ঢাকা–১৬ আসনে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন দুই প্রার্থী আমিনুল হক (বাঁয়ে) এবং আব্দুল বাতেন।
ঢাকা–১৬ আসনে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন দুই প্রার্থী আমিনুল হক (বাঁয়ে) এবং আব্দুল বাতেন।

ঢাকা-১৬ আসন

জোটবন্ধন ছেঁড়ার পর ধন্দে পড়া ভোটারে এখন চোখ দুই প্রার্থীর

দুই যুগ ধরে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীকে যাঁরা ভোট দিয়ে আসছিলেন, তাঁদের একটি অংশ এখন নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি। সহযোগী দল দুটি এবার ভোটের মাঠে প্রতিযোগী। ফলে তাদের ভোটারদের একটি অংশ ধন্দে পড়েছেন যে কাকে ভোট দেবেন। এই ভোটারদের ভোট নিজের বাক্সে আনতে ব্যস্ত এখন দুই দলই।

ঢাকা-১৬ আসনে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের প্রচার দলে যাঁরা আছেন, দুই পক্ষই এখন দ্বিধান্বিত, এই ভোটারদের নিজেদের পক্ষে টানাকেই বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন। এ কারণে তাঁরা জনসভা, পথসভার চেয়ে ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট চাওয়াকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এটি শুধু রাজধানীর পল্লবী-রূপনগর থানা এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৬ আসনের নয়, অন্য আসনগুলোর চিত্রও একই।

বিএনপি ও জামায়াত এর আগে আলাদাভাবে নির্বাচন করেছিল ১৯৯৬ সালে সপ্তম সংসদ নির্বাচনে। এরপর চারদলীয় জোট গঠনের পর একসঙ্গেই নির্বাচন করে আসছিল দল দুটি। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন হারানোর পর ২০১৮ সালের নির্বাচনে জামায়াতের নেতারা বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়েই ভোটের লড়াইয়ে নেমেছিলেন।

জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা এবং নিবন্ধন স্থগিত থাকায় আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারছে না ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে। আর এই সময়ে বিএনপি-জামায়াত জোটের ভোটাররা দল দুটিকে দেখছেন প্রতিদ্বন্দ্বীর ভূমিকায়। ভোটের মাঠে আলাদাভাবে নামার পাশাপাশি পরস্পরকে নিয়ে দল দুটির নেতাদের বিষোদ্‌গারও দেখতে হচ্ছে তাঁদের ভোটারদের।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এর ফলে যাঁরা বিএনপি-জামায়াত জোটকে ভোট দিতেন, তাঁদের একটি অংশ এখন দ্বিধায়। ফলে এসব ভোটারের জন্য আলাদা সময় ও মনোযোগ দিতে হচ্ছে প্রার্থীদের। সে কারণে প্রচারণায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ‘ডোর টু ডোর’ গণসংযোগ।

নির্বাচনী প্রচারে ঢাকা–১৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী আমিনুল হক

প্রথম আলোর পাঁচজন প্রতিবেদক ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেছেন, মূল প্রতিদ্বন্দ্বী দুই জোটের প্রার্থীরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভোটারদের বাসায় গিয়ে ভোট চাইছেন। পথসভা, জনসভার চেয়ে ভোটারদের বাড়ি গিয়ে সরাসরি যোগাযোগকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন উভয় জোটের প্রার্থীরা।

গত সোমবার বেলা ১১টা থেকে ২টা পর্যন্ত ঢাকা-১৬ আসনের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিএনপির প্রার্থী আমিনুল হক এবং জামায়াতের প্রার্থী আব্দুল বাতেন ভোটারদের বাড়ি বাড়ি ঘুরছেন। এর মধ্যে আমিনুল হককে মিরপুর-১২ নম্বরের সি ও ডি ব্লক এলাকায় প্রচারণায় অংশ নিতে দেখা গেছে। আব্দুল বাতেন প্রচার চালান কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকায়।

দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী আব্দুল বাতেনের নির্বাচনী প্রচার সেলের একজন প্রথম আলোকে বলেন, এবার মাঠে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রচারণার শুরুতে (২১ থেকে ২৫ জানুয়ারি) তাঁরা উঠান বৈঠককে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তবে এখন তাঁরা ভোটারদের ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট চাওয়ার প্রতি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এর মূল কারণ হচ্ছে, দ্বিধান্বিত ভোটারদের পক্ষে টানা।

