জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক হোসেন। সোমবার দুপুরে
জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক হোসেন। সোমবার দুপুরে

রাতে ‘গুজব’, সকালে ‘পদত্যাগের সিদ্ধান্ত’, দুপুরে ‘স্বেচ্ছায় অব্যাহতি’: ইশরাকের যত বক্তব্য

প্রধানমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন বলে রোববার রাতে খবর প্রকাশের পর সেটাকে ‘গুজব’ ও ‘উড়োখবর’ বলেছিলেন এই বিএনপি নেতা। প্রথম আলো অনলাইনে এ খবর প্রকাশের পর ইশরাকের দপ্তর থেকে আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়। অথচ সোমবার সকালে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক বললেন, তিনি নিজেই ‘স্বেচ্ছায় অব্যাহতি’ চেয়েছেন।

শনিবার বিকেলে অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযান ঘিরে সমালোচনার মুখে সোমবার দুপুরে পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়া পর্যন্ত একেক সময় একেক ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়তে বাধ্য হওয়া ইশরাক হোসেন। প্রথমে পদত্যাগের নির্দেশের খবর অস্বীকার করেছেন। এরপর সিদ্ধান্ত আগেই প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় বিভ্রান্তি তৈরির অভিযোগ তুলেছেন। সবশেষে পদত্যাগকে নিজের স্বেচ্ছায় নেওয়া সিদ্ধান্ত হিসেবে তুলে ধরেছেন।

ইশরাকের এসব বক্তব্যের মধ্যে বেশ কিছু অসংগতি ও পরস্পরবিরোধিতা রয়েছে। বিশেষ করে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত তিনি কখন জানতে পেরেছিলেন, কেন আগের রাতের খবরকে ‘মিথ্যা’ বলেছিলেন এবং পদত্যাগের উদ্যোগ আসলে কার ছিল—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি তাঁর বক্তব্যে।

পদত্যাগের নির্দেশ, নাকি স্বেচ্ছায় অব্যাহতি

দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন ইশরাক হোসেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিজেই প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছেন।

ইশরাক বলেন, ‘আজকের দিন হতে আমি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে।’ ঢাকা-৬ আসন ও আশপাশের এলাকায় মাদক নির্মূল এবং জনজীবনের অন্যান্য সমস্যা নিয়ে কাজ করতে চান বলে প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী এতে সম্মত হয়েছেন এবং তাঁকে এলাকায় কাজ করার সুযোগ দিয়েছেন।

অথচ সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, রোববার বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে ইশরাককে ডেকে পাঠিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন বলে সরকারসংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র প্রথম আলোকে নিশ্চিতও করেছিল।

সংবাদ সম্মেলনে এই দুই ধরনের বক্তব্যের বিষয়ে ইশরাকের কাছে ব্যাখ্যা চান এক সাংবাদিক। তিনি জানতে চান, সকালে বলা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন, অথচ সংবাদ সম্মেলনে বলছেন, স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করছেন। বিষয়টি আসলে কী?

সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক হোসেন

জবাবে ইশরাক বলেন, ‘আমি যদি প্রধানমন্ত্রীকে গিয়ে বলিও স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে চাচ্ছি, অফিশিয়ালি কিন্তু তাঁর নির্দেশই আসবে।’

প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভার প্রধান উল্লেখ করে ইশরাক বলেন, ‘উনি ক্যাবিনেটের প্রধান, উনি নির্দেশই দিবেন।’

ইশরাকের দাবি, তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন।

এরপর সাংবাদিকদের উদ্দেশে ইশরাক বলেন, ‘সকালের মেসেজ কী গেল, বিকেলের মেসেজের কমা একটা ঠিক ছিল না, দাড়িটা কম হইছে—এগুলা নিয়ে দয়া করে মূল প্রসঙ্গ থেকে আমাদেরকে সরাবেন না।’

তবে ইশরাকের এ ব্যাখ্যার পরও পদত্যাগের উদ্যোগ কার পক্ষ থেকে এসেছিল, সেই প্রশ্ন থেকে যায়। কারণ, রোববার প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর ইশরাকের পক্ষ থেকে শুধু তা অস্বীকারই করা হয়নি, খবরটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ছড়ানো মিথ্যা তথ্য হিসেবেও দাবি করা হয়েছিল।

