
গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ২৩৬ নেতা-কর্মী গুমের শিকার হয়েছে বলে দাবি করেছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে গুম তদন্ত কমিশনে অভিযোগ না করা ব্যক্তিদের হিসাব ধরলে প্রকৃত গুমের সংখ্যা ৭০০ ছাড়িয়ে যাবে বলে দাবি করেছেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম।
আজ রোববার আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে মধুর ক্যানটিনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করা হয়। ‘গুম ও নিপীড়নের খতিয়ান: ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ ও গুম প্রতিরোধে কার্যকর সংস্কারের দাবি’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনে গুমের শিকার কয়েকজনের পরিবারের সদস্য এবং গুম থেকে ফিরে আসা একজন বক্তব্য দেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক ভিন্নমত দমনে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে প্রয়োগ করা হয়েছে। গোয়েন্দা পুলিশ, ডিবি, ডিজিএফআই, র্যাব ও কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমসহ (সিটিটিসি) বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় বিশেষায়িত বাহিনীকে ব্যবহার করে এসব ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
গুমবিষয়ক তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, বিগত শাসনামলে যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৫৬৯টি গুমের ঘটনায় প্রমাণ পাওয়া গেছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে ২৩৬ জন ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মী। তাঁর দাবি, এটি রাজনৈতিক পরিচয় থাকা মোট ভুক্তভোগীর ২৫ দশমিক ৪২ শতাংশ।
এখনো ছাত্রশিবিরের সাতজন নেতা-কর্মী নিখোঁজ রয়েছেন দাবি করে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ২০১২ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তাঁদের তুলে নেওয়া হয়েছিল।
অনুষ্ঠানে আল-মোকাদ্দাস নামে এক ব্যক্তির বাবা মাওলানা আবদুল হালিম বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ২০১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে তাঁর ছেলে আল-মোকাদ্দাস নিখোঁজ হন। এরপর ১৪ বছর ধরে তিনি ছেলের সন্ধানে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন। র্যাবের বিভিন্ন ক্যাম্পে খোঁজ করার পাশাপাশি হাইকোর্টে রিটও করেছেন। ৫ আগস্টের পর ন্যায়বিচারের আশা করলেও এখনো তা পাননি বলে জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে মোহাম্মদ আবুজার গিফারী নামের একজন বক্তব্য দেন। তিনি ২০১৪ ও ২০১৫ সেশনে জয়পুরহাট জেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি ছিলেন। আবুজার গিফারীর দাবি, ২০১৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর সংগঠনের বার্ষিক প্রতিবেদন জমা দিতে ঢাকায় আসার পথে তাঁকে ও তাঁর সেক্রেটারি ওমর আলীকে আবদুল্লাহপুর থেকে একটি কালো মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়া হয়। পরে তাঁদের র্যাবের উত্তর সদর দপ্তরে রাখা হয় বলে জানতে পারেন তিনি। ১০ দিন পর তাঁদের জয়পুরহাটে নিয়ে যাওয়া হয়।
এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করা হলেও দেড় বছরেও তদন্তে অগ্রগতি দেখতে পাননি বলে দাবি করেন আবুজার গিফারী।
গুম ও নিপীড়নের ঘটনায় ন্যায়বিচার এবং ভবিষ্যতে গুম প্রতিরোধে ৪ দাবি জানিয়েছে ছাত্রশিবির।
১. এখনো নিখোঁজ সাত নেতা-কর্মীর সন্ধান এবং তাঁদের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে রাষ্ট্রকে স্পষ্ট তথ্য দিতে হবে।
২. গুম ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা ও কমান্ডারদের বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং গুমের সব ঘটনা স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে।
৩. গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে রাষ্ট্রকে স্পষ্ট জবাব দিতে হবে।
৪. সংসদে পাস হওয়ার আগে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত বিল এবং র্যাব-সংক্রান্ত বিল সংশোধন করতে হবে।