ধানের শীষ প্রতীকের বিএনপির প্রার্থী আমিনুল ইসলামের নির্বাচনী প্রচার সেলে দায়িত্বরত ব্যক্তিরাও একই কথা বলেন। সেলের সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য ইব্রাহিম খলিল প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা শুরু থেকেই ‘ডোর টু ডোর’ প্রচারণায় গুরুত্ব দিচ্ছেন।

আবার আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে দলটির সমর্থকদের ভোটও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিএনপি ও জামায়াত—উভয় দলের প্রার্থীরাই এই ভোটারদের পক্ষে টানার চেষ্টা করছেন। কারণ, এই ভোটারদের যত বেশি দলে টানা যাবে, জয়ের সম্ভাবনাও তত বাড়বে।

প্রার্থীদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

১৯৯৯ সালে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায়, তখন গঠিত হয়েছিল চারদলীয় জোট। ২০০১ সালের নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করেছিল তারা। জোট সরকারে জামায়াতের শীর্ষ দুই নেতা মন্ত্রীও হয়েছিলেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনেও জোটগতভাবে অংশ নেয় দল দুটি। ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জনের পর ২০১৮ সালে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গড়ে অংশ নিয়েছিল বিএনপি। তখন জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় ওই নির্বাচনে দলটির নেতারা বিএনপির প্রতীক ধানের শীষে অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু এখন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমে এক পক্ষ অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলছে।

নির্বাচনী জনসভায় জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আব্দুল বাতেন

মিরপুর-১২ নম্বরের ডি ব্লকে প্রচার চালানোর সময় বিএনপির প্রার্থী আমিনুল হক জামায়াতের নাম ধরেই অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, একটি দল জামায়াত, তারা ক্ষমতার মোহে পড়ে, ক্ষমতার লোভে, মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে বিকাশে নম্বর নিচ্ছে। ঘরে ঘরে গিয়ে টাকা দেওয়ার চেষ্টা করছে। এই বিষয়গুলো নেতা-কর্মীদের চোখে পড়েছে।

জামায়াতের প্রার্থী আব্দুল বাতেনও কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্পে প্রচার চালানোর সময় বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, বিএনপির প্রার্থী মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন থেকে শুরু বিভিন্ন মানুষকে খামে করে টাকা দিচ্ছেন।

ভোটাররা চান সমস্যার সমাধান

দুই পক্ষের প্রার্থীরা যখন পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগমুখর, তখন স্থানীয় লোকজন চাইছেন তাঁদের এলাকার সমস্যা সমাধান।

পল্লবীর কালশী বিহারি ক্যাম্পে গিয়ে কথা হয় সেখানকার বাসিন্দা মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের সঙ্গে। তিনি বিহারি ক্যাম্পের নানা সমস্যার কথা বলেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মাদকের আধিপত্য। এই মাদকের সঙ্গে প্রশাসন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলের অনেক নেতাও জড়িত।

মাদক নির্মূলের প্রতিশ্রুতি প্রার্থীরা দিচ্ছেন। তবে কোনো প্রার্থীই এই সমস্যাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে না জাহাঙ্গীরের। তিনি বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াত বুঝি না, যে সমস্যার সমাধান করতে উদ্যোগী হবে, তাকেই আমরা ভোট দেব।’

জাহাঙ্গীরের পাশাপাশি কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্পের আরও ছয় বাসিন্দার সঙ্গে কথা হয়েছে এই প্রতিবেদকের। তাঁরা মোটাদাগে বলেছেন, তাঁদের কাজের অভাব রয়েছে। শিক্ষার সুযোগও কম। বিদ্যুৎ ও পানি নিয়ে চাঁদাবাজি আছে। এসব বন্ধে প্রতিশ্রুতি চান তাঁরা।

মিরপুর-১২ নম্বরের ডি ব্লকের মুসলিম বাজার ঢাল এলাকার বাসিন্দা আবদুর রহমান বলেছেন, এলাকার অন্যতম প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সমস্যাও প্রকট। এসব সমস্যার সমাধান করার কথা বলেন তিনি।