জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচারের পাশাপাশি দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের জন্য তদন্ত শুরু হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থান ও গণহত্যার বিচার সম্পর্কে’ এক আলোচনায় এ বিষয়গুলো উঠে আসে।
এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ৬৮ বিধি অনুসারে এ বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য নোটিশ দেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান, প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক এবং বিরোধী দলের পক্ষে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, আখতার হোসেন, মীর আহমাদ বিন কাসেম ও রোকেয়া বেগম আলোচনায় অংশ নেন।
বিরোধী দলের সদস্যদের কেউ কেউ জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারের গতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। জুলাই যোদ্ধাদের সুবিধা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা, গণভোটের রায় বাস্তবায়নেরও দাবি জানান কেউ কেউ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ প্রথমে আওয়ামী লীগকে দল হিসেবে বিচারের জন্য আইন করেনি। পরে আন্দোলন করে সেটা আদায় করতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সর্বপ্রথম আওয়ামী লীগের বিচার দাবি করছি আমরা। আমি সর্বপ্রথম দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার করার জন্য দাবি তুলেছিলাম।’
বিরোধী দলের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গণভোটের গণরায়কে শ্রদ্ধা জানাতে হলে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে আসতে হবে। সেখানে আলোচনা করতে হবে। কিন্তু আপনারা ওয়াকআউট করলেন। সংবিধান সংশোধনী কমিটিতে থাকতে চাইলেন না। সেটা ইতিহাস হয়ে থাকল।
জুলাই স্মৃতি জাদুঘর ৫ আগস্ট খুলে দেওয়া হবে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী সেটা উদ্বোধন করবেন। কোনো আহত জুলাই যোদ্ধার যদি বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়ে থাকে, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাঁদের সে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সীমান্ত নিয়ে বিরোধী দলের বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা একজনও অবৈধভাবে পুশ ইন হতে দিইনি। আমরা সার্বভৌমত্বকে সর্বতভাবে রক্ষা করার চেষ্টা করেছি।’
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকব। আমরা ফ্যাসিবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যেভাবে ইস্পাতকঠিন জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলেছি, সেই জাতীয় ঐক্য ন্যাশনাল ইস্যুতে সব সময় এক থাকবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। যা কিছু তর্কবিতর্ক করব সরকারি দল বিরোধী দল এই হাউসের মধ্যে করব; কিন্তু আমরা কোনো জাতীয় ইস্যুতে স্বাধীনতা–সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কখনোই ছাড় দেব না।’
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক কী হবে, সেটা সরকারের একক কোনো দায়িত্ব না। আমরা সংসদে সংবিধান সংশোধন করে পররাষ্ট্রনীতি সংশোধন করে এখানে ঠিক করতে পারি। প্রতিবেশীকে কখনো পাল্টানো যায় না। কথায় আছে যে আপনি আপনার স্ত্রী পাল্টাতে পারবেন, কিন্তু প্রতিবেশী তো আপনি পাল্টাতে পারবেন না।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে নিয়ে এসে রায় কার্যকর করতে সরকার তাগাদাপত্র দিচ্ছে। শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদির হত্যাকারী তিনজনকে ফেরত চাওয়া হয়েছে। সরকারের আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থান কোনো একক দল বা ছাত্রসংগঠনের কৃতিত্ব নয় উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এটি সংঘটিত করেছে। জুলাই ঘোষণাপত্র, জুলাই জাতীয় সনদ এবং জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষার অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে।’
দেশের সীমানায় ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হবে: আইনমন্ত্রী
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৬টি তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। তার মধ্যে ১২টি তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয়েছে। চারটিতে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে তিনটি মামলার রায় হয়েছে।
শাপলা চত্বরে হত্যাযজ্ঞের তদন্ত শুরু হয়েছে জানিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। জুলাই হত্যাকাণ্ডে জেলায় জেলায় তদন্ত কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, জুলাই চেতনায় বিশ্বাসীদের মধ্যে বিভেদের সুর দেখে দিল্লিতে বসে হুঙ্কার দেওয়া হচ্ছে। যাঁরা আত্মসমর্পণ করার হুংকার দিচ্ছেন, বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে তাঁদের আত্মসমর্পণের কোনো সুযোগ থাকবে না। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি বাংলাদেশের সীমানায় ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার হবেন। এটা সরকারের অঙ্গীকার।
বিচারে গড়িমসি জাতি সহ্য করবে না: জামায়াত আমির
জুলাই যোদ্ধাদের সুযোগ–সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জুলাই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচারের দাবি জানান বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, বিচারের ব্যাপারে কোনো গড়িমসি জাতি সহ্য করবে না। বিচার হতেই হবে, তবে বিচারটা যেন ন্যায়বিচার হয়।
শফিকুর রহমান বলেন, সীমান্তে সুড়সুড়ি দেওয়া হয়েছে। সরকার এখন পর্যন্ত এ ব্যাপারে কিছুই বলেনি। তিনি অভিযোগ করেন, সবাই না হলেও বেশির ভাগ মিডিয়া স্বৈরাচারকে ভয়ংকর স্বৈরাচার হতে সাহায্য করেছে। তারা এখন আবার পানি ঘোলা করার জন্য ময়দানে নেমে পড়েছে। সরকার এসব বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘কোন শক্তির বলে তারা এটা করে আমরা জানতে চাই সরকারের কাছে। তাদের ব্যাপারে দুর্বলতাটা কোথায়?’
সংস্কার বাস্তবায়নে গণভোটের প্রসঙ্গ টেনে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘গণভোটে জনগণ হ্যাঁ–এর পক্ষে, সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছিল। কী এখানে হয়ে গেল, আমরা ঠিক বুঝতে পারি নাই।’
আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার দাবি করে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, যেই দল ইতিহাসে দুই–দুইবার সুযোগ পেয়ে এ দেশে গণহত্যা করেছে, গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে এবং সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে, লুটপাট করেছে, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডে সঙ্গে জড়িত, তার বিচার করতে হবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্র্যাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরকে সরিয়ে দেওয়ার কথা তুলে ধরে নাহিদ বলেন, নতুন করে কোনো মামলার তদন্তপ্রক্রিয়া বর্তমান প্রসিকিউশন এগিয়ে নিতে পারেনি। প্রসিকিউশন টিমে দক্ষ আইনজীবী নিয়োগ এবং ট্রাইব্যুনাল বাড়ানো নিয়ে সরকারের কী পরিকল্পনা, তা তিনি জানতে চান।
জুলাই অভ্যুত্থানে হত্যা, যারা জুলাইয়ে হত্যা করেছিল, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছিল তাদের শাস্তি এখনো কার্যকর হয়নি। এখন পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করা যায়নি। তিনি শেখ হাসিনাসহ সাজাপ্রাপ্তদের দেশে ফিরিয়ে এনে শাস্তি কার্যকর এবং আওয়ামী লীগের বিচারের পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।
গণ অধিকার পরিষদের সংসদ সদস্য প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক বলেন, একটি রাজনৈতিক সমঝোতার মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদের বিচার নিষ্পত্তির প্রশ্নে ঐকমত্য হতে হবে। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার করতে হবে। তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগের প্রশ্নে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কী হবে—এই বিষয়ে সরকারি দল এবং বিরোধী দলের একটি নীতিগত সমঝোতা রাষ্ট্রের স্বার্থে প্রয়োজন।