জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং সদস্যসচিব আখতার হোসেন
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং সদস্যসচিব আখতার হোসেন

আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান ‘বিরোধী দল দমনের চক্রান্ত ও ফ্যাসিবাদী পথ’: বিবৃতিতে নাহিদ-আখতার

বর্তমান দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কোনো ধরনের নৈতিক ও আইনি বৈধতা নেই বলে মনে করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেন। এনসিপির মুখপাত্র এবং সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধানের পদক্ষেপ সম্পর্কে তাঁরা বলেছেন, শুধু জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বর্তমান দুদক পুনর্গঠন হলেই নিরপেক্ষ তদন্ত সম্ভব। অন্যথায় এ ধরনের লোকদেখানো অনুসন্ধান পরাজিত ফ্যাসিবাদের কায়দায় বিরোধী দল দমনেরই নতুন চক্রান্ত বলে দেশবাসীর কাছে পরিষ্কার। অবিলম্বে সরকারকে এই ফ্যাসিবাদী পথ থেকে ফিরে আসতে হবে।

বুধবার রাতে গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে এ মন্তব্য করেছেন নাহিদ ও আখতার। এর আগে দুপুরে দুদকের এক সংবাদ সম্মেলনে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরুর কথা জানানো হয়। প্রথমে অভিযোগের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার কথা বললেও পরে বিষয়টি থেকে সরে আসেন সংস্থাটির উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম।

‘দুদককে পুনরায় বিরোধী দল দমনের হাতিয়ার করার অপচেষ্টা এবং অস্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ’ শীর্ষক বিবৃতিতে এনসিপির আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব বলেন, গত সাত মাসে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও তাঁদের পরিবারের বিরুদ্ধে প্রভাব খাটিয়ে সরকারি কাজ হাসিল এবং জনগণের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অথচ এসব নগ্ন দুর্নীতি ও স্বার্থের সংঘাতের খবরের বিরুদ্ধে দুদক সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকা পালন করছে। দুর্নীতির প্রতি কমিশনের এই অন্ধত্ব প্রমাণ করে যে এটি শুরুতেই অসাংবিধানিকতার প্রশ্ন ও স্বচ্ছতাহীনতার কালিমা নিয়ে গঠিত হয়েছে। ফলে এই বিতর্কিত কমিশনের কোনো ধরনের নৈতিক ও আইনি বৈধতা থাকতে পারে না।

যখন বিরোধী দলগুলো জনগণের মৌলিক অধিকার আদায় ও গণরায় অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিতে রাজপথে নামছে, ঠিক তখনই নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমাতে দুদককে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার পুরোনো অপকৌশল শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন এনসিপির দুই শীর্ষ নেতা। তাঁরা বলেন, এটি মূলত পরাজিত ফ্যাসিবাদের আমলের সেই পুরোনো ও নিপীড়নমূলক কায়দারই এক বিপজ্জনক পুনরাবৃত্তি মাত্র। ফ্যাসিবাদী আমলে যে আইনের অধীনে সরকারের আজ্ঞাবহ কমিশন হিসেবে দুদক গঠিত ও পরিচালিত হতো, সেই একই আইনে বর্তমান কমিশনও গঠিত।

অতীতেও কমিশনকে যেভাবে সরকারের প্রতিপক্ষ দমনের অস্ত্র বানানো হয়েছিল, আজও সেই একই অশুভ কর্মকাণ্ড লক্ষ করা যাচ্ছে উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, নবগঠিত দুর্নীতি দমন কমিশনকে ব্যবহার করে বিরোধী দল দমনের ‘ড্রেস রিহার্সেল’ আবারও সামনে এসেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা ও এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধানের খবর বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। অনুসন্ধানের শুরুতেই দুদকের মুখপাত্র সংবাদমাধ্যমের সামনে দাবি করেন যে প্রাথমিক তদন্তে ‘দুর্নীতির সত্যতা’ পাওয়া গেছে। অথচ এর পরপরই সাংবাদিকদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বার্তা দিয়ে ওই কর্মকর্তাই আবার ‘প্রাথমিক সত্যতা’ শব্দটি ব্যবহার না করার অনুরোধ জানান। সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ্যে অসত্য তথ্য দেওয়ার পর গোপনে হোয়াটসঅ্যাপে তা সংশোধনের এই অপচেষ্টার মাধ্যমে দুদক তার ন্যূনতম বিশ্বাসযোগ্যতা ও নিরপেক্ষতা হারিয়েছে।

যে কমিশন তদন্ত শুরুর আগেই মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ায়, সেই কমিশনের অধীনে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে আনীত কোনো অভিযোগের স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত অসম্ভব বলে মনে করেন নাহিদ ও আখতার। তাঁরা বলেন, বর্তমান ‘অসাংবিধানিক’ কমিশন বাতিল করে জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ায় কমিশন পুনর্গঠিত হলেই কেবল নিরপেক্ষ তদন্ত সম্ভব। অন্যথায় এসব লোকদেখানো অনুসন্ধান যে পরাজিত ফ্যাসিবাদের কায়দায় বিরোধী দল দমনেরই নতুন চক্রান্ত, তা দেশবাসীর কাছে অতি পরিষ্কার। তাই অনতিবিলম্বে সরকারকে এই ফ্যাসিবাদী পথ থেকে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

‘অসাংবিধানিক ও বিতর্কিত প্রক্রিয়ায়’ গঠিত বর্তমান দুদক অবিলম্বে বাতিলের দাবি করে এনসিপি নেতারা আরও বলেছেন, জুলাই সনদে উল্লিখিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও যোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করতে হবে। দুদককে ‘বিরোধী দল দমন কমিশনে’ পরিণত করার অপচেষ্টা বন্ধ করে সরকারের ভেতরে থাকা দুর্নীতিবাজ ও লুটেরাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। দুদকের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক ইনস্টিটিউশনকে আবারও সরকারি দলের অবৈধ কর্মকাণ্ড ও ক্ষমতার রক্ষাকবচ বানানোর চক্রান্ত জনগণ মেনে নেবে না।