দেখিয়েছে। তাঁদের দৃঢ়তা ও সহনশীলতার ওপর আস্থা রেখে তিনি আশা প্রকাশ করেন, একটি নতুন, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে, যেখানে মানুষের জীবনমান আরও উন্নত হবে।
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সৃষ্টি হয়েছে। দেশের সামনে এখন অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অস্থিরতা, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর দ্বন্দ্বের প্রভাবও বাংলাদেশের মতো দেশের ওপর পড়ছে।
বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে বলে মন্তব্য করেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, যাঁরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, তাঁদের দায়িত্ব শুধু গণতন্ত্রের কথা বলা নয়, বরং তা চর্চা করা। আর এই চর্চার মধ্য দিয়ে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব।
দীর্ঘদিনের অর্থ পাচার ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার পরিণতিতে দেশ কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন বিএনপির মহাসচিব। তিনি বলেন, তবে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
মির্জা ফখরুল বলেন, বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্যেই সংসদে বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারসহ বিদেশি অংশীদারদের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সম্পৃক্ত করার বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকার রয়েছে।
সাম্প্রতিক নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন বিএনপির মহাসচিব। তিনি বলেন, নির্বাচিত সরকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারে কাজ শুরু করেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে ‘জুলাই সনদ’ গৃহীত হয়েছে। এ সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলো গণতান্ত্রিক সংস্কার বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ। নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, বিএনপি সরকার অর্থনীতি ও রাজনৈতিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে। সে লক্ষ্যেই কাজ চলছে।
দেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর কথা উল্লেখ করেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী। তিনি বলেন, বেকারত্ব, বিনিয়োগের ঘাটতি, দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা বর্তমানে বড় উদ্বেগের বিষয়। এসব সমস্যা মোকাবিলায় কৃষি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করতে কৃষকবান্ধব বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। শিল্পায়ন উৎসাহিত করতে কর ও শুল্ককাঠামোয় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এসব উদ্যোগ ইতিমধ্যে অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তব্য দেন মালদ্বীপের সাবেক উপরাষ্ট্রপতি আব্দুল্লাহ জিহাদ। তিনি বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শাসনব্যবস্থার প্রচলিত ধারণাগুলো এখন পুনর্মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু ঝুঁকি, অস্থির পুঁজিপ্রবাহ, পরিবর্তনশীল বাণিজ্য জোট, বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামোর রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ, মালদ্বীপের মতো দেশগুলোর জন্য অভিযোজনক্ষম ও দূরদর্শী শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। সংকটের মুহূর্তে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিষ্ঠান গঠনের মধ্য দিয়েই প্রকৃত স্থিতিস্থাপকতা তৈরি হয়।
আব্দুল্লাহ জিহাদ বলেন, মালদ্বীপে বর্তমানে প্রায় এক থেকে দেড় লাখ বাংলাদেশি কর্মী কাজ করছেন, যা তাঁর দেশের বৃহত্তম প্রবাসী শ্রমিকগোষ্ঠী। মালদ্বীপের নির্মাণ, পর্যটন, মৎস্য ও সেবা খাতে তাঁদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে দুই দেশের মধ্যে শ্রমবাজার সহযোগিতা জোরদার, নিয়োগ ব্যয় কমানো, কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলা, শ্রমিকদের মৌলিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও আর্থিক সংযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাংলাদেশ, মালদ্বীপ ও প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে গভীরতর অর্থনৈতিক সহযোগিতা গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
‘পলিটিকস অব কেয়ার’-এর প্রসঙ্গ তুলে ধরে আব্দুল্লাহ জিহাদ বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রে মানুষের কল্যাণকে রাখতে হবে। সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবেশগত নিরাপত্তাকে অর্থনৈতিক নীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় ক্ষয়, চরম আবহাওয়ার মতো জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের মধ্যে জলবায়ু সহনশীলতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, টেকসই নীল অর্থনীতি নিয়ে সহযোগিতার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
স্বাগত বক্তৃতায় সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অর্থনীতির অধ্যাপক মুশতাক খান বলেন, বাংলাদেশের সামনে এখন অর্থনৈতিক খাতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, প্রবৃদ্ধির চাপের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদ ও দুর্নীতির উত্তরাধিকার দেশের ব্যাংকিং ও বিদ্যুৎ খাতকে দুর্বল করেছে। খেলাপি ঋণ, অকার্যকর চুক্তি ও উৎপাদনশীলতার ঘাটতি কাটিয়ে শিল্প, সেবা, কৃষি খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর উপায় নিয়ে সম্মেলনে আলোচনা হবে বলে জানান তিনি।
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা গভীর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন মুশতাক খান। তিনি বলেন, প্রচলিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশকে নতুন অংশীদারত্ব ও কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলার পাশাপাশি নিজের অবস্থান সুসংহত করতে হবে। বিশ্বজুড়ে তরুণ প্রজন্ম পরিবর্তনের দাবিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। আর সেই বৈশ্বিক পরিবর্তনের ধারার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ও আকাঙ্ক্ষাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরতে চায় দায়রা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, বৈশ্বিক সংঘাত, অর্থনৈতিক অস্থিরতা, জলবায়ু সংকট ও দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের এই অনিশ্চিত সময়ে বাংলাদেশের জন্য জ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, বিশ্ববিদ্যালয়–শিল্প খাত–নীতিনির্ধারকদের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা অপরিহার্য। কেবল সস্তা শ্রম বা আমদানি করা প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব নয়। বরং গবেষণা, উদ্ভাবন ও স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে নিজস্ব জ্ঞান উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। একই সঙ্গে উন্নয়নপ্রক্রিয়ায় ন্যায়, জবাবদিহি ও মানবিক মূল্যবোধ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সম্মেলনের আয়োজক ঢাকাভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়রা বঙ্গীয় বদ্বীপে জ্ঞানের উৎপাদন ও অগ্রগতি নিয়ে কাজ করে। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতির গতিশীলতা বোঝাপড়ার চর্চা প্রতিষ্ঠানটির কাজের বড় ক্ষেত্র।