
জাতীয় সংসদকে সরকারি ও বিরোধী দল—এ দুই ‘টায়ারের’ ওপর চলা একটি যানবাহনের সঙ্গে তুলনা করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, বিরোধী দলকে দুর্বল করার চেষ্টা না করে পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে অতীতের সংসদীয় ‘ব্যাড কালচার’, ব্যক্তিপূজা ও চরিত্রহননের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
আজ সোমবার সকালে জাতীয় সংসদে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দলের নেতা এ আহ্বান জানান। সকাল সাড়ে ১০টায় স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়।
প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর বিরোধী দলের নেতা সমাপনী বক্তব্য দেন। বাজেট আলোচনায় অংশ নেওয়া সব সদস্যকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই সংসদেরও দুইটা টায়ার। একটা সরকারি দল, আরেকটা বিরোধী দল। যেকোনো একটা টায়ার অকেজো হয়ে গেলে যান চলবে না। এক টায়ারে আপনি পিন লাগাবেন, পেরেক মারবেন, তাহলে কিন্তু ওই টায়ারটা ফুটো হয়ে যাবে। ওইটা ফুটো হয়ে গেলে ওই টায়ার (দ্বিতীয়ট) চলবে না।’
বিরোধী দলকে দুর্বল করার প্রবণতার সমালোচনা করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘একটা চমৎকার টেন্ডেন্সি আমরা লক্ষ করছি, প্রায় সকলেই কুচি কুচি করে কাটার পরে বলেন, এগুলা ছাড়েন, আমাদের সঙ্গে চলে আসেন। আমরা ওই কুচি কুচি করার জন্য আসি নাই।’
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এর অর্থ এই নয় যে সরকারি দল যা চাইবে, বিরোধী দল সেটাই সমর্থন করবে; আবার বিরোধিতার খাতিরে সবকিছুর বিরোধিতাও করা উচিত নয়। তিনি বলেন, ‘সরকারি দলকেও বিরোধী দলকে সম্মান করার মানসিকতা থাকতে হবে, আর বিরোধী দলেরও সংগত সব বিষয়ে সরকারকে সহযোগিতা করার মানসিকতা থাকতে হবে।’
জামায়াতের আমির অতীতের সংসদীয় চর্চার সমালোচনা করে বলেন, ‘অতীতের সংসদে দায়িত্বরত ব্যক্তিকে তোষামোদ করার জন্য গান হয়েছে, কবিতা হয়েছে, স্বপ্নবিলাস হয়েছে। জনগণের ট্যাক্সের টাকা খরচ করে এই সংসদে এটা দেওয়া উচিত নয়। এটা তোষামোদের জায়গা নয়, এটা দায়িত্ব পালনের জায়গা।’
স্পিকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিরোধী দলের নেতা বলেন, ‘অতীতের ব্যাড কালচারকে আমরা “না” বলি। বিশেষ করে এই সংসদে চরিত্রহননের কোনো কাজ যেন না হয়।’
বিরোধী দলের নেতা কওমি মাদ্রাসার জন্য বাজেটে বরাদ্দ, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দ্রুত ফিরিয়ে আনা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে কাঠামোগত সংস্কার এবং প্রবাসীদের সমস্যার সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিয়মিত মূল্যায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
জামায়াতের আমির বলেন, কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাও রাষ্ট্রের নাগরিক। তাই তাদেরও রাষ্ট্রীয় সুবিধা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তিনি কওমি মাদ্রাসাগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ন রেখেই সহায়তার ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেন।
একই সঙ্গে ইবতেদায়ি মাদ্রাসা ও দীর্ঘদিন ধরে এমপিওভুক্তির অপেক্ষায় থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়েও সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন জামায়াত আমির। নিরপেক্ষ যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর ঝুলিয়ে না রাখার আহ্বান জানান তিনি।
উচ্চশিক্ষা নিয়ে বিরোধী দলের নেতা বলেন, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় যদি রিসার্চবেজড না হয়, তাহলে চিরজীবন আমরা আমদানিনির্ভরই থেকে যাব।’ গবেষণার জন্য বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে অন্তত কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়ারও প্রস্তাব করেন তিনি।
