
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন অনিয়ম–দুর্নীতির বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তোলা অভিযোগ প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। অভিযোগসংশ্লিষ্ট দুটি ঘটনার কোনোটিতেই ব্যক্তিগতভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন না দাবি করে তিনি বলেছেন, তাঁকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
বুধবার বিকেলে আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করার কথা বলার সময় দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম অভিযোগের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার কথা বললেও পরে ওই বক্তব্য থেকে সরে আসেন। এ প্রসঙ্গে আসিফ মাহমুদ বলেছেন, ‘আমি দুদকের প্রতি আহ্বান জানাব, আমার যে মানহানি করা হয়েছে, সেটার জন্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অ্যাপোলজি (ক্ষমা প্রার্থনা) করবেন এবং আপনাদের বরাত দিয়ে যে খবরগুলো প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলো প্রত্যাহার করবেন। অন্যথায় আমি আইনি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হব, মানহানির মামলা করতে বাধ্য হব।’
রাতে রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে আসিফ মাহমুদ এ কথা বলেন। দুদকের অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যুব ও ক্রীড়ার পাশাপাশি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করে আসা আসিফ মাহমুদ।
সংবাদ সম্মেলনে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘অভিযোগে ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিল করে পদায়নের আদেশ করিয়ে ৭৬ লাখ টাকার দুর্নীতি এবং ১৫০ জনকে পদোন্নতি দিয়ে ২ কোটি টাকার দুর্নীতি—মোট ২ কোটি ৭৬ লাখ টাকার দুর্নীতির অভিযোগ করা হয়েছে। এই দুটি অভিযোগে দায়ী করা হয়েছে আমাকে এবং তৎকালীন (ও বর্তমান) যুব ও ক্রীড়া সচিব, একজন যুগ্ম সচিব ও একজন উপসচিবকে।’
৭৬ লাখ টাকার দুর্নীতির অভিযোগের সঙ্গে প্রকৃত ঘটনার কোনো সামঞ্জস্য নেই দাবি করে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘২০২১ সালে নিয়মবহির্ভূতভাবে ১১২ জন দশম গ্রেডের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি না দিয়ে নবম গ্রেডের উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০২৫ সাল পর্যন্ত তাঁরা ওই পদে বহাল ছিলেন। অথচ প্রচলিত বিধি অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে চলতি দায়িত্বে ছয় মাসের বেশি রাখা যায় না। ২০২১ সালের ওই আদেশ নিয়মবহির্ভূত হওয়ায় পরে তা চ্যালেঞ্জ করে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালে আদালত ওই আদেশ অবৈধ ঘোষণা করেন। তবে আদালতের রায়ের সময় ১১২ জনের মধ্যে ৩৮ জন দায়িত্বে বহাল ছিলেন, অন্যরা এরই মধ্যে অবসরে চলে গিয়েছিলেন অথবা নিয়মিত পদোন্নতি পেয়েছিলেন। আদালতের রায় বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে মূলত ওই ৩৮ জনের চলতি দায়িত্ব বাতিল করে নবম গ্রেড থেকে নামিয়ে তাঁদের মূল পদে (দশম গ্রেড) আবার প্রত্যাবর্তন করানো হয়। কিন্তু দুদকের অভিযোগে বিষয়টি সম্পূর্ণ উল্টোভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।’
আসিফ মাহমুদের ভাষ্য, যেহেতু ৩৮ জনকে অপসারণ করা হয়েছিল, সেখানে একটা শূন্য পদ তৈরি হয়েছিল। এর পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে শূন্য হওয়া সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার মোট ১৮২টি শূন্য পদে পদোন্নতির জন্য পিএসসির মতামত চাওয়া হয়। অভিযোগে ১৫০টি পদের কথা উল্লেখ করা হলেও আসলে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল ১৮২ পদে। পদোন্নতির প্রক্রিয়া ছিল—পিএসসিকে মন্ত্রণালয় লিখেছে যে এই কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়া প্রয়োজন। নিয়ম মেনে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রস্তুত করে পিএসসিতে পাঠানো হয়।
