
সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে জাতীয় সংসদ। আজ সোমবার রাতে সংসদে এ কমিটি গঠন করা হয়। তবে কমিটি গঠনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে বিরোধী দল।
সংসদ নেতা তারেক রহমানের পক্ষে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। এ কমিটি ১৭ সদস্যের হওয়ার কথা ছিল। এতে পাঁচজনের নাম দিতে বিরোধী দলকে অনুরোধ করা হয়েছিল। তবে বিরোধী দল কারও নাম দেয়নি। তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবিতে অনড় রয়েছে।
চিফ হুইপ সংসদকে জানান, বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা করা হলেও তাঁরা কোনো সদস্যের নাম দেননি। তাই আপাতত পাঁচটি পদ শূন্য রেখে ১২ সদস্যের কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হচ্ছে। পরে বিরোধী দল নাম দিলে তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করে কমিটি পুনর্গঠন করা হবে।
বিশেষ কমিটিতে সভাপতি করা হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে। কমিটির সদস্যরা হলেন—বিএনপির সংসদ চিফ হুইপ সদস্য নুরুল ইসলাম, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদিন, মীর হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমিন, শাকিলা ফারজানা, মাহমুদুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের সংসদ সদস্য জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ, গণঅধিকার পরিষদের সংসদ সদস্য নুরুল হক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সংসদ সদস্য মো. অলিউল্লাহ।
চিফ হুইপ এই প্রস্তাবটি করার পর বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, এ বিষয়টা সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকেই চলে আসছে। প্রথম অধিবেশনেই এ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সে দিনই বিরোধী দল অবস্থান স্পষ্ট করেছে।
চিফ হুইপ একাধিকবার যোগাযোগ করেছেন উল্লেখ করে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, তাঁরা কখনোই বলেননি এ কমিটিতে নাম দেবেন। তাঁরা জাতির কাছে ওয়াদাবদ্ধ। গণভোটের রায় বাস্তবায়নে তাঁরা সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দুটি শপথ নিয়েছেন।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘ওইটাকে যদি বাইপাস করার জন্য এই কমিটি গঠন করা হয় তাহলে আমরা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছি। আমরা আমাদের আগের অবস্থানেই আছি।’
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন,‘ জনগণের অভিপ্রায় ও মতামতকে কোনোভাবেই অগ্রাহ্য বা অপমান করা উচিত নয়। এ জন্য তাদের প্রতি সম্মান রেখেই আমরা শুধু এই কমিটিতে অংশগ্রহণ করবো না এটাই নয়; বরঞ্চ এই পর্বটা আমরা যেহেতু জনগণের রায়কে সম্মান করা হচ্ছে না তার প্রতিবাদে ওয়াক আউট করছি।’
এরপর বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা অধিবেশনকক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। তাঁদের অনুপস্থিতিতে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাবটি সংসদে পাস হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাব
বিরোধী দলীয় নেতার বক্তব্যের পর ফ্লোর নেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল এ সময় বিরোধী দলকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শোনার অনুরোধ জানান। তবে তাঁরা সংসদ কক্ষ থেকে বের হয়ে যান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিরোধী দলের অবস্থান তাদের রাজনৈতিক বিবেচনা হতে পারে, তবে বর্তমান সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই প্রয়োজনীয় সংশোধন আনতে হবে। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হয়েছে, জাতীয় সংসদ গঠিত হয়েছে, রাষ্ট্রপতির ভাষণ হয়েছে এবং সেই ভাষণের ওপর সরকার ও বিরোধী দল আলোচনা করেছে। তাই বর্তমান সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
বিরোধী দলের দুটি শপথের প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অবৈধ, এটি কালারেবল লেজিসলেশন। তিনি বলেন, আগে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধানে যদি সংস্কার পরিষদের বিধান যুক্ত হয়, তখন সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হলেও সংবিধান সংশোধন করতে হবে। আর সেই আলোচনার উপযুক্ত স্থান সংসদের সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটি বিচার বিভাগ, আইনজীবী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বুদ্ধিজীবী, সংবাদপত্রের সম্পাদক, বিভিন্ন অংশীজন এবং জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবে। সংসদেও এ বিষয়ে আলোচনা হবে। পরে তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে সংবিধানের ১৮তম সংশোধনী বিল সংসদে উত্থাপন করা হবে।
বিরোধের পটভূমি
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করেছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সনদের ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধান-সম্পর্কিত। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে। দলটি নিজেদের ভিন্নমতের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের পক্ষে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিরোধী জোট সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে জুলাই সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো হুবহু বাস্তবায়নের পক্ষে। তারা এটিকে সাধারণ সংবিধান সংশোধন নয়, ‘সংবিধান সংস্কার’ হিসেবে দেখছে।
জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত ৪৮টি প্রস্তাব বাস্তবায়নের প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবগুলোতে বিএনপির দেওয়া ভিন্নমত গুরুত্ব পায়নি। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় জাতীয় সংসদের নিয়মিত কাজের পাশাপাশি সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও কাজ করার কথা।
তবে বিএনপি ও তাদের জোট থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় পরিষদ গঠিত হয়নি। বিরোধী দলের সদস্যরা এ শপথ নিয়েছিলেন।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকার নির্ধারিত সময় গত ১৫ মার্চ শেষ হয়েছে।