ছাত্রলীগকে সামলাতে কঠোর হতে পারছে না আওয়ামী লীগ

ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বিব্রত ক্ষমতাসীন দল। কিন্তু নির্বাচনের আগে বেশি চাপ দিতেও চাইছে না।

আওয়ামী লীগ
আওয়ামী লীগ

ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগ নিয়ে উভয়সংকটে পড়েছে আওয়ামী লীগ। সংগঠনটির নেতাদের কর্মকাণ্ডে একদিকে বিব্রত ক্ষমতাসীন দলটি, অন্যদিকে বিরোধী দলের চলমান আন্দোলন ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ছাত্রলীগের ওপর বড় চাপ দিতেও চাইছে না। এই পরিস্থিতিতে বড় কোনো অঘটন ঘটলে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিয়ে সমালোচনা এড়ানোর চেষ্টা করছে।

আওয়ামী লীগের টানা ১৪ বছরের শাসনের সময়টাতে ছাত্রলীগের একের পর এক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড খবরের শিরোনাম হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংগঠনটি যেসব কারণে আলোচনায় এসেছে, এর মধ্যে রয়েছে ছিনতাই, অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়, সাধারণ শিক্ষার্থীদের নির্যাতন, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, যৌন হয়রানি। এ ধরনের নানা অভিযোগের পরও আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেকে মনে করেন, ছাত্রলীগের নেতিবাচক কিছু ঘটনা বেশি প্রচার পাচ্ছে। তবে দলটির কোনো কোনো নেতা মনে করছেন, ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আওয়ামী লীগকেই সংকটে ফেলছে।

সর্বশেষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) ভর্তির কয়েক দিনের মাথায় ছাত্রলীগের একজন নেত্রী ও তাঁর অনুসারীদের নিষ্ঠুরতার শিকার হন ফুলপরী খাতুন নামের এক সাধারণ শিক্ষার্থী। ঘটনাটি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। গত মঙ্গলবার হাইকোর্ট ফুলপরী খাতুনকে নির্যাতনের ঘটনায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি সানজিদা চৌধুরীসহ পাঁচ ছাত্রীকে সব ধরনের শিক্ষা কার্যক্রম থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন।

এর বাইরে সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন মহিলা কলেজ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধমূলক নানা কর্মকাণ্ডের কারণে সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয় ছাত্রলীগ।

আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নীতিনির্ধারণী সূত্র জানায়, ফুলপরী খাতুনকে নির্যাতনের ঘটনার পর আওয়ামী লীগ থেকে ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতাদের কয়েকটি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো অভিযোগ উঠলে সঙ্গে সঙ্গে খোঁজ নিতে হবে এবং সত্যতা পেলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনোভাবেই অভিযুক্তের পক্ষে অবস্থান নেওয়া যাবে না। প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করতে হবে। এ ছাড়া নতুন কোনো শাখা বা ইউনিটের কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে অধিকতর যাচাই-বাছাই করতে হবে।

তবে এই নির্দেশনা কতটা মেনে চলবে ছাত্রলীগ বা তাদের কতটা মানানো যাবে-এই নিয়ে সন্দিহান আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতারাই। দুই সংগঠনের সূত্রগুলো বলছে, নির্বাচন সামনে রেখে মূল দল আওয়ামী লীগ বিভিন্ন অপরাধে বহিষ্কৃত ও অব্যাহতি পাওয়া নেতাদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছে। যুবলীগসহ অন্যান্য সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের যেসব নেতা ক্যাসিনো-কাণ্ডে আলোচিত হয়েছিলেন, তাঁরা একে একে মাঠে নামছেন। তাঁদের ভোটের আগে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ছাত্রলীগকে কতটা চাপে রাখা যাবে, বলা মুশকিল।

ছাত্রলীগের বিষয় দেখভালের জন্য কেন্দ্রীয় চারজন নেতাকে দায়িত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ। তাঁরা হলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আবদুর রহমান; যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম মোজাম্মেল হক। তাঁরা সময়ে-সময়ে ছাত্রলীগ নেতাদের ডেকে নিয়ে বৈঠক করেন এবং দলের নির্দেশনার কথা জানিয়ে দেন।

আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম প্রথম আলোকে বলেন, কীভাবে চললে ছাত্রলীগের ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষা করা যাবে, সে বিষয়ে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ছাত্রলীগের কোনো নেতার অপকর্মের দায় সংগঠন নেবে না। এ জন্য অভিযোগ পাওয়ার পরই দ্রুত সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ছাত্রলীগ বড় সংগঠন, অনেক নেতা। ভালো কাজই বেশি হয়। কিন্তু খারাপ খবরটাই বেশি প্রচার হয়।

