
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিদের শক্তিশালী না করে শুধু সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের ওপর নির্ভর করলে স্থানীয় সরকার কখনোই কার্যকর হবে না।
আজ বুধবার বিকেলে রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (আইডিইবি) মুক্তিযোদ্ধা হল মিলনায়তনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মির্জা ফখরুল ইসলাম এ কথা বলেন। ‘স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে তৃণমূল জনপ্রতিনিধি, ইউপি চেয়ারম্যান–মেম্বারদের করণীয়’ শীর্ষক এ আলোচনা সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মেম্বার অ্যাসোসিয়েশন।
স্থানীয় সরকার রাষ্ট্র ও গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, একটি দেশের স্থানীয় সরকার যত শক্তিশালী হয়, সেই দেশের গণতন্ত্রও তত শক্তিশালী হয়। কিন্তু স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশে স্থানীয় সরকারকে প্রত্যাশিতভাবে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে স্থানীয় সরকারই বিচার, স্বাস্থ্যসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ সেবা পরিচালনায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশেও স্থানীয় সরকারকে আরও ক্ষমতায়ন করা প্রয়োজন।
জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বরখাস্ত করার প্রচলিত ব্যবস্থার সমালোচনা করেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত কোনো জনপ্রতিনিধিকে চাইলেই বরখাস্ত করা উচিত নয়। আগে প্রমাণ করতে হবে তিনি কোনো অপরাধ, অনিয়ম বা আইনভঙ্গ করেছেন কি না। শুধু তখনই তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
জনপ্রতিনিধিদের সহজে যাতে বরখাস্ত করা না যায়, এমন আইনগত ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে জানিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি, যাতে সেই আইনটিকে ঠিকমতো আনতে পারি; যাতে সহজেই আপনাদের জনপ্রতিনিধিদের বরখাস্ত করা না যায়।’
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, অতীতে বিরোধী মতের জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রবণতা ছিল। এখনো বিভিন্ন চেয়ারম্যানকে বরখাস্তের জন্য ফাইল তাঁর কাছে আসে। তবে জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের ভাতার বিষয়েও কথা বলেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী। তিনি স্বীকার করেন, তাঁদের বর্তমান ভাতা খুবই কম এবং তা দায়িত্বের তুলনায় যথেষ্ট নয়। নিজে একসময় পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তৃণমূল জনপ্রতিনিধিদের সমস্যা তিনি ভালোভাবে বোঝেন। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে ভাতাকে আরও সম্মানজনক পর্যায়ে নেওয়ার চেষ্টা করবেন বলে আশ্বাস দেন তিনি।
সরকারি বরাদ্দ ও ত্রাণ বিতরণে স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দরিদ্র মানুষের প্রাপ্য অধিকার যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। কয়েকজনের অনিয়মের কারণে জনপ্রতিনিধিদের সামগ্রিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়া উচিত নয়।
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা ও উপকারভোগী বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততা বাড়ানো প্রয়োজন। কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে চেয়ারম্যান ও সদস্যদের ভূমিকা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
দেশের ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রসঙ্গ টেনে মির্জা ফখরুল বলেন, ধর্মের নামে বিভাজনের রাজনীতি দেশের জন্য কল্যাণকর নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের পাশাপাশি অন্য ধর্মাবলম্বীদেরও সমান মর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’—এই নীতিতে বিশ্বাস রেখে সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে অনুষ্ঠিতব্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে। কোনো রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে কেউ বাড়তি সুবিধা পাবেন না। জনগণের ভালোবাসা ও ভোটের মাধ্যমেই চেয়ারম্যান, সদস্য ও সংরক্ষিত নারী সদস্যদের নির্বাচিত হতে হবে। নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের একটি জাতীয় সংগঠন গঠনেরও পরামর্শ দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন বলেন, ত্রাণ কার্যক্রম আরও কার্যকর ও সময়োপযোগী করতে বরাদ্দ প্রদানের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে স্থানীয় পর্যায়ের চাহিদার তালিকা আগেভাগে সংগ্রহ করে সেপ্টেম্বরের মধ্যেই প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শুকনা মৌসুমে উন্নয়ন ও ত্রাণসংক্রান্ত কাজ নির্বিঘ্নে বাস্তবায়ন করা যায়। এ সময় তিনি মাঠপর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন।
বাংলাদেশ ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মেম্বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. পয়গাম আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।