‘সাংবাদিকের চোখে জুলাই’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। আজ সোমবার দুপুরে রাজধানীর গুলশানে হোটেল ওয়েস্টিনে
‘সাংবাদিকের চোখে জুলাই’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। আজ সোমবার দুপুরে রাজধানীর গুলশানে হোটেল ওয়েস্টিনে

গণতান্ত্রিক প্রতিবাদকে ‘হঠকারিতা’ বলার মধ্য দিয়ে গ্রেপ্তার-মামলার ন্যারেটিভ তৈরি করা হচ্ছে: নাহিদ ইসলাম

বিদ্যুৎ ও গ্যাস–সংকট নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাম্প্রতিক এক কর্মসূচিকে ইঙ্গিত করে গত শনিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছিলেন ‘এগুলো হঠকারিতা’। আজ সোমবার এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘আমাদের গণতান্ত্রিক প্রতিবাদকে বলা হচ্ছে হঠকারিতা। বলা হচ্ছে, বাস ভাঙচুর আমরা আগের মতো চাই না, রাস্তায় বসে বিক্ষোভ আমরা চাই না। রাস্তায় বসে বিক্ষোভ কিন্তু একটা বৈধ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পদ্ধতি।’

জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ অভিযোগ করে বলেন, ‘কালকে যখন আমি রাস্তায় নামব প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে, তখন বলা হবে আমি বাস ভাঙচুরের জন্য নামছি এবং আমাকে গ্রেপ্তার করা হবে, মামলা দেওয়া হবে। এই ন্যারেটিভ (বয়ান) সরকারের জায়গা থেকে তৈরি করা হচ্ছে।’

আজ সোমবার দুপুরে রাজধানীর গুলশানে হোটেল ওয়েস্টিনে এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে নাহিদ ইসলাম এ কথাগুলো বলেন। ‘সাংবাদিকের চোখে জুলাই’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল ডেমোক্রেটিক জার্নালিস্ট অ্যালায়েন্স (ডিজেএ)। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ‘সত্যের পক্ষে শক্তভাবে অবস্থান নেওয়া’ বেশ কয়েকজন সাংবাদিক নিজেদের অভিজ্ঞতা অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন। নাহিদ এই অনুষ্ঠানে সমাপনী বক্তব্য দেন।

চলমান জ্বালানিসংকটসহ বিভিন্ন বিষয়ে ১৪ আগস্ট ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে সড়ক অবরোধ করে গণসমাবেশ করে এনসিপি। সেখানে লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে হারিকেন প্রদর্শন করেন নাহিদ ইসলামসহ এনসিপির নেতারা। ওই সমাবেশকে ইঙ্গিত করে শনিবার মহাখালীর টিঅ্যান্ডটি মাঠে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, ‘পেছনে ফ্যানের বাতাস খাচ্ছে, হাতে হারিকেন নিয়ে বসে বলছে—গ্যাস দে, বিদ্যুৎ দে; এগুলো হঠকারিতা।...রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভাঙচুর করার রাজনীতির দিন এখন নেই।’

প্রধানমন্ত্রীর সেই বক্তব্যের দিকে ইঙ্গিত করে আজ এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ বলেন, ‘এখন যখন আমরা গণতান্ত্রিকভাবে কোনো আন্দোলন করছি, যখন বলছি যে সরকারকে গ্যাস বা বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, তখন সরকারের সর্বোচ্চ জায়গা থেকে এটাকে বলা হচ্ছে হঠকারিতা। আমরা কোন দিকে যাচ্ছি, তা সবার বোঝা উচিত। আমাদের গণতান্ত্রিক প্রতিবাদকে বলা হচ্ছে হঠকারিতা। বলা হচ্ছে, বাস ভাঙচুর আমরা আগের মতো চাই না, রাস্তায় বসে বিক্ষোভ আমরা চাই না। রাস্তায় বসে বিক্ষোভ কিন্তু একটা বৈধ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পদ্ধতি।’

এ প্রসঙ্গে নাহিদ আরও বলেন, ‘কালকে যখন আমি রাস্তায় নামব প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে, তখন বলা হবে আমি বাস ভাঙচুরের জন্য নামছি এবং আমাকে গ্রেপ্তার করা হবে, মামলা দেওয়া হবে। এই ন্যারেটিভ সরকারের জায়গা থেকে তৈরি করা হচ্ছে। বিরোধী দল সংসদে কথা বলবে, সংসদের বাইরেও কথা বলবে—এটাই গণতান্ত্রিক একটা রাষ্ট্র ও আন্দোলনের চরিত্র। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অহিংসভাবে আমি আমার যেকোনো কথা প্রকাশ করতে পারি। সেই জায়গায় আমার কাছে মনে হচ্ছে গণতন্ত্র সংকুচিত হয়ে আসছে। সেখানে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের কাছ থেকে আমরা নিরপেক্ষ ভূমিকা চাই।’

