
দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তারা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করে ব্যবসা-বাণিজ্যে বিদ্যমান সমস্যা ও চ্যালেঞ্জের কথা জানিয়েছেন। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, শিল্প খাতে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট ও আমলাতান্ত্রিক হয়রানির কথা জানিয়েছেন তাঁরা।
ব্যবসায়ীদের সমস্যার কথা শুনে তারেক রহমান প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছেন, আগামী নির্বাচনে তাঁর দল ক্ষমতায় এলে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়ে এসব সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ নেবেন।
রোববার সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাত সাড়ে নয়টা পর্যন্ত রাজধানীর গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এ বৈঠক হয়।
‘ব্যবসায়ীরা প্রত্যাশা করছেন, জনগণের ভোটে বিএনপি ক্ষমতায় এলে সমস্যাগুলোর সমাধান হবে। এ বিষয়ে তারেক রহমান তাঁদের আশ্বস্ত করেছেন’আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্থায়ী কমিটির সদস্য, বিএনপি।
দেশের ব্যবসায়ীরা বর্তমানে বড় ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, যার কারণে দেশে বিনিয়োগ হচ্ছে না, কর্মসংস্থান কমে যাচ্ছে এবং সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি এগিয়ে নেওয়ার গতি ব্যাহত হচ্ছে। ব্যাংকিং খাত, স্টক এক্সচেঞ্জ ও ক্যাপিটাল মার্কেট—সবখানেই গুরুতর সংকট রয়েছে। এসব সমস্যা নিয়েই শীর্ষ ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের সঙ্গে তারেক রহমানের আলোচনা হয়েছে। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবসায়ীদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। তারেক রহমান শুধু সমস্যাগুলোর সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেননি, বরং প্রতিটি সমস্যার কী ধরনের সমাধান হতে পারে, সে বিষয়ে ব্যবসায়ীদের মতামত জানতে চেয়েছেন। পাশাপাশি তিনি নিজেও যেগুলোকে বাস্তবসম্মত ও প্রয়োজনীয় মনে করেছেন, সেগুলো তুলে ধরেছেন।
বৈঠকে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, বিএসআরএমের চেয়ারম্যান আলী হোসেইন আকবর আলী, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন ও এ কে আজাদ, স্কয়ার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন চৌধুরী, বিটিএমএর সাবেক সভাপতি মতিন চৌধুরী, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল, উত্তরা মোটরসের চেয়ারম্যান মতিউর রহমান, এমসিসিআইয়ের সভাপতি কামরান টি রহমান, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি কুতুবউদ্দিন আহমেদ, বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক, এমসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি নিহাদ কবির, বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ, বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, স্টিল মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম, আইসিসি বাংলাদেশের নির্বাহী সদস্য ও ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান, প্রাণ গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সিইও আহসান খান চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া পারটেক্স গ্রুপের আজিজ আল কায়সার, ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি হোসেন খালেদ, ডিসিসিআইয়ের সভাপতি তাসকিন আহমেদ, বিজিএপিএমইএর সভাপতি মো. শাহরিয়ার, বিসিএমইএর সভাপতি ময়নুল ইসলাম, বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির (বিএপিআই) সভাপতি আবদুল মুক্তাদির, বিএবির সভাপতি আবদুল হাই সরকার, সিকম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক, বিসিআইয়ের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রীতি চক্রবর্তী, বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামিম এহসান এবং ইউসিবিএলের চেয়ারম্যান শরীফ জহির উপস্থিত ছিলেন।
বিএনপির পক্ষে উপস্থিত ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও ইকবাল হাসান মাহমুদ।
বৈঠক থেকে বের হয়ে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মীর নাসির হোসেন ও আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী।
মীর নাসির বলেন, খালেদা জিয়া ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নীতি ছিল বেসরকারি খাতকে এগিয়ে নেওয়া। দেশে ব্যক্তি খাতের যে উন্মেষ হয়েছে, এটার পথিকৃৎ তাঁরা ছিলেন। তারেক রহমান শুনতে চেয়েছেন ব্যবসায়ীদের সমস্যা কী। তিনি ক্ষমতায় এলে কী করতে পারেন, তার একটা ধারণা জানতে চেয়েছেন।
