সংসদ অধিবেশন থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন বিরোধী দলের সদস্যরা। গত বৃহস্পতিবার রাতে
সংসদ অধিবেশন থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন বিরোধী দলের সদস্যরা। গত বৃহস্পতিবার রাতে

সংসদে ও রাজপথে কী কৌশলে এগোবে বিরোধী দল

সংস্কার বাস্তবায়নের দাবির পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মতো সরাসরি জনসম্পৃক্ত বিষয়গুলোতে সংসদে আক্রমণাত্মক থাকার কৌশল নিয়েছে বিরোধী দল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের শুরুর দিনেই সে আভাস মিলেছে। পাশাপাশি রাজপথে সরব থেকে ধীরে ধীরে বড় আন্দোলনের দিকে যেতে চায় জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য।

বিরোধীদলীয় সূত্র জানায়, চলমান সংকট পরিস্থিতি নিয়ে সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকার অনুরোধ করেছিল বিরোধী দল। সেটা না হওয়ায় তারা চলতি অধিবেশনেই প্রশ্নোত্তর পর্বসহ বিভিন্নভাবে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার-সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মতো বিষয়গুলো সামনে আনতে চায়। এর অংশ হিসেবে গত বৃহস্পতিবার চলতি অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে একাধিক প্রশ্ন করে। এমন একটি প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের জবাবকে ঘিরে হইচই-হট্টগোলে প্রায় ১০ মিনিট সংসদের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়।

বিরোধী দলের এমন প্রতিক্রিয়াকে পূর্বপরিকল্পিত বলে মনে করছে সরকার দল-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। তারা মনে করছে, বিরোধী দল সালাহউদ্দিন আহমদকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। সেটার অংশ হিসেবেই বৃহস্পতিবার এমন প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।

তবে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা ও বিরোধী দলীয় দুজন সংসদ সদস্য দাবি করেন, তাঁরা গত বৃহস্পতিবার পরিকল্পনা করে সালাহউদ্দিন আহমদের বিরোধিতা করেনি। তাঁর বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিরোধীদলীয় এই দুই সংসদ সদস্য বলেন, সামনের দিনগুলোতে সরকারের কেউ জনবিরোধী বক্তব্য দিলে বিরোধী দল ছেড়ে কথা বলবে না। দুর্নীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে সংসদে বিরোধী দলের বক্তব্য ও প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে।

অবশ্য বিরোধীদলীয় সূত্রগুলো বলছে, তারা সরকারের ছয় মাসের কর্মকাণ্ডে দেখা দেওয়া দুর্বলতা ও জনজীবনের বিভিন্ন সংকটকে রাজনৈতিক ইস্যু বা আন্দোলনের দাবিতে পরিণত করে ধাপে ধাপে বড় আন্দোলনের দিকে যেতে চায়। এ জন্য গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও জুলাই গণহত্যার বিচারের দাবির সঙ্গে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার-সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মতো বিষয়গুলো যুক্ত করেছে তারা।

আগামী ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচির নতুন পর্ব শুরু করতে চায় জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য। বিরোধীদলীয় এই জোটের নেতাদের ধারণা, সময়ের সঙ্গে সরকারের দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হলে এসব ইস্যুতে জন-অসন্তোষ বাড়তে পারে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে জনমত গঠন, মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সক্রিয় করা এবং পর্যায়ক্রমে বৃহত্তর আন্দোলনের প্রস্তুতি নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের। পাশাপাশি জাতীয় সংসদেও আরও সোচ্চার ভূমিকা রাখতে চান তাঁরা।

১১-দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, লংমার্চের রাজনৈতিক বার্তা হলো সংস্কার ও বিচার বাস্তবায়নের দাবিতে সোচ্চার থাকা। পাশাপাশি জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোও তাঁরা গুরুত্ব দিচ্ছেন। এ কারণে অনেক রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবী সংগঠন তাঁদের কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

৬ দাবিতে লংমার্চ, গুরুত্ব সংস্কার ও বিচারে

১১-দলীয় ঐক্যের প্রধান দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির নেতারা জানিয়েছেন, লংমার্চে ছয়টি প্রধান দাবি তুলে ধরা হবে। এগুলো হলো গণভোটের রায় বাস্তবায়ন; জুলাই গণহত্যার বিচার; বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার-সংকট নিরসন; নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ; অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা।

