
ফ্যাসিবাদের পরবর্তী বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘কালচারাল ফ্যাসিজম’ বা সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের উত্থানকে রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদের চেয়েও ভয়াবহ বলে উল্লেখ করেছেন দেশের বিশিষ্ট চিন্তক ও বুদ্ধিজীবীরা। তাঁরা বলেন, রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদ মানুষের ভোটাধিকার হরণ করে, কিন্তু সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ হরণ করে মানুষের হাজার বছরের যাপিত জীবন, পরিচয় আর বিশ্বাসের ধরন। এই সংকট থেকে উত্তরণে আবুল মনসুর আহমদের ‘সমন্বয়বাদী’ ও ‘ভূমিজ’ দর্শন পাঠ করা আজ সময়ের দাবি।
আজ সোমবার বিকেলে রাজধানীর তোপখানা রোডে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশের কালচার: আত্মপরিচয়ের অন্বেষণ’ শীর্ষক এক বিশেষ আলোচনা সভায় এ কথাগুলো উঠে এসেছে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত কাইয়ূম।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন সাংবাদিক ও গবেষক ইমরান মাহফুজ। তিনি বলেন, ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের ১০০ বছর পেরিয়েও আজ আমরা কথা বলতে না পারার সংস্কৃতিতে বন্দী। ধর্মের নামে বা পর্দার দোহাই দিয়ে যে অসহিষ্ণুতা তৈরি করা হচ্ছে, তা আমাদের নিজস্বতাকেই ধ্বংস করছে। জুলাই-পরবর্তী প্রধান পাঁচটি দলের নেতাদের ৩২টি ভাষণ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কোথাও “সংস্কৃতি” শব্দটির উল্লেখ নেই, যা এক গভীর দারিদ্র্য ও সাংস্কৃতিক হাহাকারের ইঙ্গিত দেয়।’
সভাপতির বক্তব্যে হাসনাত কাইয়ূম বলেন, শাসকেরা মানুষের স্বাভাবিক লোভকে লালসায় পরিণত করেছে। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমল থেকে চলে আসা বিভাজনের রাজনীতি আজ নির্মূলের রাজনীতিতে রূপ নিয়েছে। ভিন্নমত মানেই শত্রুতা—এই ভয়ংকর সংস্কৃতি থেকে বের হতে না পারলে রাষ্ট্র সংস্কার অসম্ভব।
হাসনাত কাইয়ূম আরও বলেন, আবুল মনসুর আহমদের মতো প্রজ্ঞাবান মানুষেরা আজ প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন না। কারণ, রাজনীতি এখন টাকা আর পেশিশক্তির দখলে। রাজনীতির সংস্কারের আগে চিন্তার সংস্কার বা সাংস্কৃতিক সংস্কার জরুরি।
বিশিষ্ট লেখক ও কলামিস্ট সেলিম খান মধ্যপ্রাচ্যের সালাফি ও ওয়াহাবি মতবাদের প্রভাবে দেশজ সংস্কৃতির বিবর্তনের সমালোচনা করে বলেন, ‘আশির দশক থেকে শ্রমশক্তির অগোছালো রূপান্তরের সঙ্গে সঙ্গে আমরা আমাদের নিজস্বতা হারিয়েছি। ধর্ম এখন কেবল আনুষ্ঠানিক আচরণে পরিণত হয়েছে, এর মর্মবাণী হারিয়ে গেছে। আমাদের যা ছিল (সভ্যতা), আজ তা নেই; এমনকি আমরা নিজেরাও নিজেদের মধ্যে নেই।’
‘বাংলাদেশ উপমহাদেশের একমাত্র জাতিরাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও আমরা জাতিগত আত্মপরিচয়হীনতায় ভুগছি’ বলে মন্তব্য করেন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও গীতিকার শহীদুল্লাহ্ ফরায়জি। তিনি বলেন, ‘আর এ জন্যই আমাদের সংস্কৃতি এখনো দিশা খুঁজে পায়নি। রাষ্ট্র এখানে বারবার প্রতারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে—১৯৭১, ১৯৯০ কিংবা ২০২৪–এ, আর এ প্রতারণাই এখন এ দেশের অনিবার্য সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতার আমূল বিন্যাস পরিবর্তন ছাড়া সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।’
পশ্চিম বাংলার চলচ্চিত্র পরিচালক ও অ্যাকটিভিস্ট সৌমিত্র দস্তিদার বলেন, পশ্চিম বাংলাও আজ অনুপ্রবেশের মতো সংকীর্ণ ইস্যু নিয়ে কঠিন সময় পার করছে। মজলুমের সংস্কৃতি আর মানুষের সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্কই পারে দুই বাংলার এই সাংস্কৃতিক বন্ধ্যত্ব দূর করতে।
আলোচনায় আরও অংশ নেন ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিকসের শিক্ষক শামস আরেফিন, প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক মিজানুর রহমান, গবেষক ও শিক্ষক নাহিদ হাসান এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের যুববিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ সানাউল্লাহ সাগর ও রাষ্ট্রচিন্তার সদস্য চারু হক।