
হঠাৎ করেই আলোচনায় ‘ককাস অব আমেরিকা’, এ আলোচনার সূত্রপাত ৪ জুলাই। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তিতে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় একটি অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছিল। সেই আয়োজনের ছবি-ভিডিও প্রকাশ করা হয় ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের ফেসবুক পেজে। সেই সঙ্গে ধন্যবাদ জানানো হয় ‘ন্যাশনাল পার্লামেন্ট অব বাংলাদেশের ককাস অব আমেরিকা’কে। তাতে জানা গেল, সংসদে একটি ‘ককাস অব আমেরিকা’ রয়েছে। তা থেকেই চলছে আলোচনা।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনার মধ্যে এই ‘ককাস অব আমেরিকা’ গঠনের উদ্দেশ্য নিয়ে কৌতূহলী হয়ে উঠেছেন অনেকে। আসলে কী এই ককাস, এর কাজ কী, কোন উদ্দেশ্যে গঠন, চলুন খুঁজি তার উত্তর।
ককাস এর শাব্দিক অর্থ হলো নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে একমত হওয়া একটি দল। সংসদীয় ককাস হলো নির্দিষ্ট কোনো বিষয়, নীতি বা একটি দেশকে কেন্দ্র করে সংসদ সদস্যদের নিয়ে গঠিত একটি অনানুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম। এটি সংসদের কোনো স্থায়ী কমিটি বা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নয়।
সাধারণত এ ধরনের ককাসের কাজ হলো নির্দিষ্ট বিষয়ে সংসদ সদস্যদের মধ্যে সমন্বয় করা, আলোচনা ও জনমত তৈরি করা, নীতিনির্ধারণে প্রভাব রাখার চেষ্টা করা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো।
বিভিন্ন দলের সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি সংসদ সদস্য নন, এমন ব্যক্তিদেরও এই ককাসের কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পার্লামেন্টারি ককাসের উদাহরণ রয়েছে।
যুক্তরাজ্যে এ ধরনের উদ্যোগকে বলা হয় অল-পার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপ। হাউস অব কমনস ও হাউস অব লর্ডসের সদস্যরা এতে অংশ নেন। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসেও অনেক ককাস রয়েছে।
২০২২ সালে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘কংগ্রেশনাল বাংলাদেশ ককাস’ গঠন করা হয়েছিল। ওই বছরের ১৯ আগস্ট ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এ–সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এই ককাস বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান সুসম্পর্ক আরও জোরদার করতে কাজ করবে।
সংসদবিষয়ক গবেষক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, ককাস কয়েক ধরনের হয়। সাধারণভাবে অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ অনেক দেশে সংসদীয় দলকে ককাস বলা হয়। আবার নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে সংসদ সদস্যদের গ্রুপকেও সংসদীয় ককাস বলা হয়।
বাংলাদেশের সংসদে বিষয়ভিত্তিক ককাস নতুন কিছু নয়। অষ্টম, দশম, একাদশসহ বিভিন্ন সংসদে এ ধরনের ককাস ছিল বলে জানান অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন।
দশম জাতীয় সংসদে রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে নৃগোষ্ঠীবিষয়ক সংসদীয় ককাস গঠিত হয়েছিল। একাদশ সংসদে ফজলে হোসেন বাদশার নেতৃত্বে একই বিষয়ে ককাস ছিল। ওই ককাসে সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি অধ্যাপক-গবেষক মেসবাহ কামালও যুক্ত ছিলেন।
২০১৭ সালে দশম সংসদে ইসরাফিল আলমের নেতৃত্বে অভিবাসন ও উন্নয়নবিষয়ক বাংলাদেশ সংসদীয় ককাস গঠিত হয়েছিল। পরে একাদশ সংসদে ২০২০ সালে শামীম হায়দার পাটোয়ারীকে সভাপতি করে ককাসটি পুনর্গঠন করা হয়।
বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে কয়েকজন সংসদ সদস্য মিলে ‘ককাস অব আমেরিকা ইন ন্যাশনাল পার্লামেন্ট অব বাংলাদেশ’ গঠন করেছেন। এই ককাসের চেয়ারম্যান বিএনপির সংসদ সদস্য, সাবেক মন্ত্রী ওসমান ফারুক। ১০ সদস্যের এই ককাসে বিএনপি ছাড়াও জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্যরা আছেন।
৪ জুলাই জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজার অনুষ্ঠানে ওসমান ফারুক ছাড়াও ককাসের সদস্য মাহবুবুর রহমান, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, নওশাদ জমির, নিপুণ রায় চৌধুরী, সানজিদা ইসলাম, জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম ও মারদিয়া মমতাজ উপস্থিত ছিলেন। বিজেপির আন্দালিভ রহমান এবং এনসিপির আখতার হোসেনও এই ককাসে আছেন বলে জানা গেছে।
সংসদীয় এই ককাসের চেয়ারম্যান ওসমান ফারুক প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের এ উদ্যোগ রাজনৈতিক নয়। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধুত্ব জোরদার করার জন্য এটি পুরোপুরি একটি সাংস্কৃতিক উদ্যোগ।
অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, নারী ও শিশু—এ ধরনের নানা বিষয়ে সংসদীয় ককাস হতে পারে।
নিজাম উদ্দিনের মতে, আন্তদলীয় সদস্যদের সমন্বয়ে ককাস গঠিত হলে সেটি নির্দিষ্ট কোনো বিষয়কে সামনে আনার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ‘ককাস অব আমেরিকা’র লক্ষ্য বা কার্যক্রম এখনো তাঁর কাছে স্পষ্ট নয়।