অর্থাৎ লংমার্চে একদিকে থাকবে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের দাবি, অন্যদিকে থাকবে জনজীবনের সংকট। জোটের নেতারা মনে করছেন, দুই ধরনের ইস্যু একসঙ্গে সামনে আনতে পারলে কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানো সম্ভব হবে।

জামায়াতের সূত্র জানায়, রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যার বিচারের দাবিকে ১১-দলীয় ঐক্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। লংমার্চেও এসব দাবি প্রাধান্য পাবে। পাশাপাশি অন্য দাবিগুলো নিয়েও সোচ্চার থাকবে বিরোধী জোট।

গত ২৫ আগস্ট এক অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, নির্বাচনে বড় বিজয়ের পর সরকার গণভোটের রায়ের বিষয়টি ভুলে গেছে। তাঁর দাবি, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ কার্যকর পরিবর্তনের আশায় গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন। সেই রায় বাস্তবায়নের দাবিতে ১১ দল আন্দোলন করছে। সংসদের ভেতরে বিষয়টির সমাধান চাইলেও সরকার তাঁদের রাজপথে যেতে বাধ্য করেছে।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তিনি ২৩ আগস্ট এক ব্রিফিংয়ে বলেন, গণভোটের রায় কার্যকরের ক্ষেত্রে ১১-দলীয় ঐক্য ‘তিল পরিমাণ ছাড়’ দেবে না। সংসদে এর নিষ্পত্তি হলে ভালো, না হলে তাঁরা রাজপথে থাকবেন।

বিরোধী দলের নেতাদের মতে, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হবে। ভবিষ্যতে কোনো সরকার যাতে এককভাবে সব সিদ্ধান্ত নিতে না পারে, সে জন্যও বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন তাঁরা। ফলে এই দাবিকে বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে সামনে আনতে চান তাঁরা।

চার বিভাগে লংমার্চ, শেষে ঢাকায় মহাসমাবেশ

৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চের মধ্য দিয়ে ১১ দলের ধারাবাহিক কর্মসূচি শুরু হচ্ছে। এরপর ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর, ৩১ অক্টোবর খুলনা এবং ২১ নভেম্বর সিলেট অভিমুখে লংমার্চ করবে তারা।

জামায়াতের সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে চার বিভাগে লংমার্চের ঘোষণা দেওয়া হলেও এই সংখ্যা বাড়তে পারে। এসব কর্মসূচির শেষে ঢাকায় মহাসমাবেশ করবে ১১-দলীয় ঐক্য। লংমার্চে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান, এলডিপির অলি আহমদ, এনসিপির নাহিদ ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মামুনুল হকসহ ১১ দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত থাকবেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ৫ সেপ্টেম্বর সকাল সাতটায় রাজধানীর শাপলা চত্বরে সমাবেশের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ শুরু হবে। এরপর সমাবেশ হবে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর, কুমিল্লার পদুয়ার বাজার, ফেনীর মহিপাল ও চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে। রাতে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে সমাবেশের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শেষ হবে।

ধাপে ধাপে বড় আন্দোলনের পরিকল্পনা

বিরোধীদলীয় জোটের নেতারা মনে করেন, সরকার ছয় মাসের কর্মকাণ্ডে জনপ্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সারের সংকট, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, দ্রব্যমূল্যের চাপ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে। জনজীবনের এসব সমস্যাকে সরকারের রাজনৈতিক ব্যর্থতার সঙ্গে যুক্ত করে দেখাতে চাইছেন তাঁরা। এ জন্য নির্বাচনের পর থেকে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে মাঠে থাকার পাশাপাশি এবার লংমার্চের মতো বড় কর্মসূচিতে যাচ্ছে ১১-দলীয় ঐক্য।

জোটের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ জনজীবনসংশ্লিষ্ট বেশ কিছু দাবিতে তাঁরা কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। এ কারণে লংমার্চকে তাঁরা গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাঁর ভাষ্য, সরকারের কাছ থেকে জনগণের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ হয়নি। এ কারণে লংমার্চে ব্যাপক জনসমর্থন পাওয়ার আশা করছেন।