
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যারা ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার প্রদর্শনী বন্ধ করেছে, সরকার নীরবতা কিংবা নিষ্ক্রিয়তার মধ্য দিয়ে সেই গোষ্ঠীকে সমর্থন জোগাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আপনারা আগের সরকারগুলোর ধারাবাহিকতায় একদিকে দুর্বৃত্তকে লালন করা, সাম্রাজ্যবাদকে তোষণ করা আর অন্যদিকে নিজেদের ক্ষমতার স্বার্থে মানুষের চিন্তাচেতনা ও সক্রিয়তাবিরোধী ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া বন্ধ করুন।’
আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে এক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে আনু মুহাম্মদ এ কথা বলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ‘শিল্প–সংস্কৃতির স্বাধীন চর্চা, মুক্তচিন্তা ও সাংস্কৃতিক নিরাপত্তার দাবিতে’ এই কর্মসূচির আয়োজন করে চলচ্চিত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত নির্মাতা ও কলাকুশলীদের কয়েকটি সংগঠন।
জাতীয় চলচ্চিত্র আন্দোলন, বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ, এশিয়ান প্ল্যাটফর্ম ফর ডকুমেন্টারি প্রজেক্ট মার্কেট, বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরাম, দৃশ্যমাধ্যম সমাজ ও চলচ্চিত্র সংস্কার রোডম্যাপ—এই ছয় সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে এই প্রতিবাদ কর্মসূচির আয়োজন করে। সেখানে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, সমাজের মানুষের ওপর যখনই বিভিন্ন রকম নিপীড়ন আসবে, তার বিরুদ্ধে চলচ্চিত্র পরিচালক ও কর্মীদের যেমন চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্রতিবাদ করতে হবে; আবার মাঠে এসেও প্রতিবাদ করতে হবে। সেখানে সবার লড়াই সম্মিলিত। এই সম্মিলিত লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই এই দুর্বৃত্তদের প্রতিরোধ করতে হবে।
‘বর্বরতার একটা প্রকাশ হচ্ছে বনলতা এক্সপ্রেসের প্রদর্শনী বন্ধ করা। এর আগেও বিভিন্ন জায়গায় গানের আসর বন্ধ করা হয়েছে, মাজারের ওপর হামলা হয়েছে, বাউলগানের ওপর হামলা হয়েছে, বিভিন্ন প্রদর্শনী, নাটক, থিয়েটার শো, কবিতা ও কবি গানের আসর বন্ধ হয়েছে।’অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, সদস্য, গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি
আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘একটা সুস্থ সমাজের বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে, সেখানে সবার মত প্রকাশিত হয়, তর্ক-বিতর্ক ও আলোচনা হয়, মতের খণ্ডন হয়, নতুন মত তৈরি হয়, নতুন জ্ঞান তৈরি হয়, নতুন সৃষ্টিশীলতা তৈরি হয়। কিন্তু যদি কথা বা সৃষ্টির জন্য কারও ওপর আক্রমণ হয় কিংবা তাঁর সৃজনশীলতাকে বন্ধ করার হুমকি দেওয়া হয়, হামলা করা হয়, সেটা একটা বর্বরতা। সেই বর্বরতার লক্ষণগুলোই আমরা আমাদের সমাজের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি। এই বর্বরতারই একটা প্রকাশ হচ্ছে বনলতা এক্সপ্রেসের প্রদর্শনী বন্ধ করা। এর আগেও বিভিন্ন জায়গায় গানের আসর বন্ধ করা হয়েছে, মাজারের ওপর হামলা হয়েছে, বাউলগানের ওপর হামলা হয়েছে, বিভিন্ন প্রদর্শনী, নাটক, থিয়েটার শো, কবিতা ও কবি গানের আসর বন্ধ হয়েছে।’
এসব ঘটনার একটার সঙ্গে আরেকটার সম্পর্ক আছে উল্লেখ করে আনু মুহাম্মদ বলেন, সর্বশেষ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ বন্ধ করার ঘটনায় অশ্লীলতার কথা বলা হয়েছে। এটা একটা গোষ্ঠী বলেছে, কিন্তু কী অশ্লীলতা সেটার কোনো ব্যাখ্যা নেই। যে গোষ্ঠী এই কথা বলছে, যা কিছুর মধ্যে মানুষের সৃষ্টিশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তি আছে, যার মধ্যেই সুর আছে—তার সবকিছুই তাদের কাছে অশ্লীল মনে হয়। কিন্তু মানুষের ইতিহাসে যে বিকাশ ও অগ্রগতি, সেটা হচ্ছে সৃজনশীলতার বিকাশ। এই গোষ্ঠী যদি মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারত, তাহলে মানুষের এই অগ্রগতি সম্ভব হতো না।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনায় সরকারেরও একটা ভূমিকা আছে বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, দেখা গেল আরেক জায়গায় যখন প্রদর্শনীর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তখন ডিসি সাহেব বলছেন ‘অশ্লীল ছবি’ এখানে দেখানো যাবে না। ডিসি সাহেবকে তো ব্যাখ্যা দিতে হবে, জবাব দিতে হবে যে কোন অশ্লীলতা বন্ধ করার দায়িত্ব তাঁর; তাঁর এলাকায় নিপীড়ন, ধর্ষণ, লুটপাট, জমি দখল, চাঁদাবাজি, যৌন হয়রানি, মানুষের ওপর আক্রমণ—এগুলো বন্ধ করার ক্ষেত্রে তিনি কী করেছেন? এগুলো কি তাঁর কাছে খুব শ্লীল মনে হয়?
