
ইসলামি বা ইসলামি ভাবধারার সাতটি দল আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। দলগুলোর ৪৪৭ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র নির্বাচন কমিশনের (ইসি) যাচাই-বাছাইয়ে বৈধ বলে বিবেচিত হয়েছে। সাতটি দলের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা ছাড়া দলগুলোর এসব প্রার্থীর জেতার সম্ভাবনা কম।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, জেতার লক্ষ্য নিয়ে নির্বাচন করছেন, সাতটি দলে এমন প্রার্থীর সংখ্যা একেবারেই হাতে গোনা। বেশির ভাগ প্রার্থী নির্বাচন করছেন এলাকায় পরিচিতির জন্য। পাশাপাশি সরকারি মহলের সুনজর পাওয়ার আশায় অনেকে প্রার্থী হয়েছেন। আর যে কয়েকজন প্রতিদ্বন্দ্বিতার চিন্তা থেকে প্রার্থী হয়েছেন, তাঁরাও তাকিয়ে আছেন সরকারের দিকে। কারণ, সরকারের সঙ্গে সমঝোতা ছাড়া তাঁদের জেতার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
যদিও রাজনীতিতে পরিচিত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দল এবারের নির্বাচনে নেই। দলগুলো হলো জামায়াতে ইসলামী এবং কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক দল ইসলামী আন্দোলন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও খেলাফত মজলিস। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এগুলোকে ভোটের হিসাবসহ নানা বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। এগুলোর মধ্যে ইসিতে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন নেই।
এই পাঁচটি দলের নীতিনির্ধারণী নেতারা বলছেন, ধর্মভিত্তিক দল হিসেবে একটি নৈতিক দিক বিবেচনা থেকে তাঁরা এবারের নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁরা মনে করছেন, এই সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো সম্ভাবনা নেই।
খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রথম কথা হচ্ছে, সরকার আমাদের নির্দলীয় সরকারের দাবি মানেনি। দ্বিতীয়ত, আমরা শুধু ইসলামি রাজনীতি করি না, ইসলামও করি। গত ৮-১০ বছরে সরকার যা করেছে, এর পরেও কোনো স্বৈরাচারকে সহায়তা করা অন্যায়। নির্বাচনে না যাওয়ার ক্ষেত্রে এটাও বিবেচনা করেছি।’
দেখা গেছে, ২০১৪ সালের ‘একতরফা’ নির্বাচনও এই পাঁচটি দল বর্জন করেছিল। আবার ২০১৮ সালের নির্বাচনে সব দলের পাশাপাশি তারাও অংশ নিয়েছিল।
ইসিতে নিবন্ধিত ইসলামপন্থী দল ১১টি। এর মধ্যে সাতটি দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। দলগুলো হলো বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন (বটগাছ), ইসলামী ঐক্যজোট (মিনার), বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট (মোমবাতি), ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশ (চেয়ার), জাকের পার্টি (গোলাপ ফুল), বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশন (ফুলের মালা) ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (একতারা)। এর মধ্যে শুধু তরীকত ফেডারেশনের গত দুটি সংসদে প্রতিনিধিত্ব ছিল। এই দলগুলো সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।
তরীকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী এবারও চট্টগ্রাম-২ আসনে প্রার্থী হয়েছেন। সেখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী খাদিজাতুল আনোয়ার। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও ফটিকছড়ি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবু তৈয়বও এই আসনে প্রার্থী হয়েছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের চেয়ারম্যান এম এ মতিন ও নজিবুল বশরের ভাইয়ের ছেলে সুপ্রিম পার্টির প্রধান সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদও এই আসনে প্রার্থী।
সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, কিছু নির্দিষ্ট এলাকা ছাড়া নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলোর খুব একটা প্রভাব নেই। অতীতে এসব দল থেকে সংসদ সদস্য হওয়ারও নজির কম।
দলগুলোর বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচনে অংশ নিলেও দলগুলোর নেতাদের প্রায় সবাই এখনো হতাশ। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে শুরু করে নানা মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করে চললেও এখন পর্যন্ত কারও সঙ্গে আসন–সমঝোতা হয়নি।
ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশের (চেয়ার) চেয়ারম্যান সৈয়দ বাহাদুর শাহ মোজাদ্দেদী প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখনো সমঝোতা হয়নি। আশা রাখি কিছু একটা হবে। বাকি আল্লাহর ইচ্ছা।’
ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশের ৩৯ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে। বাহাদুর শাহ মোজাদ্দেদী চাঁদপুর-৫ আসনে নির্বাচন করবেন। এ ছাড়া ইসলামী ঐক্যজোটের ৪৩ জন, খেলাফত আন্দোলনের ৯ জন, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের ৩৬ জন, তরীকত ফেডারেশনের ৪১ জন, জাকের পার্টির ২০৮ জন, সুপ্রিম পার্টির ৭১ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে।
প্রয়াত মুফতি ফজলুল হক আমিনীর প্রতিষ্ঠিত ইসলামী ঐক্যজোটের প্রধান দুই নেতা আবুল হাসানাত আমিনী ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ ও আলতাফ হোসাইন কুমিল্লা-২ আসনে প্রার্থী হয়েছেন। হাসানাত আমিনী নিজে গিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেননি। এখন পর্যন্ত তিনি নির্বাচনী এলাকায় যাননি। নির্বাচনের কাজ ‘ঢিলেঢালাভাবে’ চলছে বলে জানান আলতাফ হোসাইন।
১৪টি আসনে প্রার্থী দিলেও শেষ পর্যন্ত ৯টিতে মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে খেলাফত আন্দোলনের। দলের আমির আতাউল্লাহ হাফেজ্জী প্রার্থী হয়েছেন নিজের কামরাঙ্গীরচর এলাকার বাইরে মুন্সিগঞ্জ-১ আসনে। এই এলাকায় তাঁর কিছু মুরিদ ও আত্মীয়স্বজন আছেন বলে জানান খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব হাবিবুল্লাহ মিয়াজী।
খেলাফত আন্দোলন প্রয়াত মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর প্রতিষ্ঠিত দল। তাঁর ছেলে আতাউল্লাহ হাফেজ্জী এই দলের আমির এবং আমিরের ভাতিজা হাবিবুল্লাহ মিয়াজী দলের মহাসচিব। দলটি ধর্মভিত্তিক পাঁচদলীয় জোট ‘সমমনা ইসলামি দলসমূহ’–এর শরিক ছিল।
খেলাফত আন্দোলন এই জোটের একমাত্র ইসলামি দল, যারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।
এ বিষয়ে হাবিবুল্লাহ মিয়াজী বলেন, ‘আমরা সব সময় নির্বাচন করি। নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় মানুষ নানা নেতিবাচক কথাবার্তা বলছে। আবার উল্টো দিকও আছে।’