বেপরোয়া ছাত্রলীগ

আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেকে মনে করেন, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর দলটির টানা শাসনের সময়ে ছাত্রলীগ বেশি বেপরোয়া হয়ে গেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়নকাজের দরপত্রে চাঁদাবাজির দায়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের পদ হারানোর মতো ঘটনা ঘটেছে ২০১৯ সালে। তখন ছাত্রলীগের নেতৃত্বে পরিবর্তন আনা হলেও সংগঠনটির নেতা-কর্মীদের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডই বারবার আলোচনায় এসেছে।

সর্বশেষ গত বছরের ডিসেম্বরে নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ছাত্রলীগে শৃঙ্খলা আসবে বলে মনে করেছিলেন আওয়ামী লীগের নেতারা। কিন্তু এখনো ছাত্রলীগের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ নেই বলে অনেকে মনে করেন।

সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গত ১ জানুয়ারি থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৪০ দিনের ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহ করেছেন প্রথম আলোর প্রতিনিধিরা। এতে ১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২৫টি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সাধারণ শিক্ষার্থী নির্যাতন, শিক্ষক-শিক্ষিকাকে লাঞ্ছিত করা, শিক্ষার্থীদের আবাসিক হলের সিট দখলের অভিযোগ বেশি পাওয়া গেছে।

সামলাতে চ্যালেঞ্জ কোথায়

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ছাত্রলীগের পদ পাওয়ার দৌড়ে নেমেই কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখা শুরু হয়। একজন ছাত্র-ছাত্রীর পক্ষে তো বৈধ পথে কোটিপতি হওয়ার সুযোগ নেই। ফলে পদ পেয়েই তাঁরা বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।

ছাত্রলীগের সাবেক একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, সংগঠনের ছোট পদে যাঁরা থাকেন, বড় পদ পাওয়ার জন্য নিজের শক্তিমত্তা দেখাতে শুরু করেন। এ ক্ষেত্রে অনেকেই মনে করেন, বেপরোয়া আচরণ করলে অন্যরা সমীহ করবে। যা পদ পাওয়া সহজ করবে। আর পদ পাওয়ার পর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য কেউ কেউ আরও বেশি উগ্র আচরণ শুরু করেন।

ছাত্রলীগের জন্ম ১৯৪৮ সালে, আওয়ামী লীগের জন্মের এক বছর আগে। প্রতিষ্ঠার পরপর বাঙালির স্বাধিকারের বিভিন্ন আন্দোলন থেকে শুরু করে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ-সর্বত্রই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে ছাত্রলীগ। জন্ম দিয়েছে অসংখ্য নেতা। সেই সংগঠনকে এখন নেতিবাচক ভাবমূর্তির বোঝা বহন করতে হচ্ছে।

ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন, আলাদা গঠনতন্ত্র থাকলেও ছাত্রলীগের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ মূল দল আওয়ামী লীগের হাতেই। ক্ষমতাসীন দলটির নেতাদের মূল্যায়ন হচ্ছে, ছাত্ররাজনীতি আশির দশক থেকেই খারাপ হতে শুরু করেছে। কিন্তু ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর ছাত্রলীগের বেপরোয়া মনোভাব বেড়েছে। এর মধ্যে কিছু কারণ আছে, যা বদলানো যাবে না। কারণ, এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রলীগকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নেই। এ জন্য তারা নিজেদের মধ্যেও সংঘাতে জড়াচ্ছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপরও চড়াও হচ্ছে।

২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল। ২০১২ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র জুবায়ের আহমেদ অন্তঃকলহের জের ধরে প্রতিপক্ষের হামলায় খুন হন। একই বছর বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলের অবরোধের মধ্যে পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কের কাছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের একটি মিছিল থেকে কুপিয়ে হত্যা করা হয় দরজি দোকানি বিশ্বজিৎ দাসকে।

আলোচিত সব কটি ঘটনার পরই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে নিবৃত্ত হচ্ছে না ছাত্রলীগ।

তবে ছাত্রলীগের বর্তমান সভাপতি সাদ্দাম হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সংগঠনের নামে যে-ই অপরাধ করছে, আমরা কোনো ছাড় দিচ্ছি না। অপরাধীর পক্ষে কোনো রকম সহানুভূতি দেখানো হচ্ছে না। অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিচ্ছি। অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তা করছি। ভবিষ্যতেও এই নীতি অব্যাহত থাকবে।’

আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেকে বলছেন, বিরোধী দলের আন্দোলন কর্মসূচি চলছে। এই পরিস্থিতিতে সংগঠনের ভেতর বড় ধরনের ‘শুদ্ধি অভিযান’ চালানো কঠিন। কারণ, সরকারবিরোধী আন্দোলন দমানোর ক্ষেত্রে ছাত্রলীগ গুরুত্বপূর্ণ। আবার ছাত্রলীগের অপরাধের কারণে নির্বাচনের আগে দলের বদনাম বহন করাও কঠিন। এমন দোটানা অবস্থার মধ্যে ছাত্রলীগকে কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে, সে বিষয়ে আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যেই সংশয় রয়েছে।