সংস্কৃতিমন্ত্রীর এক সাক্ষাৎকারের কথা উল্লেখ করে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘মন্ত্রী বলেছেন, তিনি জানেন না এটা (‘বনলতা এক্সপ্রেস’ বন্ধ) কোথায় হয়েছে। এগুলো খুবই উদ্বেগজনক বিষয়। সরকার নীরবতা কিংবা নিষ্ক্রিয়তার মধ্যে দিয়ে সেই গোষ্ঠীকে সমর্থন জোগাচ্ছে, একের পর এক বিভিন্ন সরকারের প্রকাশ্য কিংবা প্রচ্ছন্ন সমর্থন পেয়েই আজকে যে শক্তিটা তৈরি হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তারা আজকে যে দাপট দেখাচ্ছে, এটা বহু বছরে তৈরি হয়েছে।’
চলচ্চিত্রসহ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর চড়াও হওয়া গোষ্ঠী সম্পর্কে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, বাংলাদেশের ঘরে ঘরে, ঘরের বাইরে, নারীর নিরাপত্তাহীনতা, যৌন হয়রানি, আক্রমণ, শিশুদের ভয়ংকর রকম নিরাপত্তাহীনতা, ধর্ষণ–হত্যাকাণ্ড, দখল–লুণ্ঠন—এসবের বিরুদ্ধেও তাদের কোনো কথা নেই।...বরং তাদের আশ্রয় হচ্ছে সেই ধরনের নিপীড়ক দখলদার গোষ্ঠী, যাদের কারণে দেশের সার্বভৌমত্ব এবং দেশের মানুষ নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে আছে। এমন একটা গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে, যারা দেশি–বিদেশি নিপীড়ক, অধিপতি গোষ্ঠীর স্বার্থে কাজ করে এবং তাদের নিজেদের চিন্তা বা যুক্তির কোনো জায়গা নেই, সংবেদনশীলতাও নেই। তারা চায়, মানুষ কোনো সৃষ্টির মধ্যে না থাকুক, মানুষের মধ্যে চিন্তার কোনো সক্রিয়তা না থাকুক, তারা চায় মানুষ শুধু তাদের কথাই শুনবে।
এর আগে কোরাস সংগীত সংগঠনের শিল্পী প্রশান্ত চক্রবর্তীর সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে প্রতিবাদ কর্মসূচি শুরু হয়। এরপর শুরু হয় বক্তব্যপর্ব। একে একে বক্তব্য দেন ডকল্যাবের পরিচালক তারেক আহমেদ, দৃশ্যমাধ্যম সমাজের সংগঠক নির্মাতা আকরাম খান, জাতীয় চলচ্চিত্র আন্দোলনের সংগঠক শফিকুর রহমান, ফিল্ম সোসাইটিজ ও শর্ট ফিল্ম ফোরামের সভাপতি জহিরুল ইসলাম কচি, সমগীতের সদস্য বীথি ঘোষ, চলচ্চিত্র পরিচালক গাজী মাহবুব, খন্দকার সুমন ও হাবিবুর রহমান এবং গণসংস্কৃতি পরিষদের সদস্যসচিব রোমান খান। শেষে চলচ্চিত্র সংস্কার রোডম্যাপের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী বরাবর লেখা একটি খোলা চিঠি পড়ে শোনান সংগঠনটির প্রতিনিধি মানস মেহেদী।