বিএনপির নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দিচ্ছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিশ্বরোড কেন্দ্রীয় মাঠ, দাউদকান্দি উপজেলা সদর, কুমিল্লা। ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬
বিএনপির নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দিচ্ছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিশ্বরোড কেন্দ্রীয় মাঠ, দাউদকান্দি উপজেলা সদর, কুমিল্লা। ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬

কুমিল্লায় নির্বাচনী জনসভায় তারেক রহমান

কেন্দ্র পাহারা দিয়ে বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পর বাড়ি ফিরবেন

কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলা সদরের বিশ্বরোড কেন্দ্রীয় মাঠে বিএনপির নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দিয়েছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গতকাল রোববার দিবাগত রাত ১২টা ২৭ মিনিটে জনসভা মঞ্চে পৌঁছান তিনি।

এর আগে মাগরিবের নামাজ আদায়ের পর থেকেই জনসভা শুরু হয়। এ সময় স্থানীয় নেতারা মঞ্চে বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন।

দাউদকান্দি উপজেলা বিএনপির উদ্যোগে এ সভার আয়োজন করা হয়। সভাপতিত্ব করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, সাবেক মন্ত্রী ও কুমিল্লা-১ আসনের (দাউদকান্দি- মেঘনা) বিএনপির মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন।

জনসভায় তারেক রহমান বলেন, ‘আগামী ১২ তারিখে যে নির্বাচন, সে নির্বাচনে আপনারা সকলে সেই ভোটের অধিকারটি প্রয়োগ করবেন। আপনারা আপনাদের রাজনৈতিক ভোটের অধিকার প্রয়োগ করবেন। যেই অধিকারটি গত ১৫ বছর আপনাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। শুধু ভোটের অধিকারই কেড়ে নেওয়া হয় নাই, একই সঙ্গে মানুষের কথা বলার অধিকারও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।’

তারেক রহমান আরও বলেন, ‘আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি আপনারা সকলে মিলে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করে ভোটকেন্দ্রে যাবেন। সাথে অন্য ধর্মের লোকদের নিয়ে যাবেন। যাঁর যাঁর এলাকার ভোটকেন্দ্রের সামনে ফজরের নামাজ আদায় করবেন।’

বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, ‘ফজরের নামাজ আদায় করে ভোটকেন্দ্রের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে যাবেন। কেন্দ্র খোলার সঙ্গে সঙ্গে সিল দেবেন। কোথায় সিল দেবেন? ধানের শীষে। তারপর বাড়ি ফিরবেন না। দিনভর কেন্দ্র পাহারা দিয়ে বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পর বাড়ি ফিরবেন।’

বিএনপির নির্বাচনী জনসভায় তারেক রহমানের আগমন ঘিরে দলের নেতা–কর্মী ও স্থানীয় লোকজনের উপস্থিতি। বিশ্বরোড কেন্দ্রীয় মাঠ, দাউদকান্দি উপজেলা সদর, কুমিল্লা। ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬

তারেক রহমান বলেন, ‘বিএনপির আমলে আপনাদের এলাকার মন্ত্রী-এমপিরা ব্রিজ-কালভার্ট–রাস্তাঘাটসহ উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন। কিন্তু গত ১৭ বছর সেই কাজের সংস্কারও হয়নি। কাজেই বিএনপি যখন ক্ষমতায় থাকে দেশের রাস্তাঘাট-ব্রিজ-কালভার্ট–স্কুল-কলেজ–হাসপাতালের উন্নয়ন হয়।’

তারেক রহমান আরও বলেন, ‘অতীত প্রমাণ করে যে বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল, দুটি বিষয়ে কড়াকড়ি করেছিল। একটি হলো মানুষ পথেঘাটে নিরাপদে চলতে পারে। আরেকটি হলো, মানুষ যাতে নিরাপদে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারে। অতীতে কোনো দলের লোক অন্যায় করলে তাকেও আইনের হাতে তুলে দেওয়া হতো। কারণ, দুর্নীতির লাগাম চেপে ধরতে হবে। যেকোনো দলের লোকই হোক না কেন, কেউ কোনো আইনবিরোধী কাজ করলে তাকে আইনের হাতে তুলে দেওয়া হবে। তখন আমার কিছুই করার থাকবে না।’

তারেক রহমান বলেন, ‘গত ১৫-১৭ বছরে মেগা মেগা প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমরা দেখেছি রাস্তাঘাট–ব্রিজ –কালভার্টের কোনো উন্নয়ন নেই, হাসপাতালে গেলে চিকিৎসক নেই, কলেজে গেলে শিক্ষক নেই। অতীতে এগুলো হয়েছে। দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে না পারলে, আমরা উন্নয়নের যতই পরিকল্পনা করি না কেন, সেগুলো মানুষের কোনো কাজে লাগবে না।’