বাংলাদেশে এখন যে মুক্ত পরিবেশ আছে, তা ‘আপৎকালীন’ বলে মনে করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এটা কত দিন থাকবে, আমরা কেউ জানি না। ধীরে ধীরে গণতন্ত্র ও কথা বলার জায়গা সংকুচিত হয়ে আসছে। সেই সংকোচন ঠেকাতে হবে সবাই মিলেই। সাংবাদিকেরা সাংবাদিকদের ভূমিকাটা পালন করলেই হয়, সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদটা প্রচার করলেই যথেষ্ট হয়। আর রাজনৈতিক দল হিসেবে আমরা আমাদের ভূমিকা পালন করব।’

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর অনেক সাংবাদিককে গণমাধ্যম থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। পাশাপাশি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে এনসিপি পর্যন্ত কিছু গণমাধ্যমের কাছ থেকে বিরূপ আচরণ পাওয়ার কথা বলতে গিয়ে এনসিপির অন্যতম জ্যেষ্ঠ নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর একটি বক্তব্যের পর তাঁকে নিয়ে একটি গণমাধ্যমের ৪৮ ঘণ্টায় ২০-৩০টি প্রতিবেদন প্রকাশের কথা উল্লেখ করেন তিনি। নাহিদ ইসলাম প্রশ্ন তোলেন, ‘এটা কোন ধরনের সাংবাদিকতা?’ তিনি অভিযোগ করেন, ছাত্রনেতাদের চরিত্রহননের চেষ্টা বিভিন্ন সাংবাদিক ও গণমাধ্যম থেকে করা হয়েছে।

জুলাইয়ে সাংবাদিকদের ভূমিকায় ‘দেশপ্রেম’

নাহিদের বক্তব্যের আগে অনুষ্ঠানে বিভিন্ন গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে জুলাই অভ্যুত্থানের সংবাদ সংগ্রহ করা বেশ কয়েকজন সাংবাদিক তাঁদের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশা–প্রাপ্তি বিষয়ে বক্তব্য দেন। কেউ কেউ অভ্যুত্থানের পর চাকরিচ্যুতির ঘটনা উল্লেখ করেন। কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না হওয়ায় কেউ কেউ হতাশা প্রকাশ করেন।

নাহিদ ইসলাম তাঁর বক্তব্যে জুলাইয়ে সাংবাদিকদের অনেকের ভূমিকা সম্পর্কে বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের সময় নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে সাংবাদিকদের অনেকে কাজ করে গেছেন। ঢাকার পাশাপাশি ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলাতেও অনেক সাংবাদিক কাজ করেছেন। আমি বলব, পেশার ঊর্ধ্বে গিয়েই দেশপ্রেম, মানবিকতা ও বিবেকবোধের জায়গা থেকে সাংবাদিকদের অনেকে ভূমিকা পালন করেছেন।’

সাংবাদিকদের সক্রিয়তা না থাকলে আসলে (আন্দোলন সফল করা) সম্ভব হতো না বলে মনে করেন নাহিদ ইসলাম। সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘প্রকাশ্যে, পরোক্ষভাবে বা গোপনে আপনারা সে সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন, এটার জন্য আমরা কৃতজ্ঞতা জানাই। অভ্যুত্থানের পর হয়তো আপনাদের সঙ্গে বসা উচিত ছিল, অনেক কিছু করা উচিত ছিল। সেটা করতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ করি।’

গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে আসা সাংবাদিকদের সুরক্ষা আইনসহ বিভিন্ন ভালো নীতি বাস্তবায়নের দাবি জানান নাহিদ। জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত সাংবাদিকদের জন্য সরকারের উদ্যোগ দাবি করে তিনি বলেন, ‘সাংবাদিকেরা সঠিকভাবে তাঁদের কাজ করার ক্ষেত্রে সরকার বা কোনো রাজনৈতিক শক্তি যাতে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। আমরা একটা রেসপন্সিবল জার্নালিজম (দায়িত্বশীল রাজনীতি) চাই, একই সঙ্গে রেসপন্সিবল পলিটিকস (দায়িত্বশীল রাজনীতি) চাই।’