নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও সেতু বিভাগের প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও সেতু বিভাগের প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান

গত ১৮ মাস যে আরামে ছিলেন, সেই আরাম এখন হচ্ছে না: বিরোধী দলের উদ্দেশে প্রতিমন্ত্রী

কয়েক দিন ধরে বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে খুব অস্থিরতা লক্ষ করছেন বলে সংসদে মন্তব্য করেছেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও সেতু বিভাগের প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান। তিনি বলেছেন, ‘আমি খোঁজার চেষ্টা করেছি কী কারণে অস্থিরতা। আমি একটি জিনিস খুঁজে পেয়েছি।...গত ১৮ মাস (অন্তর্বর্তী সরকারের সময়) যে আরামে ছিলেন, সেই আরাম এখন হচ্ছে না। এ কারণে অনেক সমস্যা হয়ে যাচ্ছে।’

আজ রোববার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণ সম্পর্কিত ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে রাজিব আহসান এ কথা বলেন। এর আগে বেলা তিনটায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়।

ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান বিরোধী দলের ‘অস্থিরতা’ প্রসঙ্গে বলেন, ‘অস্থিরতার কারণটি হলো, ওয়ান–ইলেভেনে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল সেই সরকারটি সম্পর্কে সবাই জানেন। সেনা–সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বলা হতো। আর গত ১৮ মাস যে সরকারটি ছিল, সেই সরকারটি কিন্তু আজকের যারা বিরোধীদলীয় নেতৃবৃন্দ আছে, সেই জামায়াতে ইসলাম এবং এনসিপি–সমর্থিত সরকার হিসেবে সবাই অভিহিত করেছে...।’ এ সময় বিরোধী দলের সদস্যরা হইচই শুরু করেন।

এরই মধ্যে প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান বলেন, ‘গত ১৮ মাস যে আরামে ছিলেন। সেই আরাম এখন হচ্ছে না। এই কারণে অনেক সমস্যা হয়ে যাচ্ছে। আমি প্রমাণ দিয়ে দেখাতে পারব, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একজন নেতা, তাঁর বক্তব্য আছে, সে একজনের সাথে গল্প করছে, বলছে যেইভাবে আমরা কাটিয়েছি। মন চেয়েছে প্রধান উপদেষ্টার বাসায় ঢুকে গিয়েছি, মন চেয়েছে তাঁর বেডরুমে ঢুকে গিয়েছি, মন চেয়েছে সচিবের রুমে ঢুকে গিয়েছি। এখন তো আর সে সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না। সমস্যাটা মাননীয় স্পিকার এ জন্যই।’

সরকারি গেজেট ৮৪৪ জনের, বিরোধীদলীয় নেতা ১২০০ বাসায় কীভাবে গেলেন

রাজিব আহসান বলেন, জুলাই আন্দোলন নিয়ে অন্ততপক্ষে তিনজন সংসদ সদস্য শহীদের সংখ্যা ভিন্ন ভিন্ন বলেছেন। একজন বলেছেন ৮৪৪ জন, একজন বলেছেন এক হাজারের বেশি, আরেকজন বলেছেন ১৪০০ শহীদ হয়েছেন। অথচ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিভিন্ন হাসপাতালের সূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রথমে বলেছিল ১৪০০–এর বেশি শহীদ হয়েছে এবং এটা জাতিসংঘও বলার চেষ্টা করেছে। পরে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় গেজেটে ৮৪৪ জনের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এখন সমস্যাটা কোন জায়গাটায়? আমি একটি কথা আপনাদের বলতে চাই, একটি উদ্ধৃতি দিয়েই বলতে চাই। মাননীয় বিরোধী দলের নেতা, আমি ওনাকে খুবই পছন্দ করি, খুব সুন্দর কথা বলেন, আদবের সাথে কথা বলেন। গত ১৪ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে একটি অনুষ্ঠানে উনি বলেছেন, ১৪০০ শহীদের মধ্যে ১২০০ শহীদের বাসায় যাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে।’

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, সরকারি গেজেট ৮৪৪ জনের। উনি ১৪০০ শহীদের মধ্যে ১২০০ বাসায় কীভাবে গেলেন? এটা তো আমি বুঝতে পারতেছি না। উনি যদি যেয়ে থাকেন কোনো আপত্তি নাই, আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু আমরা প্রকৃত সংখ্যাটা জানতে চাই।’