নতুন ব্যাখ্যা

পদত্যাগের নির্দেশের খবর অস্বীকার করার বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে নতুন ব্যাখ্যা দেন ইশরাক হোসেন। তাঁর দাবি, সিদ্ধান্তটি আজ সোমবার সকালেই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করার কথা ছিল। কিন্তু দলের কোনো সহকর্মী আগেভাগে তা প্রকাশ করায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।

ইশরাক হোসেন বলেন, ‘আমাদের অফিশিয়াল প্রক্রিয়া অনুযায়ী আজকে সকালেই এটার অফিশিয়াল সিদ্ধান্তটা এসেছে। সেভাবেই আসার কথা ছিল, সেভাবেই এটাকে মিডিয়াতে নিয়ে আসার কথা ছিল। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের হয়তোবা কোনো কলিগই এটিকে যে সময় প্রকাশ করার কথা, তার অতি আগে প্রকাশ করে দিয়ে একটা কনফিউশন তৈরি করেছে।’

এরপর ইশরাক হোসেন বলেন, ‘গতকাল হইছে না আজকে হইছে, তাতে কী আসে–যায়?’

ইশরাকের এ বক্তব্যের সঙ্গে আগের রাতের বক্তব্যের অসংগতি রয়েছে। কারণ, রোববার রাতে তাঁর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, পদত্যাগের কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি এবং পদত্যাগের প্রশ্নই ওঠে না। অথচ সোমবার তিনি বলছেন, সিদ্ধান্তটি নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।

প্রশ্ন হলো, সিদ্ধান্তটি যদি আগেভাগে প্রকাশ হয়ে থাকে, তাহলে আগের রাতে সেটিকে ‘কাল্পনিক’, ‘মিথ্যা’ ও ‘গুজব’ বলা হয়েছিল কেন?

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইশরাক এ বিষয়েও ব্যাখ্যা দেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি যেহেতু আমার সংক্রান্ত এবং বিষয়টি যেহেতু সরাসরি প্রধানমন্ত্রী সংক্রান্ত, উনি যতক্ষণ না পর্যন্ত নির্দেশ দিবেন যে এটি প্রকাশ করা হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এটাকে গুজব বলে অথবা অসত্য বলে ধরে নিতে হবে।’ তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের আগে সেটিকে গুজব বা অসত্য হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

কিন্তু আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা এবং কোনো তথ্য অসত্য হওয়া এক বিষয় নয়। রোববার রাতে ইশরাকের পক্ষ থেকে শুধু আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত না আসার কথা বলা হয়নি; পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার তথ্যটিই অস্বীকার করা হয়েছিল।

রাতভর একের পর এক প্রতিবাদ, আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি

রোববার রাত ১০টার দিকে প্রথম আলো অনলাইনে ‘মন্ত্রিসভা থেকে ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এর ২২ মিনিট পর রাত ১০টা ২২ মিনিটে নিজের হোয়াটসঅ্যাপ মিডিয়া গ্রুপে ইশরাক লেখেন, ‘পদত্যাগের গুজবে কান না দেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।’

সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক হোসেন

চার মিনিট পর রাত ১০টা ২৬ মিনিটে একই গ্রুপে একটি অডিও বার্তা দেন তিনি। প্রথম আলোর খবরকে ‘গুজব’ ও ‘উড়োখবর’ আখ্যায়িত করে ইশরাক বলেন, ‘দয়া করে সবাইকে অনুরোধ জানাচ্ছি, এই পুরো বিষয়টিকে গুজব হিসেবে ধরবেন। এর কোনো সত্যতা এখনো নেই। এ রকম কোনো সিদ্ধান্ত যদি দল থেকে আমরা নেই, তাহলে সেটি অবশ্যই উড়োখবরের মাধ্যমে আসবে না।’