তারেক রহমান আরও বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং দুর্নীতি আমরা কিছুতেই ছাড় দেব না। খালেদা জিয়া সরকার এগুলো সব সময় প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছে। বিএনপি সরকার দায়িত্বে থাকাকালীন জেলা–উপজেলায় মানুষের চলাচলের জন্য ব্রিজ-কালভার্ট-রাস্তাঘাট নির্মাণ করেছে। শিশুদের লেখাপড়ার জন্য স্কুল–কলেজ তৈরি করেছে। বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়েছে। এখন নতুন চিন্তাভাবনা হলো গ্রামের সাধারণ মা–বোনদের ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে। প্রতি মাসে চার সপ্তাহের মধ্যে কমপক্ষে এক সপ্তাহের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী এই কার্ডের মাধ্যমে দেওয়া হবে। কারণ, সংসার চালান মায়েরা।’

বিএনপির চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন নারী শিক্ষার অগ্রগতির জন্য উপবৃত্তির ব্যবস্থা করেছেন। নারীদের বিনা মূল্যে লেখাপড়া করার জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন। গত ২০ বছরে অনেক মা-বোন শিক্ষিত হয়েছেন। তাদের আমরা স্বাবলম্বী করতে চাই। নারীরা স্বাবলম্বী হলে দেশ অনেক দূর এগিয়ে যাবে।’

তারেক রহমান বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছিলেন। দীর্ঘ বছর খাল খননের অভাবে অসংখ্য খাল-নদী ভরাট হয়ে গেছে। আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলে খাল-নদী পুনঃখনন কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। খাল খনন কর্মসূচি উদ্বোধন করা হবে।

মাঝারি-প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, কৃষকদের কৃষি কার্ড দেওয়া হবে। কার্ডের মাধ্যমে কোনো কৃষক যদি বছরে দুই ফসল করেন, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই একটি ফসলের সার-বীজ-ঔষধ সরকারিভাবে বিনা মূল্যে পাবেন। কৃষি কার্ডের মাধ্যমে সহজ কৃষি ঋণ পাবেন। এতে ধীরে ধীরে কৃষকদের অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটবে।

তারেক রহমান বলেন, পুরুষেরা যেকোনোভাবে উপজেলা অথবা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারেন। কিন্তু নারীরা তা পারেন না। পরিবারের কর্তা অথবা ছেলেদের কোনো না কোনো কাজ থাকার কারণে নারীরা এ সেবা থেকে বঞ্চিত হন। বিএনপি সরকার গঠন করলে পল্লিচিকিৎসকদের মতো হেলথ কেয়ারার নিয়োগ দেওয়া হবে। হেলথ কেয়ারার গ্রামে গ্রামে গিয়ে নারীদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা সেবা দেবেন। এতে নারীরা ঘরে বসে চিকিৎসা সেবা পাবেন।

বিএনপি চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘আমরা রাজনীতি করি দেশের মানুষের জন্য। বাংলাদেশের মানুষ সাধারণত দুবাই, কাতার, সৌদি আরব ও ইউরোপে যান। আমরা চাচ্ছি ধীরে ধীরে দেশের প্রতিটি জেলায় ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট গড়ে তুলতে, যাতে বিদেশগামী লোকজন সঠিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে, সঠিক চাকরির মাধ্যমে বিদেশে যেতে পারেন। এতে দেশের বেকারদের সুবিধা বৃদ্ধি পাবে, বিদেশগামীদের ভাগ্যের উন্নয়ন হবে।’

তারেক রহমান বলেন, ‘গত ১৫-১৭ বছরে কী হয়েছে সেদিকে যাব না। তবে চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানে দেশে একটা বিরাট পরিবর্তন হয়েছে। সে পরিবর্তনকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে। করব কাজ, গড়বে দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।’

তারেক রহমান সভামঞ্চে আসার পর রাত ১২টা ৪৩ মিনিটে বক্তব্য শুরু করেন। রাত একটায় বক্তব্য শেষ করেন।

শীতের রাতের ঠান্ডা আবহাওয়া ও কুয়াশা উপেক্ষা করে দল বেঁধে বিএনপির নেতা-কর্মীরা বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্য শোনার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তাঁদের অনেকের হাতে ছিল তারেক রহমানের ছবি, কারও হাতে ধানের শীষের ছবি, আবার কারও হাতে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ছবি। তারেক রহমানের দাউদকান্দিতে আগমনকে ঘিরে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছিল।

দাউদকান্দি, মেঘনা, মুরাদনগর, মুন্সিগঞ্জ, চাঁদপুরের মতলব উপজেলা থেকে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা সমাবেশে উপস্থিত হন।

গত বৃহস্পতিবার সিলেটে জনসভার মধ্য দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার শুরু করেছেন তারেক রহমান। পরদিন শুক্রবার ঢাকায় সমাবেশ করেন তিনি।

জনসভায় আরও বক্তব্য দেন কুমিল্লার মুরাদনগর আসনের এবারের ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী ও সাবেক মন্ত্রী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনের ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী কামরুজ্জামান রতন, কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আখতারুজ্জামান সরকার, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাশেম, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক এম এ লতিফ ভূঁইয়াসহ অনেকে।