গোলটেবিল আলোচনায় বক্তব্য দেন রুমিন ফারহানা। রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। ৪ জুন
গোলটেবিল আলোচনায় বক্তব্য দেন রুমিন ফারহানা। রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। ৪ জুন

ধর্ষণ–নির্যাতনের ঘটনা

‘ভাইরাল’ না হলে টনক নড়ে না

ভাইরাল বা অতি আলোচিত না হলে ধর্ষণ-নিপীড়নের ঘটনায় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের টনক নড়ে না বলে মনে করেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তাঁর মতে, ধর্ষণ-নিপীড়নের কোনো ঘটনায় ফেসবুকে তোলপাড় হতে হবে, মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা হতে হবে; তারপরই রাজনৈতিক ব্যক্তিদের টনক নড়বে এবং ঘটনাটি বিচারের দিকে যাবে—দেশে এমন সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।

‘আর না ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, বিচারহীনতা: কোন পথে সমাধান?’ শীর্ষক এক আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন রুমিন ফারহানা। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে এই আলোচনার আয়োজন করে নারী ও শিশু নির্যাতনবিরোধী নাগরিক উদ্যোগ ‘আর না+’। নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে গত ২৪ মে রাজধানীর শাহবাগে এক প্রতিবাদ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এই প্ল্যাটফর্ম আত্মপ্রকাশ করে।

রুমিন ফারহানা বলেন, ১০০ ঘটনার মধ্যে একটা ঘটনা অতিরিক্ত মনোযোগ পাবে, বাকি ৯৯টা হারিয়ে যাবে—এটি ‘চেরি-পিকিং’ (কোনো একটা ঘটনাকে বাছাই করে নেওয়া)। ধর্ষণ-নিপীড়নের ঘটনায় যত দিন পর্যন্ত রাজনৈতিক রং দেওয়ার চেষ্টা থাকবে এবং রাজনৈতিকভাবে বিচার করার একটা সিদ্ধান্ত আসবে, তত দিন পর্যন্ত সত্যিকার অর্থে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার হবে না।

সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে শিশু ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাকে ‘ক্লাসিক এক্সাম্পল অব পলিটিসিসাইজেশন’ বলেও উল্লেখ করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। এর ব্যাখ্যা হিসেবে তিনি বলেন, ‘একটা ঘটনা সব দলকে একেবারে অস্থির করে ফেলেছে। অথচ প্রতিটি ঘটনার যন্ত্রণা, কষ্ট ও প্রভাব সমান। কিন্তু তারপরও কোনো কোনো ঘটনা অতি আলোচিত হয় এবং সেটি নিয়ে রাজনীতি আরম্ভ হয়।’

প্রতিটি ঘটনার যন্ত্রণা, কষ্ট ও প্রভাব সমান। কিন্তু তারপরও কোনো কোনো ঘটনা অতি আলোচিত হয় এবং সেটিকে নিয়ে রাজনীতি আরম্ভ হয়
রুমিন ফারহানা, স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য

রুমিন ফারহানা বলেন, পরিসংখ্যান বলছে, গত এক মাসে অন্তত ১১৮টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ভুক্তভোগীদের বেশির ভাগ শিশু। কিন্তু একটা ঘটনা সব দলকে একেবারে অস্থির করে ফেলেছে। পল্লবীর ঘটনাটিকে এতটাই রাজনীতিকরণ করা হয়েছে যে কেবল দুই দলের প্রধানই সেখানে যাননি, ভুক্তভোগীর শিশুর বাবা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে সেখানেও দুই দলের প্রতিনিধি গিয়ে উপস্থিত হয়েছেন। ওই ঘটনার পর ধর্ষণের আরও ঘটনা ঘটলেও সেখানে এই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা দেখা যায়নি।

‘ভাইরাল’ না হলেও...

এই আলোচনায় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আয়েশা আক্তার বলেন, শুধু সেন্টিমেন্ট বা আবেগের বশে তড়িঘড়ি করে বিচারের পথটাকে যেন প্রশ্নবিদ্ধ বা সংকুচিত করা না হয়।

আইনজীবী মানজুর আল মতিন বলেন, ভাইরাল (অনলাইনে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া বা আলোচিত হওয়া) না হলে কিছু হয় না—এমন পরিস্থিতি কাম্য নয়। ভাইরালের পেছনে ছোটা নয়; বরং গণমাধ্যমের উচিত গুরুত্ব অনুযায়ী বিষয়গুলোকে সামনে আনা। তিনি আরও বলেন, যৌন নির্যাতনের যেকোনো ঘটনায় মুখ খুলতে হবে।

ভাইরাল না হলেও ধর্ষণ–নিপীড়নের ঘটনা যাতে মনোযোগ পায়, রাষ্ট্রে এমন একটি কাঠামো গড়ে তোলা দরকার বলে উল্লেখ করেন চিকিৎসক তাসনিম জারা। তিনি বলেন, শিশু নিপীড়ন, নারী নিপীড়ন, ধর্ষণ—এসব ঘটনার বিচার কোন পর্যায়ে, হালনাগাদ তথ্য যাতে পাওয়া যায়, সে রকম কাঠামো থাকা উচিত।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা–৯ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা তাসনিম জারা বলেন, ধর্ষণ-নিপীড়নের ঘটনাকে অনেক সময় রাজনৈতিক ‘পয়েন্টের’ (রাজনৈতিক সুবিধা) জন্য ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে সমাজে, সেই জায়গায় সব অংশীজনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সকালে পত্রিকায় যাতে এ রকম খবর আর পড়তে না হয়।

ভাইরাল না হলেও ধর্ষণ-নিপীড়নের ঘটনা যাতে মনোযোগ পায়, রাষ্ট্রে এমন একটি কাঠামো গড়ে তোলা দরকার।
তাসনিম জারা চিকিৎসক ও রাজনীতিবিদ

আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে

আলোচনায় অংশ নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমা বলেন, নতুন আইন করলেই ধর্ষণ–নিপীড়ন বন্ধ হয়ে যাবে, এটি সঠিক নয়। শুধু আইনি সংস্কার নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে এ–সংক্রান্ত যে বাধাগুলো আছে, সেগুলো কীভাবে দূর করা যায়, সেদিকে আলোকপাত করা দরকার।

নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশনের (এনপিএ) মুখপাত্র নাজিফা জান্নাত বলেন, ধর্ষণ–নিপীড়নের এই সমস্যা যেভাবে সমাজে শিকড় গেড়েছে, তা কোনো ব্যক্তির পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়গুলোকে ‘রোল প্লে’ (ভূমিকা রাখা) করতে হবে। নাগরিকদেরও আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা যাতে তাঁদের কাজ যথাযথভাবে করতে বাধ্য হন, সে জন্য সমন্বিত চাপ বজায় রাখা দরকার।

নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন লাগবে বলে মন্তব্য করেন গণবিপ্লবী উদ্যোগ নামের নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের প্রতিনিধি আরিফ সোহেল। তিনি বলেন, এই আন্দোলনে সবার যুক্ত হওয়া প্রয়োজন। এই আন্দোলনকে দেশের সব জায়গায় ছড়িয়ে দিতে হবে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এই আন্দোলনে যুক্ত করতে হবে।

এ আলোচনার সঞ্চালক ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেতা মুশফিক উস সালেহীন। আরও বক্তব্য দেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ হাসিবউদ্দীন হোসেন, জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টির (জেডিপি) আহ্বায়ক নাঈম আহমাদ এবং প্রথম আলোর ধর্ম বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক মনযূরুল হক।