জাতীয় সংসদ
জাতীয় সংসদ

গঙ্গা চুক্তি থেকে মাতারবাড়ী—সংসদে যেসব বিষয়ে সরব হবে জামায়াত

জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি নিয়ে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলো বরাবরই সোচ্চার। এবারও সংসদে সুযোগ পেলেই বিষয়টি সামনে আনবে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এর পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থ ও জনজীবনের সংকটের বিষয়গুলো নিয়ে জাতীয় সংসদে সরকারকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে চায় দলটি।

জাতীয় স্বার্থ ও জনজীবনের সংকট সম্পর্কিত বিষয়ের মধ্যে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির ভবিষ্যৎ, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প, পোশাকশিল্পের অস্থিরতা, জ্বালানিসংকট ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি—এসব বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চাইবেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। তেল, গ্যাস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টিও সংসদে তুলতে চান তাঁরা।

আগামীকাল সোমবার বিকেলে শুরু হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের চতুর্থ অধিবেশনে এসব বিষয়ে সরব হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ৬৮ ও ১৪৭ ধারাসহ কয়েকটি বিধিতে নোটিশ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এসব নোটিশ গৃহীত হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সংসদে আলোচনা হতে পারে। এ ছাড়া পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়েও সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ রয়েছে সংসদ সদস্যদের।

জামায়াতের নেতারা বলছেন, জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে সরকারের অবস্থান ও পরিকল্পনা সম্পর্ক স্পষ্ট হতে চান তাঁরা। বিশেষ করে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সরকারের প্রস্তুতি এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক জাপান সফরে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে কী অগ্রগতি হয়েছে, তা সংসদে জানতে চাইবেন বিরোধী দলের সদস্যরা।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান (মিলন) আজ রোববার প্রথম আলোকে বলেন, এবারের অধিবেশনে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ বেশ কিছু বিষয়ে আলোচনা তোলার চেষ্টা করবেন তাঁরা। এসব আলোচনায় জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।

গঙ্গা চুক্তি ও মাতারবাড়ী নিয়ে প্রশ্ন

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর সই হওয়া ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ১২ ডিসেম্বর। চুক্তিটি নবায়ন হবে, নাকি নতুন করে চুক্তি করা হবে, তা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। তবে এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো ঘোষণা আসেনি। তবে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে আলোচনা চলছে বলে সরকারি সূত্র জানিয়েছে।

জামায়াতের একাধিক সংসদ সদস্য জানিয়েছেন, গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান কী এবং ভেতরে–ভেতরে যে আলোচনা হচ্ছে এতে দেশের স্বার্থ কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, তা সংসদে জানতে চাইবেন তাঁরা। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের পানির ন্যায্য হিস্যা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এটি গুরুত্বপূর্ণ।

২ নভেম্বর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম মন্ত্রণালয়ে ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বলেন, গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে প্রধানমন্ত্রী একটি কমিটি গঠন করেছেন। পানিসম্পদমন্ত্রী ও সরকারের অর্থবিষয়ক উপদেষ্টা এ প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ভারতের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি।

শামা ওবায়েদ বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি এবং আশাবাদী, চলতি বছর মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া চুক্তিটি নবায়ন হবে। ভারতও এ বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে বলে আমরা আশাবাদী।’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক জাপান সফরে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে ভারতের গণমাধ্যমে এসেছে যে মাতারবাড়ী বন্দরের সঙ্গে দেশটির উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যের যোগাযোগ স্থাপনের বিষয়টি জাপানের বিবেচনায় আছে।

এর মধ্যে গত ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে বৈঠক করেন তারেক রহমান। আগের দিন জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট আকিহিকো তানাকার সঙ্গেও বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। ওই বৈঠকে জাইকার পক্ষ থেকে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন উদ্যোগে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ঘোষণা আসে।

মাতারবাড়ী প্রকল্পের বাস্তবায়ন, অর্থায়ন ও অগ্রগতি এবং বন্দর কারা ব্যবহার করবে—এসব বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা কী, তা সংসদে জানতে চাইবেন বিরোধী দলের সদস্যরা।

৩১ অক্টোবর ১১-দলীয় ঐক্যের ঢাকা থেকে খুলনা অভিমুখে লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানও মাতারবাড়ী বন্দর নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা জানতে চান।

তিনি বলেছিলেন, ‘চার দিনের সফর শেষ করে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে ফিরেছেন। কী জন্য গিয়েছিলেন, কী করে এসেছেন, জাতির সামনে তাঁকে এটা খোলাসা করতে হবে। বিশেষ করে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে কোনো লুকোচুরি হচ্ছে কি না, জাতি তা পরিষ্কার জানতে চায়। কানেকটিভিটির নামে বাংলাদেশকে কারও কাছে ইজারা দেওয়া চলবে না।’

জামায়াতের পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান (মোমেন) আজ প্রথম আলোকে বলেন, গঙ্গা চুক্তি, মাতারবাড়ী, পোশাকশিল্পের সংকটসহ জনজীবনের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে সংসদে কথা বলার চেষ্টা করবে বিরোধী দল।

পোশাকশিল্পের অস্থিরতা ও জনজীবনের সংকট

জামায়াত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন, কারখানা বন্ধ এবং শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। শ্রমিকেরা মাসিক ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানাচ্ছেন। আন্দোলনের কারণে উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছে।

শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণ, মালিক-শ্রমিক বিরোধের সমাধান এবং শিল্পের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার বিষয়গুলো সংসদে তোলার পরিকল্পনা আছে বিরোধী দলের সদস্যদের।

এ ছাড়া জ্বালানিসংকট, তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বিষয়েও সরকারের কাছে জবাব চাইবেন তাঁরা। এসব সংকট মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী, তা জানতে চাইবেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা।

আগামীকাল থেকে শুরু হওয়া সংসদের অধিবেশন চলবে ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে প্রত্যাশিত সব বিষয়ে কতটা আলোচনার সুযোগ পাওয়া যাবে, সেই সংশয় আছে বলে জানিয়েছেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। এরপরও যতটুকু সুযোগ পাওয়া যায়, ততটা কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হবে বলে তাঁরা জানান।

জামায়াতের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান বলেন, জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সরকারের এড়িয়ে যাওয়া উচিত হবে না। বিরোধী দল যাতে সংসদে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারে, সরকার যেন সে সুযোগ দেয়।