পার্বত্য অঞ্চলের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের বৈষম্যের কথা তুলে ধরে জামায়াতের আমির বলেন, এসব মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করা গেলে সেখানে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা সহজ হবে।
স্বাস্থ্য খাতের প্রসঙ্গে বিরোধী দলের নেতা বলেন, নতুন অবকাঠামো নির্মাণের আগে বিদ্যমান হাসপাতালগুলোর জনবল, সরঞ্জাম ও সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের ক্ষেত্রে একই ধরনের তদারকি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি বেশি হলেও সরকারি প্রতিষ্ঠানে একই মানদণ্ড প্রয়োগ হয় না।
বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে শফিকুর রহমান বলেন, প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক, তবে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম যেন ব্যাহত না হয়।
বাজেটে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা না থাকায় হতাশা প্রকাশ করেন বিরোধী দলের নেতা। তিনি বলেন, ‘গত সাড়ে ১৫ বছরে যে ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে, ওই পাচারকৃত অর্থের নয় ভাগের এক ভাগও যদি আগামী অর্থবছরে ফিরিয়ে আনা যায়, তাহলে আমাদের কোনো বাজেট–ঘাটতি থাকবে না।’
এ প্রসঙ্গে জামায়াতের আমির আরও বলেন, ‘সম্পদের সঙ্গে কালপ্রিটদেরও ফিরিয়ে আনতে হবে। সম্পদ এল, আর কালপ্রিটরা থেকে গেল, তাহলে সঠিক শিক্ষা হবে না।’ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সমঝোতা করে দ্রুততম সময়ে অর্থ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
রাজস্ব আদায়ের বিষয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ব্যবসায়ীদের ওপর অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদায়ের চাপ কমাতে হবে। তাঁর ভাষায়, ‘ট্যাক্স শুধু একটাই হবে, দ্বিতীয়টা আর তৃতীয়টা থাকবে না। তাহলে ব্যবসায়ীরা আরও বেশি ট্যাক্স দিতে আগ্রহী হবে।’
প্রবাসী শ্রমিকদের সমস্যা তুলে ধরে বিরোধী দলের নেতা সংসদের অধীন একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দেন। মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, যেখানে ৮৫ হাজার টাকায় যাওয়ার কথা, সেখানে শ্রমিকদের কাছ থেকে ৬–৭ লাখ টাকা নেওয়া হচ্ছে। এই সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে জামায়াতের আমির অতীতে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদেরও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে বিচার কার্যক্রমের গতি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘কালপ্রিটদের—যত বড়ই হোক—বিচারের আওতায় আনতে হবে।’
বাজেট বাস্তবায়নে নিয়মিত মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন বিরোধী দলের নেতা। তিনি বলেন, প্রতি তিন বা চার মাস অন্তর বাস্তবায়ন অগ্রগতি সংসদে উপস্থাপন করা উচিত। পাশাপাশি অর্থবছর জুলাই-জুনের পরিবর্তে জানুয়ারি-ডিসেম্বর করারও প্রস্তাব দেন।
বক্তব্যের শেষ দিকে শফিকুর রহমান সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের চার লেন প্রকল্প দ্রুত শেষ করা, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান, ভোলা সেতু নির্মাণ এবং প্রধান নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে চীনের সহযোগিতায় নেওয়া মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা নামের কাঙাল নই, আমরা কাজের কাঙাল। কাজটাই দেখতে চাই।’
সবশেষে বিরোধীদলীয় নেতা স্পিকারকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘ধন্যবাদ মাননীয় স্পিকার, কোনো ভুল হলে আমাকে ক্ষমা করবেন। প্রিয় দেশ এগিয়ে যাক। বাংলাদেশকে নিয়ে আমরা এগিয়ে যাই। যুবকদের স্বপ্নের বাংলাদেশ উপহার দিই এবং আমরা অতীতের গ্লানি থেকে বের হয়ে আসি।’