মীর নাসির বলেন, ব্যবসায়ীরা জ্বালানির সমস্যা, আইনশৃঙ্খলা সমস্যা, শিক্ষাব্যবস্থার অসুবিধার কথা ও গণমাধ্যমের ঝুঁকির কথা বলেছেন। ব্যবসার খরচ যাতে কমানো যায়, শেয়ারবাজার যাতে শক্তিশালী করা যায়। ব্যাংকের ওপর যাতে নির্ভরশীলতা কমে আসে এসব বলেছেন ব্যবসায়ীরা।
আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, অর্থনীতি হলো দেশের উন্নয়নের মূল ভিত্তি। ফলে অর্থনীতিকে দাঁড় করাতে হলে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়েই সরকারকে একসঙ্গে কাজ করা উচিত। তারেক রহমানও বলেছেন, তিনিও মনে করেন, যদি ওনারা সরকারে আসতে পারেন, তাহলে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়ে নীতিগুলো ঠিক করবেন। একটা স্বচ্ছতা আনার চেষ্টা করবেন এবং ব্যবসায় সহায়ক একটা পরিবেশ সৃষ্টি করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।
আমীর খসরু বলেন, ব্যবসায়ীরা বিশেষভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁদের মতে, ব্যাংকের উচ্চ সুদের হার এবং বিভিন্ন নীতিগত সমস্যার কারণে ব্যবসার খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এর ফলে বাড়তি মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে, যা শেষ পর্যন্ত দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলছে। এসব প্রতিকূল অবস্থার কারণে ব্যবসায়ীরা তাঁদের ব্যবসা ঠিকভাবে চালাতে পারছেন না, অন্যদিকে বিনিয়োগও বাড়াতে পারছেন না। দেশীয় ব্যবসায়ীরা যদি বিনিয়োগ করতে না পারেন, তাহলে বিদেশিরা কীভাবে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করবেন, সে প্রশ্নও বৈঠকে উঠে এসেছে।
আমীর খসরু বলেন, বিএনপি ব্যবসাবান্ধব দল। ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিএনপির প্রতি একটি বড় ধরনের আস্থা রয়েছে। কারণ, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যত ধরনের সংস্কার হয়েছে, তার প্রায় সবই বিএনপির শাসনামলেই হয়েছে। ব্যবসায়ীরা প্রত্যাশা করছেন, জনগণের ভোটে বিএনপি ক্ষমতায় এলে সমস্যাগুলোর সমাধান হবে। এ বিষয়ে তারেক রহমান তাঁদের আশ্বস্ত করেছেন।
বৈঠকে তারেক রহমান বলেন, তিনি জানেন, ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা অনেক। অতীতে বিএনপি যেভাবে কাজ করেছে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে তার চেয়েও বড় পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে। বড় ধরনের সংস্কার, ডিরেগুলেশন ও লিবারালাইজেশনের দরকার আছে। এসব বাস্তবায়নের জন্য বিএনপি ইতিমধ্যে নীতিমালা করার প্রস্তুতি নিয়েছে এবং ক্ষমতায় এলে সেগুলো বাস্তবায়ন করা হবে।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল বৈঠক থেকে বের হয়ে বলেন, সীমিত সম্পদ ও বিদ্যমান অবকাঠামো কীভাবে আরও উন্নয়ন করা যায়, সে বিষয়েও বিস্তারিত মতামত শুনেছেন তারেক রহমান। সামনে রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ যেন সঠিকভাবে বজায় থাকে, সে বিষয়ে ব্যবসায়ীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
বৈঠকে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ও নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি এ কে আজাদ অতীতে সংবাদমাধ্যমের কাজে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার হস্তক্ষেপের কথা তুলে ধরেন।
এ কে আজাদ বলেন, অতীতে প্রথম আলোর মালিকানা বদলেরও চেষ্টা করা হয় গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে। এ জন্য নানা ভোগান্তিও পোহাতে হয় সংবাদমাধ্যমটির মালিকপক্ষকে। এ ধরনের ঘটনা স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ এবং স্বাধীন মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বাধা। বিএনপি ক্ষমতায় এলে সংবাদমাধ্যম যাতে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারে, সে বিষয়টি নিশ্চিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে তারেক রহমান সভায় বলেন, বিএনপি অতীতে ক্ষমতায় থাকার সময় সংবাদমাধ্যমগুলো যেভাবে কাজ করেছে, ভবিষ্যতেও সেভাবে কাজ করতে পারবে। এ সময় তারেক রহমান প্রশ্ন করেন, অতীতে বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় কোনো গোয়েন্দা সংস্থা সংবাদমাধ্যমে হস্তক্ষেপ করেছিল? এ কে আজাদ বলেন, না, অতীতে বিএনপির শাসনামলে এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি।
তখন তারেক রহমান বলেন, যদি বিএনপি অতীতে সংবাদমাধ্যমের কাজে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ না করে থাকে, তবে ভবিষ্যতেও সেই ধারা অব্যাহত থাকবে।