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, জুলাই আন্দোলন হয়েছে। এক বছর, দুই বছর হয় নাই। এখনই স্মৃতির বিস্মৃতিতে অনেক কিছু হারিয়ে যদি যায়, ১০ বছর ২০ বছর পরে এই ইতিহাস বিকৃতি কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে? মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে যে ধরনের একটি ব্যবসা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে যে ব্যবসা আমরা দেখেছি গত ৫৪ বছর, আমরা চাই না এই জুলাইকে কেন্দ্র করে নতুন করে ব্যবসা শুরু হোক।

সরকার ভুল করলে বলবেন, সমালোচনা করবেন

রাজিব আহসান বলেন, আমরা বাক্‌স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। সরকার ভুল করলে বলবেন, সমালোচনা করবেন, কার্টুন করবেন। সেটা নিয়মের মধ্যে করেন।

প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের লক্ষ্যবস্তু করার কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী এটাকে দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন। তিনি বিরোধী দলের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা এখানে অনেক সুন্দর সুন্দর কথা বলবেন, আমরাও শুনতে চাই, আমরাও কাজ করতে চাই আপনাদের সাথে। কিন্তু যাঁরা কুৎসা রটনা করেছেন, আমরা দেখলাম আপনারা তাঁদের পুরস্কৃত করেছেন। যিনি অশ্লীল মন্তব্য করেছেন তাঁর পরিবারের সদস্যকে আপনারা সংসদ সদস্য করে কী প্রমাণ করতে চান?'

আমি কোনো বানোয়াট কথা বলিনি, বিরোধীদলীয় নেতা

মাগরিবের নামাজের বিরতির পর ফ্লোর নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাব দেন। তিনি বলেন, তিনি (প্রতিমন্ত্রী) বলেছেন, শহীদদের সংখ্যা যদি ৮০০ প্লাস হয়, তাহলে আমি ১২০০ বাড়িতে গেলাম কীভাবে? ফ্যামিলিতে গেলাম কীভাবে?

বিরোধীদলীয় নেতা বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান সংসদ কক্ষে ছিলেন না। বিরোধীদলীয় নেতা বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, উনি (প্রতিমন্ত্রী) থাকলে উনাকে বলতাম যে তথ্য মাননীয় প্রতিমন্ত্রীর (মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ প্রতিমন্ত্রী) কাছ থেকে বুঝে নেওয়ার জন্য। সালাহউদ্দিন (সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু) সাহেব তাঁর বক্তব্যে নিজেই বলেছেন যে শুধু জাতীয়তাবাদী দল এবং তাঁর অঙ্গসংগঠনের লোকেরাই শহীদ হয়েছে ১০০০-এর ঊর্ধ্বে। আমি যদি তার কথাটাই সমর্থন করি, তাহলে হিসাব এখান থেকেই তিনি পাবেন; আমার কাছে কষ্ট করে আসতে হবে না।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘দুই নম্বর, আমি কোনো বানোয়াট কথা বলিনি। এই ব্যাপারে আমাদের কাছে একটা কমপ্লিট প্রোফাইল আছে, এখানে উপস্থিত অনেকে আমাদের সেই প্রোফাইল পেয়েছেন। আমাদের ওয়েবসাইটে এটা অ্যাভেইলেবল। চেক এবং ক্রস চেক করে আমরা নিশ্চিত হওয়ার পরে এই তালিকাগুলো করেছি।’

শফিকুর রহমান বলেন, তিন নম্বর, এই ব্যাপারে আমার কথা দেশের কোনো সংস্থার উদ্ধৃতি নয়, জাতিসংঘের মানবাধিকার ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি বলেছে এ সংখ্যাটা চৌদ্দ শ’র বেশি। বিভিন্ন জায়গায় যখন যাই কিছু মানুষ আসেন, তাঁরা অসহায়ের মতো আমাদের দিকে তাকায় থাকেন। এরপর বলেন, 'আমার বাবাটার কোনো খবর আপনাদের কাছে আছে কি না?’ ওই যে দুই দিন ইন্টারনেট বন্ধ করে মানুষ খুন করে গুম করা হয়েছে, তাদের হিসাব তো কেউ দিচ্ছে না। এ সংখ্যা তো আরও বেশি। মহান জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে আমরা যখন কথা বলব, তখন আমাদের কথাগুলো...আমি অনুরোধ করছি, এটা যেন দায়িত্বশীল আচরণ হয়।