নিয়ম মেনে পদোন্নতির জন্য জ্যেষ্ঠতার তালিকা পাঠানোর সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চাকরির রেকর্ড, এসিআর (বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন), বিভাগীয় মামলা বা শাস্তিমূলক কোনো বিষয় বা অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য পিএসসির কাছে পাঠানো হয়েছিল উল্লেখ করে সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, পিএসসি এসব তথ্য যাচাই–বাছাই ও পর্যালোচনা করে পদোন্নতি দেয়। অথচ দুদকের অভিযোগে এই প্রক্রিয়াকেই অভিযুক্ত করা হয়েছে। পদোন্নতির প্রক্রিয়ায় ২ কোটি টাকা দুর্নীতির কথা বলা হয়েছে। এই পদোন্নতিটা সম্পূর্ণরূপে পিএসসির সুপারিশ অনুযায়ী করা হয়েছে। পিএসসির সুপারিশে প্রথম যে ১৮২ জন এসেছে, ওই ১৮২ জনকেই পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। সুপারিশ লঙ্ঘন করে যদি আমরা ৬০০ বা ৭০০ নম্বর থেকে কাউকে এনে পদোন্নতি দিতাম, তাহলে দুর্নীতির কথা অভিযোগ করা যেত। তাহলে দুদক পিএসসির ওপরও তদন্ত করবে কি না, এটাও আসলে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
‘সহযোগিতা করতে প্রস্তুত’
দুটি প্রক্রিয়ার কোনোটাতেই ব্যক্তিগতভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন না বলে দাবি করেন আসিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, জেলা পর্যায়ের যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদায়ন বা পদোন্নতির বিষয়গুলো দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী বা উপদেষ্টার পর্যায়ে নিষ্পত্তিযোগ্য হয়। কিন্তু উপজেলা সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার বিষয়টি নিষ্পত্তি হয় সচিব পর্যায়ে। এটা উপদেষ্টার কাছে আসে না।
‘দুটি আদেশেরই সাইনিং অথরিটি আমি ছিলাম না, ছিলেন সচিব। অর্থাৎ, অফিসিয়ালি এই দুই প্রক্রিয়ায় আমার সরাসরি সংশ্লিষ্টতার সুযোগ ছিল না,’ বলেন তিনি।
দুদকের অভিযোগে যে ঘটনাক্রম তুলে ধরা হয়েছে, তা প্রকৃত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় উল্লেখ করে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘আদালতের রায় বাস্তবায়ন, চলতি দায়িত্ব বাতিল, শূন্যপদ সৃষ্টি এবং পরবর্তী সময়ে পিএসসির সুপারিশের ভিত্তিতে পদোন্নতি—প্রতিটি ধাপই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সম্পন্ন হয়েছে। আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আহ্বান জানাই, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ওই পদায়ন ও পদোন্নতিসংক্রান্ত ফাইল ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া যথাযথভাবে যাচাই করা হোক। সত্যতা উদ্ঘাটনের স্বার্থে প্রয়োজনীয় সব তথ্য–উপাত্ত ও নথি যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে আমি প্রস্তুত আছি।’
দুদকের উদ্দেশে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘দুদকের যে কর্মকর্তা অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা বলেছিলেন, পরে তিনিই দুদক বিটের সাংবাদিকদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বলেছেন, তাঁর মুখ ফসকে সত্যতা পাওয়ার কথাটা চলে এসেছে, কেউ প্রচার করবেন না। কিন্তু তাঁর বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত খবরগুলো পরিবর্তন হয়নি। এখানে ব্যক্তিগতভাবে আমার মানহানি হয়েছে। আমি দুদকের প্রতি আহ্বান জানাব, আমার যে মানহানি করা হয়েছে, সেটার জন্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অ্যাপোলজি করবেন এবং আপনাদের বরাত দিয়ে যে খবরগুলো প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলো প্রত্যাহার করবেন। অন্যথায় আমি আইনি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হব, মানহানির মামলা করতে বাধ্য হব।’