এর দুই মিনিট পর রাত ১০টা ২৮ মিনিটে ইশরাকের প্রেস কর্মকর্তা একই গ্রুপে একটি প্রতিবাদলিপি দেন। এতে প্রথম আলোর খবরকে অসত্য ও বিভ্রান্তিকর উল্লেখ করা হয়। খবরটি প্রত্যাহার না করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়। পরে প্রতিবাদলিপিটি ইশরাকের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে ওই পেজে দেওয়া আরেক বার্তায় বলা হয়, ইশরাককে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি। তাঁর পদত্যাগের কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

ওই বার্তায় আরও দাবি করা হয়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল এবং জনসাধারণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি মহল কাল্পনিক ও মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে।

এরপর রাত ১০টা ৪০ মিনিটে সাংবাদিকদের উদ্দেশে আরেকটি অডিও বার্তা দেন ইশরাক। সেখানেও তিনি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানান।

পদত্যাগের নির্দেশের খবর প্রচার করায় রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) সমালোচনাও করেন ইশরাকের প্রেস কর্মকর্তা। পরে বিটিভি আগের স্ক্রল সরিয়ে ইশরাক পদত্যাগের খবর অস্বীকার করছেন—এমন স্ক্রল প্রচার করে।

মধ্যরাতেও অস্বীকার, সকালে সুরবদল

রোববার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে আরেকটি পোস্ট দেন ইশরাক হোসেন। তাতে তিনি লেখেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে মন্ত্রিপরিষদের যেকোনো সদস্যের প্রতি পদত্যাগ অথবা অন্য যেকোনো নির্দেশ আসার সাথে সাথে সেটি কার্যকর করা প্রথাগতভাবে বাধ্যতামূলক অথবা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা কার্যকর হয়ে যায়।’ ওই পোস্টে তিনি আরও জানান, তাঁর ক্ষেত্রে এমন কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে দ্রুত সংবাদ সম্মেলন করে দেশবাসীকে জানাবেন।

কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরই পরিস্থিতি বদলে যায়। আজ সোমবার সকাল সাড়ে আটটার পর ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে বেলা দুইটায় জাতীয় প্রেসক্লাবে পদত্যাগের চূড়ান্ত ঘোষণা দেবেন বলে জানান তিনি।

এরপর সকাল ৯টা ৮ মিনিটে হোয়াটসঅ্যাপ মিডিয়া গ্রুপে একটি অডিও বার্তা দেন ইশরাক। সেখানে বলেন, ‘বেলা দুইটায় প্রেসক্লাবে একটি প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে আমার যে চূড়ান্ত ঘোষণাটি, যেটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কনভে করেছেন, সেটি আমরা ঘোষণা দেব।’

আগের রাতে যে পদত্যাগের নির্দেশের খবরকে ইশরাক ‘গুজব’ ও ‘উড়োখবর’ বলেছিলেন, পরদিন সকালেই সেই বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পাওয়া সিদ্ধান্ত ঘোষণা দেওয়ার কথা জানান।

পদত্যাগের ঘোষণা

আজ দুপুরে সংবাদ সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চাওয়ার কথা জানান ইশরাক। তবে সেখানে সরাসরি পদত্যাগ করার ঘোষণা দেননি।

সংবাদ সম্মেলন শেষে বেরিয়ে যাচ্ছেন ইশরাক হোসেন

পরে সংবাদ সম্মেলন শেষে প্রেসক্লাব চত্বরে নেতা-কর্মীদের সামনে এসে ইশরাক বলেন, ‘আমি আজকে পদত্যাগ করলাম আমার এই পদ থেকে।’ এ সময় অনুসারীরা স্লোগান দিয়ে তাঁর পদত্যাগের বিরোধিতা করেন।

বেলা তিনটার দিকে প্রেসক্লাব থেকে বেরিয়ে গাড়িতে দাঁড়িয়ে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে স্লোগান দিতে থাকেন ইশরাক। তাঁর গাড়ির সামনে-পেছনে কয়েক শ নেতা-কর্মী ছিলেন।

এ সময় ইশরাক স্লোগান দেন—‘মাদকের আস্তানা, এই বাংলায় হবে না’, ‘মাদকের আস্তানা, ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’।

পরে হাইকোর্ট মোড়, আবদুল গণি রোড ও গুলিস্তান হয়ে গোপীবাগে যান ইশরাক হোসেন।